ফলে নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং রপ্তানি পণ্য ওঠানামায় ব্যাঘাত ঘটছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো ও লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন আরও বাড়ায় জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন ১২টি উড়োজাহাজের বিপরীতে পার্কিং ফি ও চক্রবৃদ্ধি হারে সারচার্জসহ বেবিচকের মোট পাওনা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা। ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি এবং অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের একটি।
.png)
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে বেবিচক। অনেক আগেই এগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। বারবার চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েও মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিমান সরিয়ে নেয়নি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধকগ্রহীতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল। তবু কোনো সাড়া মেলেনি।
জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ করে। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় ২০১৬ সালে। আর করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে ২০২০ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে যায় রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কার্যক্রম। একসময় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করা এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণের চাপে ধীরে ধীরে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিগুলোর কর্ণধাররা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের জায়গা দখল করে রেখেছেন। অথচ ওই এলাকা থেকেই বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জায়গা দখল হয়ে থাকায় বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি বাড়লে এ সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে জায়গা খালি করতে ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং ২০২২ সালজুড়ে দেশি-বিদেশি দরপত্র আহ্বান করে নিলামের চেষ্টা চালায় বেবিচক। কিন্তু উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ১০ থেকে ১১ বছর খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় উড়োজাহাজগুলোর ইঞ্জিন, অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডিং গিয়ারে ব্যাপক ক্ষয় ধরেছে। এগুলোকে পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো মডেলের—ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩ ও বোয়িং ৭৩৭-৩০০। বিশ্বব্যাপী এসব মডেলের ব্যবহারও এখন সীমিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মালিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলা। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতারাও আইনি জটিলতায় জড়াতে চাইছেন না।
এ অবস্থায় গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বেবিচক জানিয়েছে, ক্রেতা না পাওয়া গেলে উড়োজাহাজগুলো ওজনভিত্তিক হিসেবে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বেবিচক ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, উন্মুক্ত দরপত্রে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নিলে বাজারভিত্তিক সর্বোচ্চ দর পাওয়া সম্ভব হবে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজের মূল্যায়ন করতে সক্ষম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়ন করাতে গেলে এর ব্যয় সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে। এ কারণে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দর পাওয়ার পদ্ধতি বেছে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাজে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সহযোগিতাও চেয়েছে বেবিচক।
বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। সেগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে সেগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।’
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, ‘উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে বিশাল অর্থ পাবে বেবিচক। ওসব উড়োজাহাজের জন্য বিমানবন্দরে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে।’
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেবিচকের প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এবং ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শেষে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো সরানো প্রয়োজন, যাতে কার্গো এলাকার সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন নিশ্চিত করা যায়।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকারি সম্পদ রক্ষা ও বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর স্বার্থে এসব পরিত্যক্ত বিমান দ্রুত সরানো জরুরি। ওজনভিত্তিক বিক্রির বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।’
বিমান খাতের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখছেন। সাবেক বেবিচক কর্মকর্তা ও বিমান বিশেষজ্ঞ এয়ার কমডর (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এত বছর ধরে এসব বিমান পড়ে থাকাটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বিমানবন্দরের ভাবমূর্তিরও ক্ষতি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিত্যক্ত বিমান দ্রুত অপসারণের নীতি থাকা উচিত। ওজনভিত্তিক বিক্রি হলে অন্তত জায়গা খালি হবে এবং কিছু রাজস্ব আসবে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দরকার।’
আরেক বিমান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পাইলট ক্যাপ্টেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘পুরনো মডেলের এসব বিমান এখন আর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রিই বাস্তবসম্মত। তবে ব্যাংকঋণ ও মামলার জটিলতা সমাধান না হলে ক্রেতারা আসবে না। সরকারকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
অর্থনীতিবিদ ও অবকাঠামো বিশ্লেষক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘চার হাজার কোটি টাকার পাওনা আদায় না হওয়া রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি। কার্গো এলাকার জায়গা খালি হলে রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের আগে বলেছিলেন, জায়গা খালি হলে সেখানে অতিরিক্ত বে পার্ক তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি রপ্তানি-আমদানিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে উড়োজাহাজগুলো চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। দীর্ঘদিন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এগুলো এখন কার্যত শুধু ওজনের বস্তু। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র হলে ধাতব অংশ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ কেনার জন্য দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাতে পারে। তবে ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণদাতার দাবি নিষ্পত্তি না হলে আইনি জটিলতা থেকেই যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিষয়টি শুধু একটি বিমানবন্দরের পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ সরানোর সমস্যা নয়; এটি দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতিরও প্রতিফলন। একদিকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার পাওনা আটকে আছে, অন্যদিকে বিমানবন্দরের মূল্যবান অপারেশনাল জায়গা বছরের পর বছর ব্যবহারের বাইরে রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে বেবিচক দ্রুত আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এতে শাহজালালের অ্যাপ্রোন থেকে দীর্ঘদিনের ‘মৃত’ বিমানগুলো সরিয়ে কার্গো ও পার্কিং সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে বিমানবন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা, রপ্তানি বাণিজ্য এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, শুধু এসব বিমান বিক্রি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ভবিষ্যতে কোনো এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেলে বা কোনো উড়োজাহাজ পরিত্যক্ত হলে দ্রুত অপসারণের জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে শাহজালালের অ্যাপ্রোনে তৈরি হওয়া এই ‘বিমান কবরস্থান’-এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।