ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আইন-আদালত ]

বিচারিক আদালতের ৯৮% মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর হয়নি

আদালত প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:১৫, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিচারিক আদালতের ৯৮% মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর হয়নি
সংগৃহীত ছবি

দেশের বিচারিক আদালতে গত ১৬ বছরে ৩ হাজার ৮৭৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪৭ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের ৯৮ শতাংশের বেশি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

উচ্চ আদালতে অধিকাংশ মামলায় মৃত্যুদণ্ড কমে যাওয়া, পরিবর্তন বা বাতিল হওয়ার কারণেই এমন চিত্র দেখা গেছে।

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বিভিন্ন মামলায় বিচারিক আদালতে একসঙ্গে একাধিক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় ২০১৯ সালে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট তাঁদের মধ্যে মাত্র দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে বিচারিক আদালতের বিচারকের বিচারিক মানসিকতা ও বিবেচনাবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, রায় দেওয়ার সময় বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথ বিচারিক মানসিকতা ও বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেননি। তাঁকে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এরপরও বিচারিক আদালতে একসঙ্গে একাধিক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি থামেনি। গত মঙ্গলবার ঢাকা, জামালপুর, ভোলা ও ময়মনসিংহে হত্যা ও ধর্ষণের চার মামলায় ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুতর অপরাধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে অপরাধের ধরন, আসামির ভূমিকা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে ঢালাওভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।

হাইকোর্টে বদলে যাচ্ছে অধিকাংশ সাজা

বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বড় একটি অংশ উচ্চ আদালতে গিয়ে টিকছে না।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চে গত জুনের মাঝামাঝি থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ২০টি ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের রায় পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলায় বিচারিক আদালত ৪৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। এর মধ্যে হাইকোর্টে বহাল রয়েছে মাত্র ১৩ জনের সাজা। অর্থাৎ প্রায় ৭৪ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড বাতিল বা পরিবর্তন হয়েছে।

পর্যালোচনা করা ২০টি মামলার প্রায় সবই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা। এর মধ্যে স্ত্রী হত্যা ১০টি, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা চারটি, নারী হত্যা একটি, ধর্ষণ একটি, অপহরণ একটি, দলবদ্ধ ধর্ষণ একটি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা একটি এবং ডাকাতিসহ হত্যা একটি মামলা রয়েছে।

হাইকোর্ট ৩৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড রহিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। ১৭ জন খালাস পেয়েছেন। অপর একজনের আট বছর কারাভোগকে সাজা হিসেবে গণ্য করে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনচাপের প্রভাব

আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচারকদের মতামত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু বিচারকের মধ্যে ব্যাপকহারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর পেছনে বিভিন্ন ধরনের জনচাপও ভূমিকা রাখছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে উচ্চ আদালত মামলার নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্তের দুর্বলতাগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়।

তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষীর বক্তব্যে অসঙ্গতি, আসামির বয়স ও অসুস্থতা, নারী আসামি, দীর্ঘদিন কনডেমড সেলে থাকা, উচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী নজির এবং আসামি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কি না—এসব বিষয়ও সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ের বিষয়ে উচ্চ আদালত আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে। অনেক ক্ষেত্রে নজিরভিত্তিক পর্যালোচনাও করা হয়। তবে বিচারিক ও উচ্চ আদালতের রায়ের মধ্যে ব্যাপক বৈপরীত্য থাকা উচিত নয়।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এস এম শাহজাহান বলেন, অপরাধীর সাজা নিশ্চিত না হলে সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া কঠিন। তবে ঢালাওভাবে সাজা দেওয়াও সেকেলে মানসিকতা। অপরাধের মাত্রা ও নৃশংসতা অনুযায়ী সাজা হওয়া উচিত। একই সঙ্গে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিচারব্যবস্থায় ভারসাম্য আসবে।

বছরে গড়ে ২৪২ মৃত্যুদণ্ড

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারিক আদালতে ৩ হাজার ৮৭৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১৬ বছরে বছরে গড়ে ২৪২ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে মাত্র ৪৭ জনের।

২০১০ সালে ৭৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে ফাঁসি কার্যকর হয় নয়জনের। ২০১১ সালে ৯৭ জনের মধ্যে চারজন, ২০১২ সালে ৭৭ জনের মধ্যে একজন এবং ২০১৩ সালে ২৯১ জনের মধ্যে দুজনের ফাঁসি কার্যকর হয়।

২০১৪ সালে ১৭৬ জন এবং ২০১৫ সালে ১৭৩ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। ২০১৫ সালে তিনজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০১৬ সালে ২৪১ জনের মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে সাতজনের, ২০১৭ সালে ৩০৩ জনের মধ্যে তিনজনের এবং ২০১৮ সালে ৩১৯ জনের মধ্যে কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

২০১৯ সালে ৩২৭ জনের মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে দুজনের, ২০২০ সালে ২১৮ জনের মধ্যে দুজনের এবং ২০২১ সালে ৩২০ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০২২ সালে ৩৩৮ জনের মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে চারজনের এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩৯০ জনের মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়।

২০২৪ সালে ৩০৭ জন এবং ২০২৫ সালে ২২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তবে এই দুই বছরে কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্তও কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।

কনডেমড সেলে বছরের পর বছর

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলে কারাবিধি অনুযায়ী আসামিকে কারাগারের বিশেষ সেল বা কনডেমড সেলে রাখা হয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর সময় লাগায় অনেক আসামিকে দীর্ঘ সময় এই সেলে থাকতে হয়। উচ্চ আদালতে খালাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁদের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতিতে কারও কারও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি জেডআই খান পান্না বলেন, যে সাজা উচ্চ আদালতে টেকে না এবং কার্যকরও হয় না, সেই সাজা দিয়ে কাউকে দীর্ঘদিন মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে রাখার যৌক্তিকতা নেই। শুধু মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিবর্তে অপরাধের কারণ এবং অপরাধপ্রবণতা কমানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, মানুষ দিয়েই মানুষের বিচার করতে হয়। তাই ভুলের আশঙ্কা থেকেই সাক্ষ্য, নথি ও প্রমাণের বিধান রাখা হয়েছে। বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেই তা কার্যকর হয় না; এ জন্য হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিচারকদের আরও সুনির্দিষ্ট জ্ঞান তৈরিতে উচ্চ আদালতের বিচারক ও অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এ আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!