ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]

ব্যস্ততার নামে মনযোগ হারাচ্ছে মানুষ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৬, ১৭ আগস্ট ২০২৬
ব্যস্ততার নামে মনযোগ হারাচ্ছে মানুষ
এই যুগে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু খুব কম মানুষ মনোযোগী। যে মানুষটা দিনে মাত্র ৯০ মিনিট পুরোপুরি উপস্থিত থাকতে পারে — সে এক বছরে সেখানে পৌঁছাবে, যেখানে "সারাদিন ব্যস্ত" মানুষটা পাঁচ বছরেও পৌঁছাবে না।

মনোযোগকে বলা হয় সুপার পাওয়ার। কারণ মনোযোগ আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়। এটি একটি সুপার পাওয়ার কারণ এটি আপনার শেখার ক্ষমতা, মানসিক শান্তি এবং আপনার জীবনের গতিপথসবকিছুকেই প্রভাবিত করে। এটি আপনার দুশ্চিন্তা দূর করার রিমোট হিসেবে কাজ।  

Georgetown বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অধ্যাপক Cal Newport তাঁর বিখ্যাত বই Deep Work-এ কাজকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন — 
* গভীর কাজ (Deep Work): যে কাজে পূর্ণ মনোযোগ লাগে।
যে কাজ আপনাকে দক্ষ করে। যে কাজ অন্যরা সহজে নকল করতে পারে না।
* অগভীর কাজ (Shallow Work): মেসেজের উত্তর, নোটিফিকেশন দেখা, এদিক-ওদিক নাড়াচাড়া। ব্যস্ততার অনুভূতি দেয়। কিন্তু কিছুই তৈরি করে না।

সমস্যা হলো — আমাদের বেশিরভাগ দিন কেটে যায় অগভীর কাজে। আর আমরা সেটাকে ভাবি "পরিশ্রম"। একারণে Newport-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটার নাম — অ্যাটেনশন রেসিডিউ (Attention Residue)। আপনি যখন কাজ থেকে ফোনে যান, আবার ফোন থেকে কাজে ফেরেন — আপনার মনোযোগ পুরোপুরি ফেরে না। আগের কাজের একটা "অবশিষ্টাংশ" মাথায় লেগে থাকে। 

What is Attention Residue? Why It's Bad for Your Team - Vibe CMS | Vibe

Advertisement

গবেষণা বলছে, একবার মনোযোগ ভাঙলে পূর্ণ গভীরতায় ফিরতে গড়ে ২০ মিনিটের বেশি লাগে। এখন হিসাব করুন —আপনি যদি দিনে ২০ বার ফোন দেখেন, আপনার মস্তিষ্ক কি কখনো পূর্ণ গভীরতায় পৌঁছাতেই পারে? পারে না। তাহলে আপনি সারাদিন ছিলেন অর্ধেক-জাগ্রত, অর্ধেক-উপস্থিত। তাই দিনশেষে কিছু মনে থাকে না। কারণ আপনি কখনো পুরোপুরি সেখানে ছিলেন না।

অথচ আপনি ব্যস্ত থাকেন সারাদিন, তবু দিনশেষে মনে হয় কিছুই হলো না- সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা। একটানা ব্যস্ত। তবু রাতে বিছানায় শুয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেন —"আজ আসলে কী করলাম?"

উত্তর নেই। কাজ খুলেছিলেন। তারপর একটা নোটিফিকেশন। তারপর একটু ফেসবুক। তারপর একটা মেসেজের উত্তর। তারপর আবার কাজে ফিরলেন — কিন্তু ততক্ষণে মাথাটা আর সেখানে নেই। তারমানে আপনি অলস নন। আপনি সারাদিন পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু আপনার পরিশ্রমটা ছিল এলোমেলো ছড়ানো ছিটানো। আর ছড়ানো পরিশ্রম কাঙ্খিত ফল দেয় না।

 গবেষণা বলছে, মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ সত্যিকার অর্থে দক্ষতার সঙ্গে একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে অনলাইন মিটিংয়ে অংশ নেওয়া, অন্যদিকে ই-মেইল দেখা বা বার্তার উত্তর দেওয়ার ফলে কোনো কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। বারবার এক কাজ থেকে অন্য কাজে মনোযোগ সরাতে গিয়ে মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে কাজ শেষ হতে বেশি সময় লাগে এবং ভুলের পরিমাণও বাড়ে। তাই এক সময়ে একটি কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়াই ভালো। এতে কাজ দ্রুত শেষ হয় এবং ভুলও কম হয়।

কাজের মধ্যে "পুরোপুরি উপস্থিত থাকা" — হলো ইসলামের অন্যতম মূল শিক্ষা। আল্লাহ বলেন — "অবশ্যই সফল হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী-একাগ্র।" (সূরা মুমিনুন: ১-২)। লক্ষ্য করুন — শুধু "যারা নামাজ পড়ে" বলা হয়নি। বলা হয়েছে — যারা নামাজে উপস্থিত থাকে।

শরীর দাঁড়িয়ে আছে, মন বাজারে — এই সমস্যাটা নতুন নয়। আর নবীজি ﷺ ইহসানের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে — "তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ।" (বুখারি ও মুসলিম)। এটাই পূর্ণ মনোযোগের সর্বোচ্চ রূপ।
দিনে পাঁচবার আমাদের অনুশীলন করানো হয় — সব ছেড়ে এক জায়গায় মন বসানোর। নামাজ শুধু ইবাদত নয় —এটা দিনে পাঁচবারের মনোযোগ প্রশিক্ষণ।

Combatting the Impact of "Attention Residue" when Interruptions Occur

এখন অ্যাকশন প্ল্যান — ৭ ধাপে গভীর মনোযোগ ফেরানো:
১. দিনে একটি ৯০ মিনিটের ব্লক ঠিক করুন। সারাদিন নয়। শুধু ৯০ মিনিট। সবচেয়ে সতেজ সময়টা বেছে নিন — বেশিরভাগ মানুষের জন্য ফজরের পরের সময়। এই ব্লকে একটাই কাজ। আর কিছু না।

২. ফোন অন্য ঘরে রাখুন। সাইলেন্ট যথেষ্ট নয়। উল্টো করে রাখাও যথেষ্ট নয়। গবেষণা বলছে — ফোন শুধু টেবিলে থাকলেই মনোযোগ কমে। দূরত্বই একমাত্র সমাধান।

৩. শুরুর আগে লিখুন — "এই ৯০ মিনিটে ঠিক কী শেষ করব?" অস্পষ্ট লক্ষ্য মানেই ঘুরপাক। "পড়ব" নয় — "৩ নম্বর অধ্যায় শেষ করব।"

 ৪. মাঝখানে মাথায় আসা সব কিছু একটা কাগজে টুকে রাখুন। "চিনি কিনতে হবে", "ওকে ফোন দিতে হবে" — মাথায় এলে সাথে সাথে লিখে ফেলুন, কিন্তু করবেন না। এতে ব্রেইন শান্ত হয়, কারণ সে জানে জিনিসটা হারাবে না।
 
৫. বিরক্তিটা সহ্য করতে শিখুন। প্রথম ১০-১৫ মিনিট অস্থির লাগবে। হাত ফোনের দিকে যাবে। এটাই আসল পরীক্ষা। এই অস্বস্তিটুকু পার হলেই গভীরতা শুরু।
 
৬. অপেক্ষার সময় ফোন ধরবেন না। লাইনে দাঁড়ানো, রিকশায় বসা, রান্না বসিয়ে অপেক্ষা — এই ছোট মুহূর্তগুলোতে ফোন ধরলে
ব্রেইন শেখে: "একঘেয়েমি সহ্য করা লাগে না।" আর যে ব্রেইন একঘেয়েমি সহ্য করতে পারে না, সে গভীর কাজও করতে পারে না।

৭. দিন শেষ করুন একটা নির্দিষ্ট সময়ে। "কাজ শেষ" — এই কথাটা নিজেকে বলুন। তারপর আর কাজে ফিরবেন না। বিশ্রাম না পেলে পরের দিনের গভীরতা আসে না।

মনে রাখবেন — এই যুগে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু খুব কম মানুষ মনোযোগী। যে মানুষটা দিনে মাত্র ৯০ মিনিট পুরোপুরি উপস্থিত থাকতে পারে — সে এক বছরে সেখানে পৌঁছাবে, যেখানে "সারাদিন ব্যস্ত" মানুষটা পাঁচ বছরেও পৌঁছাবে না।
 

সূত্র : Soul Wellness পেজ। এসম্পর্কে আরো জানতে পড়তে পারেন- "হ্যাক ইউর ব্রেইন" বইটি।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!