ঢাকা,  শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন

ড. মারুফ মল্লিক
প্রকাশিত: ২০:২৪, ৬ নভেম্বর ২০২৬
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন
ফাইল ছবি

নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই নবীন এই দেশে চেপে বসে একদলীয় বাকশালি শাসন। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মৃত্যুর মুখে পড়ে হাজারো মানুষ। এর সঙ্গে ছিল রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস ও নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ।

সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষ তখন দুঃশাসন ও দুর্ভিক্ষে দিশেহারা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনীতি। রাজনীতির এই সংকটময় সময়ে দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। চারদিকে হতাশা, ভয় ও আতঙ্ক। ১৯৭৫ সালের নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায় এমন পরিস্থিতিতেই সামনে আসে ৭ নভেম্বর।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মাপকাঠিতে এ দিনকে বিবেচনা করা যাবে না। দেশের রাজনীতিতে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ আজ যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তা ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় সম্ভব হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সারাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ওই দিনই বাংলাদেশ নিজের চলার পথ খুঁজে নেয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়েছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৭ নভেম্বর।

৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহের মূল চরিত্র ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেন—সামরিক কর্মকর্তা ও স্বল্পকালীন সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। তবে ৭ নভেম্বর সিপাহি ও জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানই হয়ে ওঠেন প্রধান চরিত্র। অন্যদিকে ষড়যন্ত্রের দায় নিয়ে দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়েন খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনে জাতি যখন নানা ধারায় বিভক্ত, তখন জাতি গঠনে ঐক্যের ডাক নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে হাজির হন জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে খালেদ মোশাররফ ও আবু তাহের টিকতে পারেননি। ওই সময় দেশের মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাঁরা তাল মেলাতে পারেননি।

স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। বিপরীতে মানুষ দেখেছে আওয়ামী লীগ ও জাসদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। একদিকে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করেছিল, অন্যদিকে জাসদ শুরু করেছিল জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি।

ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, জাসদের এককভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার সক্ষমতা ছিল না। ফলে জাসদ বা কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানকে অবলম্বন করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের শেষ অঙ্কে সিপাহি-জনতা জিয়াউর রহমানকে সামনে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জিয়াউর রহমানের গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহের আর টিকতে পারেননি। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে জাসদের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।

এরপরই জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন। প্রথমেই তিনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেন। বাকশালের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত উদার বাজারব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যান। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনীতির দুয়ার খুলে দেন। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নজরদারিও বজায় রাখেন।

জিয়াউর রহমানের আমলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নতুনভাবে কাজ শুরু করার সুযোগ পায়। এসব সংস্থার মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ প্রবেশ করে। এ অর্থ বিনিয়োগের ফলে এনজিও খাতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে থাকে। ক্ষুদ্রঋণের বিকাশও জিয়াউর রহমানের আমলেই ঘটে।

এসব কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জিয়াউর রহমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান রাজনীতিকেও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর আমলেই বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নিজ নামে রাজনীতি করার সুযোগ ফিরে পায়।

একই সঙ্গে অন্যান্য দলের পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়। জিয়াউর রহমান যুদ্ধোত্তর সময়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশের কল্যাণে সবাইকে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই ঐক্যের প্রতীক। আর সেই ঐক্যের মহানায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান যখন রাজনীতির মঞ্চে আসেন, তখন সারাবিশ্বেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। দেশে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটছিল। সামরিক শাসকেরা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ক্ষমতা দখল করছিলেন।

ব্রাজিলে তখন এক দশকের সামরিক শাসন চলছিল। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করে পিনোশে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। আর্জেন্টিনাতেও হোর্হে ভিদেলার সামরিক শাসন শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে আফ্রিকায় লিবিয়া ও মিসর কঠোর সামরিক শাসকদের হাতে পরিচালিত হচ্ছিল। আরব বিশ্বেও সামরিক শাসনের প্রভাব ছিল। সিরিয়া ও ইরাকে লৌহমানবেরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী থেকে শাসনক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান নিজেকে আলাদা করে নেন। অস্থিরতা দমন ও পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দ্রুতই দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যান। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে হতবিহ্বল জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছেন। সেই সাহসের ওপর ভর করেই ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান দেশের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

ফলে দেখা যায়, স্বাধীন ও স্বনির্ভর দেশ গঠনের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের পর সারাদেশের মানুষ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ৭ নভেম্বর।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!