রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রায় ঘোষণা করা হবে।
ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বি এম তারিকুল কবীর এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন।
.png)
এর আগে গত ১৬ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছিলেন আদালত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রায় প্রস্তুত না হওয়ায় তা পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করা হয়।
মামলায় সোহেল রানার সঙ্গে অন্য আসামিরা হলেন—সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রায় ঘোষণার দিন তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হবে।
এদিকে মামলার দুই আসামি মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক রয়েছেন। জামিনে থাকা অন্য আসামিদেরও আদালতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর আদালত মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। ফলে বর্তমানে আট আসামির বিরুদ্ধে মামলার বিচার শেষ হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই শিল্পদুর্ঘটনায় এক হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন ভবনটিতে থাকা পোশাক কারখানার শ্রমিক। এ ঘটনায় আহত হন আরও বহু মানুষ।
ভবন ধসের পর রানা প্লাজা নির্মাণে নকশা অনুমোদন, অনুমোদনের বাইরে ভবনের কাঠামো পরিবর্তন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং সেখানে পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধানের পর নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। প্রাথমিকভাবে সোহেল রানাকে মামলায় আসামি করা হয়নি, কারণ ভবনটি তার বাবা আবদুল খালেকের নামে ছিল।
তবে পরবর্তী তদন্তে ভবনটির নির্মাণ, অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্ত শেষে সোহেল রানা, তার বাবা-মাসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেয় দুদক। পরে অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে অব্যাহতি দিয়ে ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা ও মায়ের মৃত্যু হলে তাদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফলে আট আসামির বিরুদ্ধে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ‘রানা প্লাজা’ নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা নকশা অনুমোদন দেয়। পরে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ভবনটির ওপর আরও চারটি তলা নির্মাণের অনুমোদনের আবেদন করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ভবনটি মূলত শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে অনুমোদন পেলেও পরে সেখানে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। ভবনের নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা পরিচালনার অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
এসব অনিয়মের কারণে ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের অনুমোদিত ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি এখন রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দীর্ঘ ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ মামলার রায়কে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তিতে আজকের রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।