ঢাকা,  শনিবার   ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

আমরা মানুষ- তবু কেন একে অপরকে মানুষ হিসেবে দেখতে পারি না!

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:২৩, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমরা মানুষ- তবু কেন একে অপরকে মানুষ হিসেবে দেখতে পারি না!
আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যখন একটি যন্ত্রও মানুষের উপকারে তৈরি হতে পারে, অথচ মানুষ নিজেই কখনো কখনো মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আমি এই যন্ত্রটিকে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে দেখি না; তার কাজটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, পরিচয় নয়। তাহলে আমরা মানুষ কেন একে অপর

কখনো কখনো ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, এই পৃথিবীটা আসলে কার? এই আকাশ, এই বাতাস, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, পাখির গান, ফুলের সুবাস, বৃষ্টির জল, সূর্যের আলো, এসবের কোনোটির ওপর কি কোনো মানুষের একক মালিকানা আছে? ভোরের সূর্য যখন পৃথিবীর এক প্রান্তে আলো ছড়িয়ে দেয়, তখন সে তো জানে না কোথায় কোন দেশের সীমান্ত।

কোথায় কোন জাতি বা ধর্মের মানুষের বসতি। বাতাসও জানে না কে তার শ্বাস নিচ্ছে। বৃষ্টি নামার আগে কোনো মানুষের পরিচয় জানতে চায় না। নদী তার জল বয়ে নেওয়ার আগে কোনো পাসপোর্ট দেখে না। প্রকৃতি যেন কোনো বিভাজন চেনে না। তবু মানুষ চেনে।

মানুষই পৃথিবীর বুকে রেখা টেনেছে। এখানে আমার, ওখানে তোমার। তারপর সেই রেখা বড় হয়েছে, আরও বড় হয়েছে। একসময় শুধু মাটির ওপর নয়, মানুষের মনেও সীমান্ত তৈরি হয়েছে।

Advertisement

ধর্মের দেয়াল, জাতির দেয়াল, বর্ণের দেয়াল, ভাষার দেয়াল, ভ‚খন্ডের দেয়াল, মতের দেয়াল, পরিচয়ের দেয়াল তৈরি হয়েছে। যে পরিচয়গুলো আমাদের একে অপরকে চিনতে সাহায্য করতে পারত, সেগুলোই আমাদের একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ভালোবাসার সেতু হওয়ার বদলে পরিচয়গুলো দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর দেয়ালের এপাশে দাঁড়িয়ে আমরা ওপাশের মানুষটিকে অপরিচিত, প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু ভাবছি। 

কিন্তু একটু থামলে কি আমরা নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করতে পারি না? এই দেয়ালগুলো কে বানিয়েছে? স্রষ্টা, নাকি আমরা? পৃথিবীর এ প্রান্ত আর অপর প্রান্তে জন্ম নেয়া মানব শিশুর কান্নার ভাষা কি আলাদা? ক্ষুধা কি আলাদা? মায়ের স্পর্শের প্রয়োজন কি আলাদা? ভালোবাসা পাওয়ার আকাক্সক্ষা কি আলাদা কিছু?

একটি শিশু পৃথিবীতে আসার সময় ঘৃণা নিয়ে আসে না। সে প্রথমে খোঁজে মায়ের মুখ, উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা। তারপর আমরা তাকে পরিচয় শেখাই। বলতে শুরু করি, তুমি এই, ওরা ওই। এটা তোমার, ওটা তাদের। এরা তোমার মানুষ, ওরা অন্য মানুষ।

এভাবেই মানুষের ভেতর তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল! আমরা নিজেদের ছোট ছোট ঘরে বন্দি করে ফেলেছি। অথচ পৃথিবী আমাদের জন্য কত বিশাল একটি ঘর খুলে রেখেছিল।

কিন্তু কেন? স্রষ্টা তো পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সবার জন্য। তাহলে এই বিভাজন কেন? ঘৃণা কেন? ক্রোধ কেন? কেন একজন মানুষের পরিচয় আরেকজন মানুষের প্রতি আমাদের ভালোবাসাকে ছোট করে দেবে? কেন আমার দেশকে ভালোবাসতে হলে অন্য দেশের মানুষকে অপছন্দ করতে হবে? কেন আমার পরিচয়কে বড় করতে হলে অন্যের পরিচয়কে ছোট করতে হবে? 

আমি জানি, মানুষের ইতিহাস সহজ নয়। বিশ্বাস, সংস্কৃতি, জাতি, ভাষা, ভূখন্ড, এসব মানুষের অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো মানুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই এগুলো মুছে ফেলার কথা বলছি না। আমি শুধু বলতে চাই, পরিচয় যেন দেয়াল না হয়। 

পরিচয় আমাদের শিকড় হতে পারে; কিন্তু শিকড় যেন অন্যের শিকড়কে ঘৃণা করতে না শেখায়। আমরা আমাদের বিশ্বাসকে ভালোবাসব; কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন অন্যের প্রতি ঘৃণায় পরিণত না হয়। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসব; কিন্তু পৃথিবীকে ভুলে গিয়ে নয়। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করব; কিন্তু অন্য সংস্কৃতিকে অপমান করে নয়।

কারণ পৃথিবীটা তো শেষ পর্যন্ত আমাদের কারও একার নয়। এই উপলব্ধি আমার কাছে শুধু একটি চিন্তা নয়। দীর্ঘ জীবন আমাকে ধীরে ধীরে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আমি দূরপরবাসী।

কাছে থেকেও দূরে, দূরে থেকেও বহু মানুষের কাছে। জীবনের দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে বসবাস করেছি। তাদের ভিন্ন ভাষা শুনেছি। ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের আনন্দ ও বেদনার কাছাকাছি গিয়েছি। 

দেখেছি- মানুষ যতই ভিন্ন হোক, তার হাসি-কান্না, ভালোবাসা, ভয়, একাকিত্ব, স্বপ্ন, এসবের মধ্যে রয়েছে গভীর মিল। আর শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি তার জীবন। দেখেছি ঋতুর সঙ্গে তার পরিবর্তন।

দেখেছি ছোট ছোট প্রাণীর বেঁচে থাকার চেষ্টা। দেখেছি পাখির ফিরে আসা। ফুলের ফোটা। গাছের নীরব বেড়ে ওঠা। কখনো কখনো মনে হয়েছে, তারা যেন কথা না বলেও আমাকে অনেক কিছু বলে যাচ্ছে।

তাদের দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আর সেই মুগ্ধতার ভেতর দিয়ে বারবার অনুভব করেছি এক অসাধারণ স্রষ্টার উপস্থিতি। একটি ছোট ফুলের মধ্যে যে সৌন্দর্য, একটি পাখির জীবনের যে ছন্দ, একটি গাছের নীরবতায় যে ধৈর্য, একটি বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে সম্ভাবনা, এসবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরও ক্ষুদ্র মনে হয়েছে। 

আমি তো এই বিশাল সৃষ্টির মাঝে এক অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। দূরপরবাসী এক মানুষ, বহু মানুষের সঙ্গে বসবাস করা এক মানুষ। বহু প্রাণীর দেখা পাওয়া এক মানুষ। বহু প্রকৃতির মাঝে নিজের জীবনকে নতুন করে অনুভব করা এক মানুষ। আর এই ক্ষুদ্রতার অনুভ‚তিই হয়তো আমাকে একটি বড় প্রশ্নের কাছে নিয়ে এসেছে: যিনি এত অসীম সৃষ্টি করতে পারেন, তার সৃষ্টি মানুষকে আমরা এত ছোট ছোট পরিচয়ে কেন ভাগ করি?

মানুষের প্রার্থনাগুলোর দিকে তাকালেও এই প্রশ্ন আরও গভীর হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রার্থনার ভাষা আলাদা; কিন্তু সেই প্রার্থনার গভীরে গেলে দেখা যায়, মানুষ বারবার একই কিছু জিনিসের কাছে ফিরে আসে।

কেউ স্রষ্টার কাছে বলে, “আমাকে সাহায্য করো।” কেউ বলে, “আমার ভুল ক্ষমা করো।” কেউ বলে, “আমাকে শক্তি দাও।” কেউ বলে, “আমাকে সঠিক পথে রেখো।” কেউ বলে, “আমার হৃদয়কে ভালোবাসায় পূর্ণ করো।” কেউ বিপদের মধ্যে রক্ষা চায়, কেউ বিপদের মধ্যেও ভেঙে না পড়ার শক্তি চায়। কেউ আনন্দের সময় কৃতজ্ঞতা জানায়, কেউ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

শব্দ, ভাষা আলাদা হলেও সেখানে যেন আমরা একে অপরের খুব কাছাকাছি। হয়তো এ কারণেই দোয়া কুনুতের বিনয়ী আত্মসমর্পণ, হজরত মূসা (আ.)-এর শক্তি ও হৃদয়ের প্রশস্ততার প্রার্থনা, কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিপদের মধ্যে শক্তি চাওয়ার আকুতি, এসব পড়তে গিয়ে একজন মানুষ নিজের হৃদয়ের কথাও খুঁজে পেতে পারে। তখন প্রার্থনা আর শুধু চাওয়া থাকে না। 

প্রার্থনা হয়ে ওঠে নিজের কাছে ফিরে আসা। নিজের অহংকারকে ছোট করা। নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা এবং স্রষ্টার অসীমতার সামনে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞ হওয়া।

আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যখন একটি যন্ত্রও মানুষের উপকারে তৈরি হতে পারে, অথচ মানুষ নিজেই কখনো কখনো মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আমি এই যন্ত্রটিকে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে দেখি না; তার কাজটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, পরিচয় নয়। তাহলে আমরা মানুষ কেন একে অপরকে প্রথমে মানুষ হিসেবে দেখতে পারি না?

লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!