তুমুল বিতর্কিত, ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত মানুষদের বই প্রকাশের কারণ খুঁজতে গিয়ে রোদেলা প্রকাশনের কর্ণধর রিয়াজ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যতগুলো প্রকাশক স্টল পেয়েছে তার ভেতর প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠান ৩০০ থেকে ৩৫০টি আছে। বাকি প্রকাশনীর অবস্থা খুব একটা ভালো না। তাদের প্রতিটি পদে আছে অপেশাদারিত্বের ছাপ। টাকার লোভে এসব প্রকাশক সোশ্যাল মিডিয়াতে পরিচিত মুখদের সুযোগ দিচ্ছে। এদেরকে আমি প্রকাশক বলব না। যার ফলে সৃজনশীল লেখককেরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বইমেলা হচ্ছে বইয়ের প্রদর্শনের জায়গা। তার মানে এই না যে বিতর্কিত, টিকটক, ইউটিউবারের মতো লেখক বনে যাওয়ার ফলে পেশাদার প্রকাশক-লেখকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলা একাডেমির উচিত হবে, এসব প্রকাশক-লেখকদের সচেতন করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া।
বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আরো যত্নবান হওয়া দরকার এইসব প্রকাশকদের। অনেক প্রকাশনী আছে তাদের নিজস্ব প্রুফরিডিরও নাই। বানান ভুলের ছড়াছড়ি থাকে সমস্ত বই জুড়ে। কি লিখেছে সেইটার চেয়ে টাকা পেলেই তাদের চলে। না হলে খন্দকার মুশতাকের মতো লেখকদের বই বাজারে আসতো না। বইমেলাকে তারা দিনদিন লোকাল বাজারে তৈরি করছে।
.png)
প্রকাশনা ব্যবসা না, এটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন পুঁথিনিলয়ের প্রকাশক শ্যামল। তিনি বলেন, বিতর্কিত, টিকটক, ইউটিউবাররা যখন বই প্রকাশ করে তখন এক শ্রেণীর পাঠক তৈরি হয়। যারা বইমেলায় আসে এই ধরনের মানুষদের বই কেনার জন্য এবং সেলফি তোলার জন্য। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন পরিচিত মুখের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে পাওয়া যায় লাইক, কমেন্ট। এই ধরণের পাঠকদের মৌসুমি পাঠক বলা যায়। এদের জন্য সৃজনশীল লেখক-প্রকাশকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যার ফলে প্রকাশকেরাও এখন মুনাফার দিকে প্রবেশ করছে। প্রকাশক যখন ব্যবসায়ী হয়ে যাবে তখন ভালো বই আর আসবে না। মূলত প্রকাশনা ব্যবসা না, এটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান।
অপেশাদার প্রকাশকদের কারণে মেলার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করে সচেতন পাঠকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, অপেশাদার ও ভুঁইফোড় লেখকের ভিড়ে প্রকৃত ও সৃজনশীল লেখকেরা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এছাড়া বিগত দিনগুলোতে দেখেছি বিশেষত শুক্রবার ও শনিবার এইদিনে কিছু স্টল আছে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত মুখ তারা যেসব স্টলে আসছেন সেসবে তুলনামূলক অনেক ভিড় করছে। তাদের অনেক ভক্ত ও উচ্ছৃঙ্খল লোকজন আবার দুয়ো ধ্বনি দিচ্ছে। বিষয়টি মেলার পরিবেশ নষ্ট করছে সঙ্গে সৌন্দর্যও নষ্টের পেছনে দায়ী।
এদিকে কাজী জহিরুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের পাঠক-দর্শনার্থীদের সচেতন হতে হবে। তাহলেই এসব লেখক বনে যাওয়া লোকজন বই লিখার সাহস পাবে না। তুমুল বিতর্কিত, ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত মানুষদের বই কিনছে কারা সেটাও দেখতে হবে। এইসকল পাঠক পরবর্তী সময়ে আর বই কিনবে না। যা ক্ষতিকর এবং মেলার সৌন্দর্য নষ্টও নষ্ট করে। এদেরকে ভাইরা পাঠকও বলা যায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, লেখালেখি একটা শিল্প। চাইলেই যে কেউ এই কাজটা করতে পারে না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কল্যাণে অনেকেই কনটেন্ট নির্মাণ করতেই করতেই বই লিখছেন। তবে যারা এসব সোশ্যাল মিডিয়া ইনফুলেন্সরদের বই কিনছেন তারাও একটা গোষ্ঠী তারা আর যাই হোক না কেন এরা পাঠক না।
সোশ্যাল মিডিয়া ইনফুলেন্সর মাসফিক এনাম তূর্য। ‘চলেন খিঁচুড়ি খাই’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। তার স্টলের সামনে পাঠকের চেয়ে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেশি দেখো যায়। রূপগঞ্জ থেকে মেলাতে আসা একাদশ শ্রেণির রূপক কিনেছেন ‘চলেন খিঁচুড়ি খাই’।
বইটি কেনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার ভিডিও দেখতে ভালো লাগে। সে থেকেই বইটি কেনা। তিনি যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় এন্টারটেইন করেন, বইতেও তেমন এন্টারটেইন পাবো। এই জন্য কিনেছি সঙ্গে সেলফিও নিয়েছি। তবে তাকে সামনে থেকে দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু বইয়ের দাম অনেক বেশি।
ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত বা ভাইরালদের কারণ জানতে চাইলে কিংবদন্তী পাবলিকেশনের কর্ণধর অঞ্জন হাসান পবন বলেন, আমরা শুধু ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত বা ভাইরালদের বই প্রকাশ করে থাকি এইটা সত্য নয়। মৌলিক লেখকদের বইও বিক্রি করে থাকি। প্রতি বছরের মতো এবারও ৪-৫টি ইনফুলেন্সরে বই প্রকাশ করেছি।
ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত বা ভাইরালদের প্রকাশিত গ্রন্থের বইয়ের মূল্য অনেক বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রকাশিত বইয়ের মান অনেক ভালো, এই জন্য বইয়ের দাম একটু বেশি আপনাদের চোখে লাগতে পারে কিন্তু আমার চোখে মূল্য ঠিক আছে।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য কে এম মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ইনফুলেন্সর, হঠাৎ অত্যধিক চর্চিত বা ভাইরালদের নিয়ে যেসকল প্রকাশনী বই প্রকাশ করেছে আমরা মেলার পর একটি কমিটি করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। আর পুরো বিষয়টা তো আমার এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের উপর নির্ভর করছে না। তাছাড়া সারা বছর যে বই বের হয়, এগুলো কিভাবে তারা প্রকাশ করে। বিষয়গুলো সামগ্রিক অর্থে ভাবতে হবে শুধু মেলা আসলে বাংলা একাডেমির উপর চাপিয়ে দেওয়া এটা থেকে বের হতে হবে। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতিসহ সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি সেলও থাকতে পারে যারা এ বিষয়টি তদারকি করবে।
সেল গঠন করার কাজটি কাদের, বাংলা একাডেমির না বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক-বিক্রেতা সমিতির। এমন একটি প্রশ্ন থেকেই যায় তবে মৌলিক সাহিত্য সবসময়ই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে পুঁজিবাদের থাবায় বা নগদ বাজারে। অন্যদিকে অপেশাদার প্রকাশকদের কারণে প্রতিবছর মেলা হচ্ছে কলুষিত। যার দায়ভার লেখক-পাঠক-প্রকাশক এবং কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে কেউ এড়াতে পাড়ে না।