ঢাকা,  শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

স্ক্রিনের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির আলো

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্ক্রিনের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির আলো
প্রকৃতি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এটি মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবেশ। আর যদি একটি প্রজন্ম প্রকৃতিকে প্রধানত ছবিতে, ভিডিয়োতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে চিনতে শেখে, তাহলে প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়।

একসময় শিশুর শৈশবের বড়ো একটি অংশ কেটে যেত বাইরে। মাঠ, গাছ, পুকুর, নদী, পাখির ডাক, বৃষ্টিতে ভেজা মাটি কিংবা বিকেলের আকাশ ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন সেই জায়গার অনেকটাই দখল করেছে স্মার্টফোনের পর্দা। অবসর মানেই ভিডিয়ো, গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা একের পর এক ছোট ভিডিয়ো। ফলে নতুন প্রজন্মের জীবনে প্রকৃতি পুরোপুরি অদৃশ্য না হলেও তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সময় ও সুযোগ কমে যাচ্ছে।

সমস্যাটি শুধু শিশুরা কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করছে, সেটি দিয়ে বোঝা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্ক্রিন কি তাদের মনোযোগের এমন একটি বড়ো অংশ দখল করে নিচ্ছে, যার ফলে বাস্তব পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ কমছে?

Advertisement

মানুষের মস্তিষ্ক তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে। বাইরে খেলতে গেলে শিশুকে দূরত্ব বুঝতে হয়, শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, পরিবেশের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে হয়। গাছের পাতার নড়াচড়া, পাখির শব্দ, মাটির গন্ধ কিংবা ঋতু পরিবর্তনের দৃশ্য সরাসরি অনুভব করা হয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। এগুলো কোনো স্ক্রিনের বিকল্প অভিজ্ঞতা নয়।

প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনোযোগ। শহরের ব্যস্ততা, শব্দ এবং ডিজিটাল নোটিফিকেশনের বিপরীতে, প্রাকৃতিক পরিবেশ সাধারণত কম তীব্র এবং তুলনামূলকভাবে ছন্দময় উদ্দীপনা দেয়। গবেষণায় প্রকৃতির পরিবেশের সঙ্গে মনোযোগ ও মানসিক পুনরুদ্ধারের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে প্রকৃতি দেখলেই মানসিক সমস্যা দূর হয়ে যায়। বরং মানুষের মনোযোগ ও মানসিক অবস্থার ওপর পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। এখানে শুধু সময়ের প্রশ্ন নেই, আছে মনোযোগের প্রতিযোগিতা। একটি ভিডিয়ো শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ভিডিয়ো হাজির হচ্ছে। একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট। নতুন বার্তা, নতুন ছবি, নতুন মন্তব্য। মস্তিষ্ককে ক্রমাগত নতুন উদ্দীপনার দিকে ঘুরতে হচ্ছে।

Screen Addiction in Kids: Warning Signs and 7 Practical Prevention Tips

অন্যদিকে, প্রকৃতি সাধারণত এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে না। একটি গাছ কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন দৃশ্য দেখায় না। নদীর পানি প্রতিমুহূর্তে নতুন কনটেন্ট সরবরাহ করে না। পাখির ডাকেরও কোনো স্ক্রল বাটন নেই।

ফলে প্রশ্নটি শুধু “শিশুরা ফোন বেশি ব্যবহার করছে কি না” নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তারা কী ধরনের অভিজ্ঞতা হারাচ্ছে?

একটি শিশু যদি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভার্চুয়াল জগতে থাকে, কিন্তু মাঠে দৌড়ানোর, গাছের নিচে বসার, পোকামাকড় দেখার কিংবা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ না পায়, তাহলে তার পৃথিবী সম্পর্কে অভিজ্ঞতার পরিধি একদিকে বাড়লেও অন্যদিকে সংকুচিত হতে পারে। সে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ছবি দেখতে পারে, দূর দেশের ভিডিয়ো দেখতে পারে, মহাকাশ সম্পর্কে জানতে পারে। কিন্তু নিজের বাড়ির পাশের গাছটির নাম হয়ত জানে না।

তবে এখানে প্রযুক্তিকে একমাত্র অপরাধী বানানোও ঠিক হবে না। মোবাইল ফোন একই সঙ্গে জ্ঞান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার শক্তিশালী মাধ্যম। শিশুরা ফোন ব্যবহার করে বিজ্ঞান শেখে, ছবি তোলে, প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য খোঁজে, পাখি শনাক্ত করে এবং পৃথিবীর নানা পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পারে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি প্রকৃতির শত্রু হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

সমস্যা শুরু হয় যখন ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা সরাসরি অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করতে থাকে।

একটি পাখির ভিডিয়ো দেখা আর সত্যিই ভোরে বাইরে দাঁড়িয়ে পাখির ডাক শোনা এক জিনিস নয়। বৃষ্টির ভিডিয়ো দেখা আর বৃষ্টির গন্ধ অনুভব করা এক অভিজ্ঞতা নয়। পাহাড়ের ছবি দেখা আর পাহাড়ের বাতাসে দাঁড়ানোও একই বিষয় নয়।

Can't Live Without It: The Invisible Face Of Screen Addiction - Psychology  Timesপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মূলত শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক। সেখানে চোখের পাশাপাশি কান, নাক, ত্বক এবং শরীরের নিজস্ব অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্ক্রিন সেই অভিজ্ঞতার কেবল একটি অংশ দিতে পারে।

তাই নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন ডিজিটাল জীবনের সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। শিশুর হাতে ফোন থাকবে, কিন্তু তার হাত মাটিও ছুঁবে। সে অনলাইনে মহাকাশের ছবি দেখবে, আবার রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে সত্যিকারের আকাশও দেখবে। পাখির ভিডিয়ো দেখবে, আবার নিজের এলাকায় কোন পাখি আসে সেটিও জানবে।

কারণ প্রকৃতি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এটি মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবেশ। আর যদি একটি প্রজন্ম প্রকৃতিকে প্রধানত ছবিতে, ভিডিয়োতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে চিনতে শেখে, তাহলে প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়। 

প্রশ্নটি হলো, আমরা কি ধীরে ধীরে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা পৃথিবীকে দেখছে অনেক বেশি, কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা পাচ্ছে কম?

লেখক : আল আমিন রিটন, বিজ্ঞা ও প্রযুক্তি বিষয়ক লেখক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!