ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

মূল্যায়ন সংকটে আমাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

কে এম মোস্তাক আহম্মেদ
প্রকাশিত: ০২:৫৫, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মূল্যায়ন সংকটে আমাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
কে এম মোস্তাক আহম্মেদ

পাবলিক পরীক্ষায় যখন ৫৬ হাজার ২৫১টি খাতার ফল পরিবর্তন করতে হয়, তখন সেই মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা এক বিরাট গলদের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন শিক্ষার্থী ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছিল। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লাখ ৫৬ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।

এতে ২৭ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং হাজার হাজার খাতার নম্বর সংশোধন করা হয়েছে। সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়া, ফেল থেকে পাস করা এবং গ্রেড পরিবর্তনের এমন ঘটনা দেশের ইতিহাসে বিরল।

Advertisement

ফল প্রকাশের পর থেকে টানা এক মাস ধরে যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক চরম মানসিক যন্ত্রণা ও ট্রমার মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন, সেই দায়ভার আসলে কে নেবে? শিক্ষার্থীরা তো তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু আমাদের ঢিলেঢালা ও তাড়াহুড়োর মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে তাদের যে মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। দুঃখজনক বিষয় হলো, দিন দিন এ ভুলের সংখ্যা ও ধরন দুটোই বাড়ছে।

শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা- সব মিলিয়ে পুরো শিক্ষা কাঠামোর এই সংকট কোনো হুট করে দেওয়া বক্তব্যে সমাধান হবে না। কিছু শিক্ষককে ভয় দেখিয়ে বা সাময়িক কড়াকড়ি আরোপ করে এমন গভীরে শিকড় গেড়ে বসা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশাল গবেষণা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং নতুনত্বের ধারণা; কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এসব নিয়ে চিন্তা করবে? আমরা প্রায়ই শুনি বড় বড় পরিকল্পনার কথা, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কী করছে সেগুলোর উপমার কথা। অথচ আমাদের ঘরের আসল সমস্যায় হাত দেওয়া হয় না। তখনকার দিনে এক-দুটি বোর্ডে এমন ঘটনা ঘটত; কিন্তু বর্তমানে তা শত শত ছাড়িয়ে হাজার হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। তা হলে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

প্রতি বছরই পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় এলে আমরা বলিতাড়াহুড়ো করে শিক্ষকদের দিয়ে খাতা দেখানো ঠিক নয়। বিগত সরকারের সময় মন্ত্রীরা ঢালাওভাবে উল্লাস প্রকাশ করতেন যে, পাবলিক পরীক্ষার ফল তিন মাসের বদলে দুই মাসের কম সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে; কিন্তু গুণগত মান নিশ্চিত না করে নির্ধারিত সময়ের আগে ফল প্রকাশ করা কোনো অর্জন হতে পারে না। এই সরকারও একই তাড়াহুড়ো করে ফল প্রকাশ করল, যার পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি এত বিশালসংখ্যক খাতার ফল পরিবর্তনের মাধ্যমে।

আমরা যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর বা মেশিননির্ভর হয়ে পড়ছি, তত যেন আমাদের কাজের মানবিক সচেতনতা কমে যাচ্ছে। আমাদের সময়ে শিক্ষকরা খাতা দেখতেন নিজে এবং হাত দিয়েই ফল তৈরি করতেন। আর এখন এত কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে ফল তৈরি করার পরও যদি এই ধরনের করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দেশের নামকরা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক শিক্ষকই এখন বোর্ডের খাতা দেখতে চান না। এর প্রধান কারণ, তাদের অনেকেই কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে ব্যস্ত থাকেন, যেখানে উপার্জনের পরিমাণ অনেক বেশি। বোর্ডের খাতা দেখে তারা যে অর্থ পান, তা তাদের কাছে সামান্য মনে হয়; কিন্তু বোর্ডের খাতা দেখা তো কেবল কিছু উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি পুরো শিক্ষাদান পদ্ধতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকলে, বছরের পর বছর এটি নিয়ে কাজ না করলে শিক্ষাদানের কৌশল পুরোপুরি আয়ত্তে আসে না, একজন প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে গড়ে ওঠা যায় না।

এ ক্ষেত্রে সরকার কি জোর করে তাদের দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করাবে? জোর করে করালে কি ভালো ফল আসবে? নিশ্চিতভাবেই না। বরং ভালো প্রতিষ্ঠানের ভালো শিক্ষকদেরই নিজ দায়িত্বে ও নৈতিক স্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

অনভিজ্ঞ ও ভালো শিক্ষকদের অনিচ্ছার কারণে বোর্ডগুলো বাধ্য হয়ে অনভিজ্ঞ, একদম নতুন এবং অনুপ্রেরণাহীন শিক্ষকদের হাতে খাতা তুলে দেয়। বহু শিক্ষককে আমি দেখেছি, যারা বোর্ডের খাতা দেখার মতো ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন নন। তারা বোর্ড থেকে খাতা এনে নিজে না দেখে স্ত্রী, সন্তান কিংবা নিজস্ব শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করান। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করার তাগাদায় বোর্ডগুলোকেও দ্রুত খাতা জমা নিতে হয়।

আমার মনে আছে, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে থাকাকালে কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খাতা জমা দিয়ে আসার পরও ফোনে অনুরোধ করতেন আরও খাতা নেওয়ার জন্য। এর দুটি কারণ ছিল- প্রথমত, ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের ওপর তাদের আস্থা ছিল যে তারা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবেন। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ খাতা দেখানোর মতো যোগ্য শিক্ষক তারা পেতেন না। ফলে অনেকে তিন-চারবার করেও খাতা আনতেন, যা মানসম্মত মূল্যায়নের পরিপন্থি। আবার কিছু অনুপযুক্ত শিক্ষক বোর্ডের কর্মকর্তা বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পিএদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বারবার খাতা হাতিয়ে নেন। বিগত সরকারের আমলে যেহেতু ফেল করানোর নজির কম ছিল, তাই এসব অসাধু শিক্ষক বেশি বেশি নম্বর দিয়ে পাস করানোর প্রতিযোগিতায় নামতেন। ফলে মূল্যায়নের মারাত্মক সব গাফিলতি আড়ালেই থেকে যেত।

সব ধরনের শিক্ষকের হাতে ঢালাওভাবে খাতা পরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট ও যোগ্য অল্পসংখ্যক শিক্ষকের হাতে খাতা দিতে হবে এবং তাদের পারিশ্রমিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে প্রথম পরীক্ষকের দেখা খাতা অবশ্যই দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে পুনর্নিরীক্ষণ করানোর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শিক্ষা বোর্ডগুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাই এসব পরিবর্তন আনতে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরাই যথেষ্ট; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা থাকেন, তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া নিজেরা কিছুই করতে চান না বা পারেন না। এর মূল কারণএসব পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে হয় না। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে কে কার স্বজন, কে কার দলীয় সমর্থকতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে অখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যিনি কোনো দিন শিক্ষাবিষয়ক কোনো উদ্ভাবন বা দূরদর্শিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তিনিও প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হয়ে বসেন। তাদের পক্ষে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। কারণ এই পদে কাজ করতে হলে নৈতিক সাহস, অগাধ পড়াশোনা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি থাকতে হয়।

যারা শিক্ষা প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আসেন, তাদের অনেকে ভালো শিক্ষকও নন, আবার ভালো প্রশাসকও নন। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষাদান এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তাই একদল শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাদানের দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচতে মারাত্মক লবিং করে প্রশাসনিক এসব পদ দখল করেন। কিন্তু সরকারি দলের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মানিয়ে চলার যে অভিজ্ঞতা তাদের থাকে, তা দিয়ে তো আর শিক্ষা প্রশাসন চালোনো যায় না।

রাজনীতিবিদ বা সরকারের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষার গভীরের এসব সূক্ষ্ম সমস্যা পুরোপুরি বুঝবেন না, সমাধানও তারা প্রস্তুত করে দেবেন না। এর জন্য শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক যে পদেই থাকুন না কেন, ভুলে গেলে চলবে না যে আপনি একজন শিক্ষক এবং পুরো শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শিক্ষার মান রক্ষা করা সম্ভব নয়। ৫৬ হাজার খাতার ফল পরিবর্তনের এই লজ্জা কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ধসে পড়ার সংকেত। শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ানো, মূল্যায়নে স্বচ্ছতা আনা, কম্পিউটার সেকশনের দুর্নীতি রোধ করা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের উপযুক্ত স্থানে বসানোর মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের নিরসন হতে পারে। অন্যথায়, প্রতি বছর ফল পুনর্মূল্যায়নের নামে আমরা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলতেই থাকব।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, শীর্ষ অর্থনীতি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!