আকারে আমাদের চাঁদ তো বটেই, এমনকি বুধ গ্রহের চেয়েও বড় সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ গ্যানিমিড। বাহ্যিকভাবে শুষ্ক ও নির্জীব মনে হলেও রহস্যে ঘেরা এই উপগ্রহটির রয়েছে বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য। সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ হিসেবে গ্যানিমিডের নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এর বরফাচ্ছাদিত পৃষ্ঠের নিচে রয়েছে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গভীর এক বিশাল লোনা পানির মহাসাগর—যার পানির পরিমাণ পৃথিবীর মোট পানির চেয়েও অনেক বেশি।
১৬১০ সালে ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রথম দূরবীন দিয়ে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ চিহ্নিত করেন, যার একটি ছিল গ্যানিমিড (অন্যগুলো হলো ক্যালিস্টো, আইও ও ইউরোপা)। মহাবিশ্বের সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে—তৎকালীন এই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেয় গ্যালিলিওর এই আবিষ্কার। তাঁর নামানুসারে এগুলোকে ‘গ্যালিলীয় উপগ্রহ’ বলা হয়। প্রথমে এগুলোকে ‘মেডিছি তারা’ বলা হলেও পরে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাইমন মারিয়াস রোমান পৌরাণিক চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে উপগ্রহগুলোর নাম রাখেন।
.png)
কেন্দ্র: অর্ধ-গলিত লোহা ও নিকেলের সমন্বয়ে গঠিত, যা উপগ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। ১৯৯৬ সালে নাসার গ্যালিলিও নভোযান এই চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে তৈরি হওয়া মেরুপ্রভা বা ‘অরোরা’ শনাক্ত করে।
ম্যান্টল: কেন্দ্রের ওপরে রয়েছে সিলিকা শিলার ম্যান্টল।
ভূপৃষ্ঠ ও মহাসাগর: উপগ্রহটির ওপরের অংশ পুরোটাই বরফের। এর ১০০ কিলোমিটার গভীরে রয়েছে বিশাল মহাসাগর। যেখানে পৃথিবীর গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চ মাত্র ১০ কিলোমিটার, সেখানে এই মহাসাগরের গভীরতা অবাক করার মতো। ২০২১ সালে নাসার ‘জুনো’ মিশন গ্যানিমিডের পৃষ্ঠে খনিজ লবণ ও জৈব যৌগের উপস্থিতি খুঁজে পায়।

গ্যানিমিডে বায়ুমণ্ডল থাকলেও তা অত্যন্ত পাতলা (চাপ মাত্র ০.২ মাইক্রো-প্যাসকেল)। এই বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ও ওজোন গ্যাস থাকলেও তা মানুষের শ্বাস নেওয়ার উপযোগী নয়। হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের এই অক্সিজেন শনাক্ত করা হয়।
সূর্য থেকে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করায় গ্যানিমিড আলো পায় পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৩০ ভাগের এক ভাগ। এখানে দিনের বেলা তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ১১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে তা নেমে যায় মাইনাস ১৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
গ্যানিমিড প্রতি ৭ দিনে একবার বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করে। আমাদের চাঁদের মতো এটিও ‘টাইডালি লকড’ (Tidally locked)—অর্থাৎ এর একটি নির্দিষ্ট দিক সবসময় বৃহস্পতির দিকে মুখ করে থাকে। সূর্য থেকে এই উপগ্রহে আলো পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪৩ মিনিট।
গ্যানিমিড ও বৃহস্পতি নিয়ে গবেষণায় এ পর্যন্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশন পরিচালিত হয়েছে:
পাইওনিয়ার ১০ ও ১১ (১৯৭৩): প্রথম ফ্লাই-বাই (পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া) মিশন।
ভোয়েজার ১ ও ২ (১৯৭৯): সংক্ষিপ্ত পথ অতিক্রম বা ফ্লাই-বাই মিশন।
গ্যালিলিও মিশন (১৯৯৫-২০০৩): গ্যানিমিড সম্পর্কিত প্রচুর মৌলিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই মিশন সফল ভূমিকা রাখে।
নিউ হরাইজন্স (২০০৭): ফ্লাই-বাই মিশন।
জুনো (২০১৬-বর্তমান): বৃহস্পতি ও এর উপগ্রহগুলোর গঠন নিয়ে সফল গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) ‘জুস’ (JUICE) নভোযান ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করেছে এবং এটি ২০৩০ সালে বৃহস্পতির কক্ষপথে পৌঁছাবে। এ ছাড়া নাসা ২০২৪ সালে ‘ইউরোপা ক্লিপার’ (Europa Clipper) মিশন উৎক্ষেপণ করেছে, যা থেকে ভবিষ্যতে এই বরফাবৃত জগতের আরও নতুন নতুন তথ্য জানা যাবে।