ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

অভিযান হলেও দখল ফেরে, ফুটপাত কার নিয়ন্ত্রণে?

মো: সোহেল রানা
প্রকাশিত: ১৬:৫৬, ২১ আগস্ট ২০২৬
অভিযান হলেও দখল ফেরে, ফুটপাত কার নিয়ন্ত্রণে?
ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো যাত্রী এই পথ দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করেন। অথচ বিমানবন্দর থেকে বের হলেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। কোথাও ফুটপাত দখল করে ভাসমান দোকান, কোথাও হকারের পসরা, কোথাও ভিক্ষুক ও পথশিশুর উৎপাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ। সব মিলিয়ে বিমানবন্দর এলাকার শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাম্প্রতিক সময়েও বিমানবন্দর এলাকায় ভিক্ষুক, ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৮২ জনকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হলেই ফিরে আসে পুরোনো চিত্র। 

Advertisement

বিমানবন্দর সংলগ্ন ব্যস্ত সড়কের বিভিন্ন অংশের ফুটপাত দখল করে বসেছে অস্থায়ী দোকান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের পসরা। পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাতের বড় অংশই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যবসা ও পণ্য প্রদর্শনের কাজে। ফলে যাত্রী ও এলাকাবাসীকে অনেক সময় মূল সড়কের কিনারা দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন লাগেজ বহনকারী যাত্রীরা। একদিকে দ্রুতগতির যানবাহন, অন্যদিকে সংকুচিত পথ—সামান্য অসতর্কতাই ঘটাতে পারে বড় দুর্ঘটনা। প্রশ্ন উঠছে, দিনের পর দিন যদি ফুটপাত দখল হয়ে থাকে, তাহলে নিয়মিত নজরদারি কোথায়? উচ্ছেদ অভিযান হলেও কিছুদিন পর একই জায়গায় আবার দখল ফিরে আসার অভিযোগ কেন?

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতের বড় একটি অংশ হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে। কোথাও ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে দোকান, কোথাও পণ্য সাজিয়ে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক পথচারী মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

অন্যদিকে, বিমানবন্দর এলাকায় হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের কেউ কেউ জানান, বিভিন্ন নামে তাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হয়রানি কিংবা ব্যবসায় বাধা দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাসমান ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে নিয়মিত টাকা নেওয়া হয়। কেউ দৈনিক, কেউ সাপ্তাহিক আবার কেউ মাসিক ভিত্তিতে টাকা নেয় বলে তিনি দাবি করেন। দোকানের জায়গা পেতেও শুরুতে টাকা দিতে হয় বলেও অভিযোগ তার।

তিনি বলেন, মাঝে মাঝে পুলিশ উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরে আবার ব্যবসায়ীরা সেখানে বসেন। ভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির আগমন উপলক্ষে দোকান সরিয়ে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আবার বসাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়। ভালো জায়গা পেতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দরের সামনে সড়ক পারাপারের জন্য থাকা ফুটওভার ব্রিজে ভিক্ষুক, পথশিশু ও ভাসমান হকারদের উপস্থিতির কারণে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন পথচারী অভিযোগ করেন, পথশিশুদের কেউ কেউ টাকা চাইতে গিয়ে তাদের ঘিরে ধরে বা পোশাক ধরে টানাটানি করে। এতে নারী ও বিদেশফেরত যাত্রীসহ অনেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন বলে জানান তারা।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, রেলগেট ও বিমানবন্দর প্রবেশমুখ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। অনেককে আটক বা গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে জানান তিনি।

পথশিশুদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের আটক করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হলেও আসনসংকটসহ বিভিন্ন কারণে সবসময় তাদের গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়।

ফুটপাত দখলের বিষয়ে ওসি বলেন, পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করে। তবে অভিযান শেষে আবারও কেউ কেউ সেখানে বসে পড়েন। ফুটপাতের দোকান থেকে পুলিশ টাকা নেয়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, হকারদের বসার পেছনে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।


যাত্রীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে নানা ধরনের লোকজনের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা তাদের বিড়ম্বনায় ফেলছে। বিশেষ করে লাগেজসহ চলাচলের সময় হকার, ভিক্ষুক ও পথশিশুদের ঘিরে ধরার ঘটনায় অনেক যাত্রী অস্বস্তিতে পড়েন। বিদেশফেরত যাত্রীদের কাছেও এ পরিস্থিতি রাজধানীর প্রবেশদ্বার হিসেবে বিমানবন্দর এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করেন অনেকে।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, পথশিশুদের একটি অংশ দিনের বিভিন্ন সময়ে সড়ক ও ফুটপাতে অবস্থান করে। তাদের অনেকেই যানবাহনের কাছে ঘোরাফেরা করে বা পথচারীদের কাছে সাহায্য চায়। একইভাবে বিভিন্ন বয়সী ভিক্ষুকের উপস্থিতিও চোখে পড়ে। মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর স্থায়ী সমাধানে পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোগান্তির আরেকটি বড় কারণ ফুটপাত দখল ও যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং। ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে পথচারীরা সড়কে চলাচল করে যাতে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিমানবন্দরে যাওয়া-আসা করা যাত্রীদের পাশাপাশি অফিসগামী মানুষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনকর্মীদেরও প্রতিদিন এ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত, অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং পথশিশু ও ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাধারণ যাত্রী ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থা সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বিমানবন্দর এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বারে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও নির্বিঘ্ন চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযান নয়, চাই স্থায়ী সমাধান।
বিমানবন্দর এলাকায় মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে ফুটপাত খালি করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা না থাকলে পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।

বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাত দখল, হকারদের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান, পথচারীদের ভোগান্তি এবং এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অনিয়ম কোনোভাবেই একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকার স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। নিয়মিত অভিযান চালিয়েও যদি একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যার মূল জায়গায় এখনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা, চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত, হকারদের সুশৃঙ্খল পুনর্বাসন এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে নয়, এটি সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার, এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!