নির্বাহী কমিটির সদস্যরা বলছেন, সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের অক্টোবরে। অথচ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংগঠনের কোনো নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করে নিজেকে সভাপতি হিসেবে জাহির করছেন ইউসুফ। সদস্যদের অভিযোগ, এটি চরম স্বেচ্ছাচারিতা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয় ২০০৪ সালে। এর আগে সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হয়। এরপর থেকে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। প্রতিটি কমিটির মেয়াদ তিন বছর। দেশের স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত সরকারি গাড়িচালকেরা এ সমিতির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার ২০০। কোনো সদস্য অবসরে গেলে তার সদস্যপদ থাকবে কি না, তা গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও অবসরপ্রাপ্ত অনেক গাড়িচালকই ভোটে অংশ নিয়ে থাকেন।
.png)
জানা গেছে, প্রকল্প থেকে চাকরি রাজস্ব খাতে যাওয়ার সুবাদে ২০০২ সাল থেকেই ইউসুফ বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির সদস্য। তবে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কোনো কার্যনির্বাহী কমিটিতে স্থান পাননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের অক্টোবরে গঠিত ৩১ সদস্যের কমিটিতে পূর্বে কারাভোগের ঘটনাকে পুঁজি করে সিনিয়র সহ-সভাপতি-১ পদ বাগিয়ে নেন ইউসুফ—এমন অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই ইউসুফের স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন সমিতির একাধিক সদস্য। পরিচালক (প্রশাসন)-এর গাড়ি চালানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি গত ৫ জুলাই মো. ইউসুফ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে স্মারক হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার ফাইল নম্বর ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সাধারণত গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির চিঠিতে সমিতির নিজস্ব ফাইল নম্বর ব্যবহারের কথা। কিন্তু গাড়িচালক হয়েও ইউসুফ চিঠি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসন শাখার কর্মকর্তাদের ফাইল নম্বর ব্যবহার করেছেন, যা তার এখতিয়ারবহির্ভূত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে হামলা-মামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়েই মো. ইউসুফ কথিত কমিটি গঠন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে সমিতির পক্ষ থেকে রাজধানীর মহাখালীর আনন্দ রেস্টুরেন্টে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদিন ফারুক। অনুষ্ঠানে অন্যান্য অতিথির মধ্যে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কোষাধ্যক্ষ মোস্তাক রহিম স্বপন এবং বর্তমান ভূমি সচিব সালেহ আহমদ খান উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় কামরুজ্জামান স্বপনের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ওই হামলার মূল হোতাকেই এখন ইউসুফ ঘোষিত কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. শহীদ মিয়া চাকরি থেকে অবসরে যান। এরপর গত ১০ জুলাই সদ্য অবসর নেওয়া সমিতির সদস্যদের নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ে একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন মো. ইউসুফ। তবে এ বিষয়ে সমিতির সভাপতি মো. শহীদ মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফকে কিছুই জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। যারা উপস্থিত হতে পারেননি, তাদের সঙ্গেও ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে কারও কারও কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ওই স্বাক্ষরকে রেজুলেশন হিসেবে দেখিয়ে নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করেন ইউসুফ এবং কমিটির অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে যান। কিন্তু এ সময় কমিটির সভাপতি মো. শহীদ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফসহ অনেকেই উপস্থিত না থাকায় বিষয়টি মহাপরিচালকের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে মহাপরিচালক ওই কমিটির অনুমোদন না দিয়ে কাগজপত্র রেখে দেন বলে জানা গেছে। অথচ ইউসুফ ছবিসহ ব্যানার টাঙিয়ে নিজেকে সভাপতি হিসেবে প্রচার করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ বলেন, ‘আমি গত রমজানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরাতন ভবনে একটি ইফতার মাহফিলে সবশেষ অংশগ্রহণ করেছি। এরপর আমি একদিনের জন্যও আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যাইনি। পাশাপাশি এই কমিটির বিষয়ে আমাকে কিছু জানানোও হয়নি। শুনেছি আমাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে। ছবিসহ ব্যানার বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি তাদের বলেছি, কাঁচি দিয়ে ব্যানার থেকে আমার ছবি কেটে ফেলে দিতে। এই কমিটিতে আমার থাকার ইচ্ছা নেই।’ কারণ জানতে চাইলে মো. হানিফ বলেন, ‘পদের চেয়ে মানুষ হিসেবে নিজের মানসম্মান বাঁচানো জরুরি। আমি আমার মানসম্মান নষ্ট করতে পারব না। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’
গত কমিটি গঠনের পর থেকে তিন বছর মেয়াদের হিসেবে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন মো. শহীদ মিয়া। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি কারা কারা একটা কমিটি করেছে। কিন্তু আমাকে কেউ কিছু বলেনি। এমনকি আমার কমিটির সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তিনিও কিছু জানেন না।’
অবসরে যাওয়ার পর কমিটির দায়িত্বে থাকা যায় কি না—এ বিষয়ে মো. শহীদ মিয়া বলেন, ‘আমি অবসরে গেছি, ঠিক আছে। অবসরে যাওয়ার পরও তো ভোটাধিকার থাকছে। সে হিসেবে সভাপতি থাকা অবস্থায় অবসরে গেলে মেয়াদ পূর্ণ করতে সমস্যা হওয়ার কথা না। এরপরও সদস্যদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সভাপতি পরিবর্তন করতে চাইলে করবে। কিন্তু একটা নিয়মের মধ্যে দিয়ে তো যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সভা ডেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘একই পদে একাধিক প্রার্থীও থাকতে পারে। যদি একাধিক প্রার্থী থাকে, তাহলে ভোটের আয়োজন করে একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটবে। এখন একজন এসে দাবি করল যে আজ থেকে আমি সভাপতি, আর সে সভাপতি হয়ে গেল—বিষয়টা তো এমন হওয়ার সুযোগ নেই।’
গাড়িচালক সমিতির একাধিক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, ৫ আগস্টের পর গাড়িচালক ইউসুফ খুবই বেপরোয়া আচরণ করছেন। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছেন না তিনি। পরিচালক (প্রশাসন)-এর গাড়ি চালানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সদস্য বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আর কোনো মালেকের আবির্ভাব হোক, আমরা তা চাই না।’
নিজেকে সভাপতি দাবি করা গাড়িচালক মো. ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের যিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি অবসরে চলে গেছেন। যেহেতু আমি সিনিয়র সহ-সভাপতি-১ ছিলাম, সেহেতু সভাপতির পদ আমারই পাওয়ার কথা। তাই তাকে বাদ দিয়ে আমরা মিলেমিশে একটি কমিটি করে নিয়েছি।’ভোট গ্রহণ বা গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো নির্বাচন হয়নি। তবে সবারই সম্মতি ছিল।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন কি না—জানতে চাইলে ইউসুফ বলেন, ‘ডিজি স্যারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি এখনো স্বাক্ষর করেননি। দ্রুত তিনি এই কমিটির অনুমোদন দিয়ে দেবেন বলে আশা করি।’ডিজির অনুমোদন না থাকলে নিজেকে সভাপতি দাবি করছেন কীভাবে—এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি মো. ইউসুফ।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে সহকারী পরিচালক (কো-অর্ডিনেটর) ডা. নুরুল হককে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি, মহাপরিচালক মহোদয়ের কাছে বেশ কয়েক দিন আগে নতুন কমিটির তালিকা জমা দিয়েছেন। স্যার এখনো অনুমোদন দেননি।’
জানা গেছে, কমিটি অনুমোদনের কাগজপত্র নিয়ে মহাপরিচালকের কক্ষে যাওয়ার পর তিনি আগের কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত না পেয়ে অনুমোদন দেননি। তিনি কাগজপত্র রেখে দিয়ে পরে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।