ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]
বইমেলা

প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি, বাংলা ক্যালকুলেটরে আকর্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭:৩৩, ১১ মার্চ ২০২৬
প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি, বাংলা ক্যালকুলেটরে আকর্ষণ
ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নানা নতুন উদ্ভাবন দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ছে। তেমনি একটি ভিন্নধর্মী আকর্ষণ হলো বিশ্বের প্রথম বাংলা ভাষাভিত্তিক ক্যালকুলেটর। এই ক্যালকুলেটরে সব হিসেব দেখা যায় সম্পূর্ণ বাংলা সংখ্যায়, যা বাংলা ভাষা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ের এক নতুন উদাহরণ হিসেবে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। 

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ৫৭২ নং স্টলে গিয়ে দেখা যায়, আগত অনেক দর্শনার্থী কৌতূহল নিয়ে এই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে দেখছেন। সাধারণ ক্যালকুলেটরে যেখানে 1, 2, 3 ইত্যাদি ইংরেজি সংখ্যা দেখা যায়, সেখানে এই ক্যালকুলেটরে দেখা যাচ্ছে ১, ২, ৩—সম্পূর্ণ বাংলা অঙ্কে হিসেবের ফলাফল। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব ধরনের গণনা এতে করা যায় সহজেই।

উদ্ভবকের দাবি, বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির আরও কাছাকাছি নিয়ে আসাই তাদের মূল লক্ষ্য। অনেক সময় শিশু বা নতুন শিক্ষার্থীরা বাংলায় সংখ্যা শেখার সময় ইংরেজি সংখ্যার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়। সেই সমস্যার সমাধান করতেই তৈরি করা হয়েছে এই বাংলা ক্যালকুলেটর। বইমেলায় ধারাপাত ক্যালকুলেটর নিয়ে স্টল দিলেও এটি বিক্রি করছেন না মাহমুদ। তার ভাষ্য আগাম বুকিং দিলে তবেই, এ সরবরাহ করা হবে।

Advertisement

মেলা উপলক্ষে ২০% ছাড়ে ৪০০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ৫০টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে এবং নিবন্ধন সাপেক্ষে পরবর্তীতে তা সরবরাহ করা হবে। কথা হয়মেলায় বাংলা ক্যালকুলেটর ধারাপাতের উদ্ভাবক ড. মো. মাহমুদ হাসানের সঙ্গে। জানা যায়, মাহমুদ একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ এবং আবিষ্কারক। তিনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে রোবোটিক্সের ওপর পিএইচডি করতে মালয়েশিয়া যান ড. মাহমুদ। তারপর আর দেশে ফিরে আসেননি। ৩০ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, কাজাখাস্তান, আমেরিকার অনেকগুলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন রোবোটিক্স। প্রাণের ভাষা বাংলাকে ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে দশকের পর দশক কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশ গার্ডিয়ানকে মাহমুদ বলেন, আমার জীবনের বড় স্বপ্ন ছিল একদিন বাংলাকে প্রযুক্তির ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করা যাতে আমাদের সংখ্যা, আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি সমানভাবে আধুনিক জগতে জায়গা পায়। এই যাত্রায় আমার ছোট্ট এক প্রচেষ্টা হলো ধারাপাত বাংলা ক্যালকুলেটর বাংলা সংখ্যাকে সহজে ব্যবহারযোগ্য করার একটি নতুন দিগন্ত। আমি বিশ্বাস করি, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটা আমাদের পরিচয়, আমাদের আত্মার প্রকাশ।

১৯৮৮ সালে এই আবিষ্কারকে বাস্তবে রূপদানের জন্য সরকারের কাছে ৫০ হাজার টাকা অনুদান চেয়েছিলেন ড. মাহমুদ। কিন্তু তৎকালীন সরকার তাকে ফিরিয়ে দেয়। ৩৬ বছর পর, ২০২৫ সালে নিজ উদ্যোগে বাংলা ক্যালকুলেটর ধারাপাত তৈরি করেন। এ প্রসঙ্গে মাহমুদ হাসান আরও বলেন, ১৯৮৮ সালে যখন আমার মনে প্রথম বাংলা ক্যালকুলেটর তৈরির ধারণা এলো, তখন আমি বুঝতে পারিনি যে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে আমার ৩৬ বছর সময় লাগবে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের পরিচয়। প্রতিটি জাতির নিজস্ব ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার অধিকার রয়েছে। এই বিশ্বাস থেকেই আমি ধারাপাত বাংলা ক্যালকুলেটর আবিষ্কার করেছি।

মেলায় ঘুরতে আসা একাধিক দর্শনার্থীদের সঙ্গে ধারাপাতের স্টলের সঙ্গে কথা হলে, তারা এমন উদ্ভাবনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা জানান, বাংলা সংখ্যায় হিসেব দেখা সত্যিই ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা। আমাদের ভাষায় প্রযুক্তির এমন ব্যবহার আরও বাড়লে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা শেখার আগ্রহও বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বাংলাদেশ গার্ডিয়ানকে বলেন, এটি শুধু একটি ক্যালকুলেটর নয়, বরং বাংলা ভাষার ব্যবহারকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুন্দর উদ্যোগ। বিশেষ করে নিরক্ষর ও ইংরেজি হিসেবে তালগোল পাকিয়ে ফেলা লোকজনদের কাছে এটি বেশ কার্যকর হতে পারে।

বইমেলা মূলত বইকেন্দ্রিক আয়োজন হলেও, এর সঙ্গে প্রযুক্তি ও সৃজনশীল উদ্ভাবনের এমন সংযোজন দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার চর্চা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এমন উদ্যোগ মেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। প্রযুক্তির এই ছোট্ট উদ্ভাবন যেন মনে করিয়ে দেয়, বাংলা ভাষা শুধু সাহিত্যেই নয়, প্রযুক্তির পর্দাতেও সমান স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিতে পারে।

প্রসঙ্গত, অনলাইনে নির্ধারিত ওয়েবাসাইটের মাধ্যমে এটি বর্তমানে ব্যবহার যাচ্ছে। ব্যবহার করতে ক্লিক করুন (https://tinyurl.com/wpadzrmy)

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!