প্রজন্মের ভবিষ্যত ডুবে যাচ্ছে মাদকের অন্ধকারে
বর্তমান সময়ে মাদকের ভয়াবহতা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই, চোখে থাকার কথা স্বপ্ন, মনে থাকার কথা নতুন কিছু গড়ার আকাঙ্ক্ষা—সেই বয়সেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে মাদকের ভয়ংকর আবর্তে।
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। অথচ আজ সেই তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার পরিণতি শুধু একটি জীবনের ধ্বংস নয়; একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তোলা।
প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের সন্তানরা এই পথে যাচ্ছে?
কৌতূহল, বন্ধুমহলের প্রভাব, হতাশা, পারিবারিক দূরত্ব, মানসিক চাপ কিংবা সহজলভ্যতার সুযোগ—বিভিন্ন কারণ একজন শিক্ষার্থীকে বিপথে ঠেলে দিতে পারে। কখনো কখনো আমরা তাদের বাহ্যিক আচরণ দেখি, কিন্তু ভেতরের ভাঙনটা দেখতে পাই না।
তাদের নীরবতা, আচরণের পরিবর্তন, একাকিত্ব কিংবা অস্বাভাবিক জীবনযাপনকে অবহেলা করি। অথচ হয়তো সেই সময়টিই ছিল তার পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
একজন শিক্ষক হিসেবে এই বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। আমরা কি শুধু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকব, নাকি তাদের জীবন, মানসিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও সমানভাবে ভাবব?
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে বিবেকবান করে, সঠিক-ভুলের পার্থক্য বুঝতে শেখায়, জীবনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার শক্তি জোগায়। তাই মাদকবিরোধী সচেতনতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
শিক্ষার্থীদের শুধু মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো জানালেই হবে না; তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা জীবনের সংকটে ভুল পথ বেছে না নেয়।
তাদের আত্মবিশ্বাসী হতে শেখাতে হবে, নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে, সুস্থ বন্ধুত্ব ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
আর যারা ইতোমধ্যে মাদকের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আরও মানবিক।
একজন শিক্ষার্থী ভুল পথে গেছে বলেই তার জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। তাকে অপমান করে, তিরস্কার করে কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে আমরা হয়তো তার ফিরে আসার পথটুকুও বন্ধ করে দিই। বরং তার প্রয়োজন এমন কিছু মানুষ, যারা তাকে বলবে—
“তুমি ভুল করেছ, কিন্তু তুমি শেষ হয়ে যাওনি। তোমার ফিরে আসার পথ এখনো খোলা আছে।”
আসক্তি থেকে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক সহযোগিতা, পরিবারের সমর্থন, পেশাদার চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা। শিক্ষক হিসেবে আমরা শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে পারি, তার অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি, তাকে সঠিক চিকিৎসার পথে এগিয়ে দিতে পারি। তবে তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গোপন রাখা এবং তাকে সম্মানের সঙ্গে সহযোগিতা করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আমি মনে করি, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়, শুধু পরিবারের দায়িত্বও নয়। এই লড়াইয়ে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজের সচেতন মানুষ—সবারই ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক এমন এক নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে শুধরে দেওয়ার মানুষ থাকবে, হতাশ হলে তাকে সাহস দেওয়ার মানুষ থাকবে, বিপথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার মানুষ থাকবে।
আমরা কি সেই মৃত্যু, সেই কান্না, সেই অপচয় রোধ করতে পারি না?
অবশ্যই পারি—যদি আমরা সময় থাকতে সচেতন হই, যদি আমরা সন্তানদের কথা শুনি, যদি আমরা শাসনের পাশাপাশি ভালোবাসা দিই, যদি আমরা বিচার করার আগে বোঝার চেষ্টা করি।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমার প্রত্যাশা—আমাদের শিক্ষার্থীরা মাদকের অন্ধকারে নয়, জ্ঞানের আলোয় বেড়ে উঠুক। তাদের জীবন হোক স্বপ্নময়, সম্ভাবনাময় ও মানবিক।
মাদকমুক্ত শিক্ষাঙ্গন শুধু একটি দাবি নয়; এটি আমাদের সন্তানদের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা।
লেখক : উর্মী রহমান সোনিয়া
প্রভাষক, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, ডাঃ সাইফুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ, মহেশপুর, ঝিনাইদহ।