ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

গ্যাস নেই-বিদ্যুৎ নেই, তবু গ্রাহকের ঘাড়ে বিল

মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৮:৫৮, ১৭ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস নেই-বিদ্যুৎ নেই, তবু গ্রাহকের ঘাড়ে বিল
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই—তবুও মাস শেষে বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্নার জন্য এলপিজি ও বৈদ্যুতিক চুলার বাড়তি খরচ বহন করছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেনারেটর ও আইপিএস চালাতে বাড়ছে ব্যয়, কিন্তু বিদ্যুৎ বিল কমছে না। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে দৈনিক শত কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই দ্বৈত সংকটে শিল্পখাতেও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শতাধিক কারখানা বন্ধ বা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক, ইস্পাত, প্লাস্টিক ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে দৈনিক শতকোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সেবা না পেলেও টাকা দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের, যা প্রতারণার শামিল বলে জানিয়েছেন অনেক গ্রাহক। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিলিং ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা, পুরনো মিটার ও সিস্টেম লসের চিত্রও।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে। চাহিদা প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। এলএনজি টার্মিনাল সমস্যা ও আমদানি সংকটের প্রভাবে সরবরাহ আরও কমেছে। বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেয়ে উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে বেড়েছে লোডশেডিং। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, এই সংকট নিরসনে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়।

Advertisement

কীভাবে ঠকছেন গ্রাহক-
তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় বেশিরভাগ গৃহস্থালি গ্রাহক এখনো পোস্টপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। গ্যাস না থাকলেও মাসিক ফিক্সড বিল দিতে হয়। অনেক এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। গ্রাহকরা এলপি গ্যাস কিনে বা ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছেন। অথচ বিল আগের মতোই দিতে হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, সেবা না দিয়ে পূর্ণ বিল নেওয়াটা গ্রাহক ঠকানোর শামিল। প্রিপেইড বা স্মার্ট মিটার স্থাপনের প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ফলে প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী বিল হচ্ছে না। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, লোডশেডিংয়ের সময় ব্যবহার কম হলেও বিল কমে না; কখনো গড় হিসাব বা আগের মাসের ভিত্তিতে বিল আসে।

মিরপুরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস নেই। এলপি সিলিন্ডার কিনতে হয়। মাসে দুই-তিনটা লাগে। খরচ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু তিতাসের বিল এক পয়সাও কমে না। 

মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী কামরুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। জেনারেটর চালাই। এতে বাড়ছে খরচ। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল আগের চেয়ে বেশি আসে। হিসাব বোঝা যায় না। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সালমা আক্তার জানান, গ্রামে গ্যাস সপ্তাহে কয়েকদিনও পাই না। লাকড়ি পোড়াই। বিল কিন্তু ঠিকই দিতে হচ্ছে।

বিষয়টিকে ন্যায়সঙ্গত নয় মন্তব্য করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে। নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন যথেষ্ট হয়নি। বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নেই। প্রিপেইড মিটার না থাকায় গ্রাহকরা সেবা না পেলেও পূর্ণ বিল দিতে হচ্ছে।

শিল্পখাতে ক্ষতির পরিমাণ-
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে শিল্পখাতে। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত এক সপ্তাহে শতাধিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এর মধ্যে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণের কারখানাই বেশি। মেঘনা গ্রুপসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনেক ইউনিট বন্ধ বা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে উৎপাদন অনেক কারখানায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু এলাকায় ডাইং ও প্রিন্টিং ইউনিটের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বন্ধ। নরসিংদী-মাধবদী এলাকায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বলে শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন।

সিরামিক শিল্পে অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ। প্লাস্টিক খাতে শতাধিক ছোট-মাঝারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ইস্পাত খাতেও বড় মিলগুলো উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। গাজীপুরে হাজারের বেশি শিল্প ইউনিটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগ্রস্ত। হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাতে অর্ডার সময়মতো পূরণ না হওয়ায় ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, ডিজেল জেনারেটর চালাতে খরচ তিন-চার গুণ বেড়েছে। অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেছে।

গাজীপুরের এক গার্মেন্টস মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ কমেছে। জেনারেটরের তেলের খরচ লাখ লাখ টাকা। অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছি না। 

নারায়ণগঞ্জের টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপক ফারুক আহমেদ বলেন, বয়লার চালানো যায় না। মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। 

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, সরকার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য উৎসের সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, সংকট রয়েছে এবং তা মোকাবিলায় কাজ চলছে। তবে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেননি।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাবিবুন নাহার বলেন, লোডশেডিং ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রাহক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তবে বিলিং বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নতুন ঘোষণা আসেনি।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লাখ লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হবে, যাতে গ্রাহক প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী বিল দিতে পারেন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন এখনো পূর্ণ গতিতে শুরু হয়নি। 

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শিল্প উৎপাদন কমলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল্যস্ফীতি বাড়ে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক ও বিলিং স্বচ্ছ না হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আই এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!