অভিযোগের বিচার হবে আদালতে, জনতার হাতে নয়
২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর। মঙ্গলবার সন্ধ্যা। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া এলাকা। কিছু লোক ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামে একজনকে পিটিয়ে আহত করে ফেলে। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। শামীম আর তার স্ত্রীর ভেতর ফোনে কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে। তারপর এই ঘটনা।
লোকজনের পিটুনি থেকে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে। খানিকবাদে সেখানেও উত্তেজিত লোকজন গিয়ে শামীমকে হামলা করে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার অবস্থার অবনতি হয় এবং সে মারা যায়।
শামীমের পরিবার জানিয়েছে, শামীম মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিল। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কিংবা বিচার হওয়ার আগেই গণপিটুনিতে একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ অক্টোবর সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা উত্তরখোলা বিলে মাছ চুরির অভিযোগে ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল নামে ৫৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, ভোররাত তিনটার দিকে মাছের ঘের থেকে ১৫ থেকে ২০ জনের একটা দল তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করে। সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষিতিশ মন্ডলের মাথায় আঘাত করেছে। লোহার রড আর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সকাল আটটার দিকে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টার দিকে ডাক্তার ক্ষিতিশ মন্ডলকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের দাবি, ক্ষিতিশ মন্ডল নিজে মাছের ঘেরের মালিক ছিলেন।
ঘটনার দুটোর অভিযোগ আলাদা- একটাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে আর অন্যটিতে মাছ চুরির সন্দেহ। কিন্তু দুটো ঘটনার পরিণতি একই হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা বিচার হওয়ার আগেই মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের দরবারে হামলার পর তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবর, বাড়ি ও দরবারে হামলা চালানো হয়। তার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে।
২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারীতে পবিত্র কোরআন অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে শহীদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
এসব ঘটনার অভিযোগ, প্রেক্ষাপট ও তদন্তের ফল এক নয়। তবে এগুলো থেকে বুঝতে পারা যায় গুজব, ধর্মীয় উত্তেজনা বা কোনো অপরাধের সন্দেহকে কেন্দ্র করে জনগণের হাতে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা বহু বছর ধরে চলে আসছে।
তাহলে, আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তার বেঁচে থাকার অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে! যেখানে কোনো বক্তব্য, একটা অডিও, মাছ চুরির সন্দেহ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য একজন মানুষকে জনতার শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারে!
এই ব্যাপারটা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়। এটা আমাদের বিচারবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, আচরণ, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং নাগরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করে।
গণপিটুনি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
গণপিটুনিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, এই সহিংসতা বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে ৫১ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে। ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৯৭ জন। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯, প্রায় ৫৪ শতাংশ।
আসকের ১১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন আরও ১৭১ জন। এই সংখ্যা পুরো বছরের নয়। প্রথম নয় মাসের। ফলে ২০২৫ সালের পূর্ণ বছরের সঙ্গে তুলনা করে বার্ষিক প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রথম নয় মাসেই ১৭১ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দিচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান আসকের সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানভিত্তিক হিসাব। এটা দেশের প্রত্যেকটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নয়। তবু ধারাবাহিকভাবে এত মানুষের মৃত্যুর তথ্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এখানে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তিরা সবাই একই সামাজিক পরিচয় বা অবস্থানের নন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও এক রকম নয়। ২০২৫ সালের গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও ছিলেন। আসকের প্রতিবেদনে অন্তত সাতজন হিন্দু, তিনজন নারী ও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য আছে। রাজনৈতিক বিরোধ, ধর্মীয় উগ্রতা, গুজব এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে আসক এসব সহিংসতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অর্থাৎ গণপিটুনির বিপদ শুধু এরকম নয় যে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। কারণ এখানে বৈচিত্র্যময়। বিপদ হলো, সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জনতার এক অংশ নিজেরাই নিজেকে অভিযোগকারী, তদন্তকারী, বিচারক এবং শাস্তিদাতা- সব ভূমিকায় বসিয়ে দিচ্ছে।
অভিযোগ থেকে মৃত্যুদণ্ডে পৌঁছানোর এই অধিকার কে দিল
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রশ্ন তুলতে পারে। মাছ চুরির অভিযোগ সম্পত্তির নিরাপত্তা ও অপরাধের প্রশ্ন তুলতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজন আছে। তবে অভিযোগের গুরুত্ব যত ভারী হবে, তদন্ত ও বিচারের প্রয়োজনও তত বেশি হবে। অভিযোগ যত গুরুতর হবে, জনতার শাস্তি দেওয়ার অধিকার তত বাড়বে- আইনের যুক্তি এমন নয়। রাষ্ট্র বা আইন কখনো কাউকে এই সুযোগ দেয়নি।
কোনো ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেছেন কিনা, কোনো ব্যক্তি মাছ চুরি করেছেন কিনা, কোনো অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আছে কিনা- এসব নির্ধারণ করতে সাক্ষ্য, তথ্য, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো অডিও, ভিডিও বা বক্তব্যের সত্যতা, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই না করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কোনো ঘেরে কাউকে সন্দেহজনক অবস্থায় পাওয়া গেলেও তা তাকে নির্যাতন বা হত্যা করার অনুমতি দেয় না।
শামীমের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটা অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুক লাইভে শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচার করা হয়, লোকজনকে জড়ো করা হয় এবং তাকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয় সেখানে উন্মত্তরা তাকে পেটায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলার ঘটনা ঘটে। এই বিবরণ যখন তদন্তে প্রমাণিত হবে, তবে এখানে শুধু প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের ভূমিকা নয়, সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং জনতাকে সংগঠিত করার ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্যের প্রতিবাদ করা, অভিযোগ জানানো কিংবা আইনগত ব্যবস্থা দাবি করা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু কারও পরিচয় ও ঠিকানা ছড়িয়ে দিয়ে তাকে জনতার সামনে বিপন্ন করা, হামলার আহ্বান জানানো বা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় বা গর্হিত কাজ। মতপ্রকাশের অধিকার কাউকে অন্যের জীবন বিপন্ন করার অধিকার দেয় না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রত্যেকটা বক্তব্যকে উসকানি বলা ঠিক হবে না। কোনো বক্তব্য অপরাধমূলক উসকানি কিনা, তার সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক আছে কিনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল- এসব নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেমন আবেগের স্থান নেই, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতেও দায় নির্ধারণ করা যায় না।
আইনের শাসনের বিকল্প জনতার শাস্তি নয়
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
এখানে আইনের বক্তব্য স্পষ্ট। অভিযোগের ভিত্তিতে কারও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। অপরাধের অভিযোগ উঠলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তদন্ত করবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কোনো অভিযোগ সত্য হলেও অভিযুক্তকে মারধর করে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার তৈরি হয় না।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০২ ধারায় খুনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান আছে। ঘটনার পরিস্থিতি অনুযায়ী ২৯৯ ও ৩০০ ধারায় অপরাধমূলক নরহত্যা ও খুনের সংজ্ঞা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। একাধিক ব্যক্তি অভিন্ন অভিপ্রায়ে কোনো অপরাধে অংশ নিলে ৩৪ ধারাও বিবেচনায় আসতে পারে। কোন ঘটনায় কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা তদন্ত, প্রমাণ ও আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এই আইনি কাঠামোর অর্থ শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়। নিরপরাধ ব্যক্তিকে অন্যায় শাস্তি থেকে রক্ষা করাও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। বিচারপ্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তদন্তে ত্রুটি থাকতে পারে, অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে- এসব সমস্যা বাস্তব। কিন্তু এর সমাধান জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়। বরং তদন্ত ও বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক করা।
যে সমাজে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, অভিযোগের বিচার আদালতে নয়, রাস্তায় হবে, সেখানে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিই অনিরাপদ হন না। যে কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় বিদ্বেষ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন। কারণ, অভিযোগ তুলতে আলাদা খরচ লাগে না। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না।
জনতা কেন বিচারকের ভূমিকায় নামে
গণপিটুনির পেছনে কোনো একটামাত্র কারণ কাজ করে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুজব ও ভুল তথ্য মানুষকে উত্তেজিত করে। কোথাও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানো হয়, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা হয়, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধের সঙ্গে জনতার ক্ষোভ মিশে যায়। আবার কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রতি অনাস্থা কিংবা অপরাধের বিচার হবে না- এমন ধারণাও সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে।
দলবদ্ধ সহিংসতার একটা মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। জনতার মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব দায়বোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কেউ মনে করেন, অন্যরা যখন মারছে, তখন তার অংশগ্রহণও গ্রহণযোগ্য। কেউ আবার ভিড়ের বিরোধিতা করলে নিজেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করেন। ফলে অনেক সময় যারা সরাসরি আঘাত করেন না, তারাও নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। সেই নীরবতা হামলাকারীদের আরও সাহসী করে তোলে।
তবে এসব ব্যাখ্যা কোনোভাবেই অপরাধের দায় কমায় না। বরং বুঝতে সাহায্য করে যে, গণপিটুনি ঠেকাতে শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার করলেই হবে না, সহিংসতার আগের পর্যায়ও বুঝতে হবে। গুজব কীভাবে ছড়াচ্ছে, কে জনতাকে সংগঠিত করছে, স্থানীয়ভাবে কারা প্রভাব বিস্তার করছে, পুলিশকে খবর দেওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুব বেশি প্রয়োজন।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যাবে, তদন্ত নিরপেক্ষ হবে এবং অপরাধী প্রভাবশালী হলেও বিচার এড়াতে পারবে না- এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে গেলে মানুষ নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার পক্ষে যুক্তি খুঁজতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই যুক্তিকে বৈধতা দেওয়া নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনের কার্যকারিতা দিয়ে তা অকার্যকর করে দেওয়া।
রাষ্ট্রের দায় কোথায়
গণপিটুনির প্রত্যেক ঘটনায় রাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করা যেমন তথ্যসমর্থিত নয়, তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। সম্ভাব্য সহিংসতার তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ কী করেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কিনা, হাসপাতালে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কিনা এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করতে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
শামীমের ঘটনায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরও হামলার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কোনো ব্যক্তি পুলিশের হেফাজতে বা পুলিশ উদ্ধার করা অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। হাসপাতালের নিরাপত্তা ভেঙে যদি পাবলিক আবার হামলা করতে পারে, তাহলে শুধু হামলাকারীদের নয়, নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতাকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
তালার ক্ষিতিশ মণ্ডলের ক্ষেত্রেও তদন্তে দেখতে হবে, তাকে আটক করার পর কতক্ষণ ধরে নির্যাতন চলেছে। স্থানীয় মানুষ বা কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টা জানতে পেরেছে। তাকে উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং চিকিৎসা পেতে কোনো বিলম্ব হয়েছিল কিনা। এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান করে দেওয়া যাবে না। সাক্ষ্য, চিকিৎসার নথি, ময়নাতদন্ত এবং তদন্তের তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাষ্ট্রের আরেকটা দায়িত্ব হলো বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো। কোনো ঘটনার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই শেষ কথা নয়। তদন্ত কত দূর এগোল, অভিযোগপত্র দেওয়া হলো কিনা, বিচার শুরু হলো কিনা এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্ত কী হলো- এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার। বিচারহীনতার ধারণা দূর করতে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য জবাবদিহি দরকার।
কী করা প্রয়োজন
প্রথমত, ক্ষিতিশ মণ্ডল ও ওয়াহিদুজ্জামান শামীম হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, চিকিৎসার নথি, ময়নাতদন্ত, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। প্রত্যক্ষ হামলাকারী, উসকানিদাতা ও সহায়তাকারীদের ভূমিকা আলাদাভাবে শনাক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য গণপিটুনির খবর পাওয়া গেলে পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জনতার কাছ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তিনি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অধিকার হারান না।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও সহিংসতার আহ্বান শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে এ কাজের নামে বৈধ মতপ্রকাশ বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করা যাবে না। আইন প্রয়োগের লক্ষ্য হবে সহিংসতা প্রতিরোধ ও অপরাধের তদন্ত, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
চতুর্থত, গণপিটুনির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কয়টা ঘটনা ঘটেছে, কতজন মারা গেছেন, কয়টা মামলা হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কয়টা মামলার বিচার শেষ হয়েছে- এমন তথ্যের সমন্বিত হিসাব প্রয়োজন। শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। বিচার ও জবাবদিহির পরিসংখ্যানও জরুরি।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং গণমাধ্যমকে অভিযোগ যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো গুজব বা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে মানুষকে উত্তেজিত না করে পুলিশকে জানানো, প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষা করার আহ্বান জানাতে হবে। জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাউকে মারধর করা অন্যায়- এই বোধ সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা অতি আবশ্যক।
অভিযোগের সমাজ নয়, বিচারের সমাজ চাই
সাতক্ষীরার দুটো হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা হাজির করেছে। একটা অভিযোগ ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে, অন্যটা সম্পত্তি-সংক্রান্ত সন্দেহকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অভিযোগের ধরন বদলালেও মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পদ্ধতি একই থেকে গেছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে কেউই নিরাপদ থাকবে না। আজ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, কাল অন্য কারও বিরুদ্ধে উঠবে। আজ যে জনতা কাউকে অপরাধী ঘোষণা করছে, কাল সেই জনতারই কোনো সদস্য অন্য অভিযোগে একই বিপদের মুখে পড়তে পারে।
একটা সভ্য বিচারব্যবস্থার শক্তি এই নয় যে সেখানে অপরাধের অভিযোগ ওঠে না। শক্তি হলো, অভিযোগ উঠলেও প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয় না। অপরাধ প্রমাণিত হলেও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আইনসম্মত কর্তৃপক্ষের বাইরে যায় না। আইনের শাসন মানে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, আবার জনতার ক্ষোভকে বিচারের বিকল্প হতে দেওয়াও নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন মানুষের বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগই উঠুক, তার জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার জনতার নেই। ধর্মীয় আবেগ, সম্পত্তির ক্ষতি, ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা- কোনোটাই বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা তৈরি করে না।
সমস্যা শুধু এই নয় যে কিছু মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। সমস্যা হলো, অভিযোগকে প্রমাণ, জনতার ক্ষোভকে বিচার এবং সহিংসতাকে ন্যায়বিচার বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা রুখতে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে সেই বিপজ্জনক ধারণা- অভিযোগ উঠেছে, অতএব তাৎক্ষণিক শাস্তি দিতেই হবে। দিনে বা রাতে, বাজারে বা ঘরে।
অভিযোগের বিচার হবে আদালতে, জনতার হাতে নয়। এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটতে থাকলে আইন থাকবে কাগজে, আর মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নির্ভর করবে জনতার মর্জির ওপর। আর রাষ্ট্র হয়ে পড়বে নাজুক।
লেখক : দীপু মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ও সমাজ চিন্তক