নবীজি (সা.) এর ভালোবাসায় খেজুর গাছের কান্না
মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি খেজুর গাছের শুকনা কাঠের সঙ্গে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। দিনে দিনে মসজিদে নববীতে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে পেছনের সাহাবিদের জন্য খুতবা শুনা কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে মদিনার এক আনসারি সাহাবি একটি মিম্বর তৈরি করলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সেই নতুন মিম্বরে উঠে খুতবা দেয়া শুরু করলেন, তখন উপস্থিত সাহাবাগণ ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বর থেকে নেমে সেই খেজুর গাছের নিকটে গিয়ে খেজুর গাছটিকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এই ভাবে কান্না করছ কেন?
উত্তরে সেই খেজুর গাছটি বলতে শুরু করল, হুজুর আপনি আমার ওপর হেলান দিয়ে আর কোনোদিন খুতবা দিবেন না তা আমি সহ্য করতে পারছিনা। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বুকে জড়িয়ে সান্তনা দিলেন এবং জান্নাতে নবীজির (সা.) সঙ্গে থাকার সুসংবাদ দিলেন এবং উপস্থিত সাহাবাদেরকে নির্দেশ দিলেন তাকে যেন নতুন মিম্বরের নিচে দাফন করা হয়।
.png)
(ফাতহুল বোখারি হাদিস নম্বর ৩৯৯, ইবনে মাজাহ হাদিস নম্বর-১৪১৫)
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) খেজুর গাছের গুড়ির সঙ্গে ভর দিয়ে জুমার খুতবা দিতেন। যখন মিম্বর তৈরি করা হল খেজুরের গুড়িটা কাঁদতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা.) গাছটির নিকট গেলেন এবং তা স্পর্শ করলেন। ফলে এটা চুপ করল।
(জামে তিরমিযী ৫০৫, সুনানে দারেমী ৩১, সুনানুল কুবরা ৫৫৬৭, বুখারি ৩৩৯০)
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মিম্বর বানানোর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি কাঠখণ্ডের নিকট দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বর বানালেন এবং সেটির দিকে ফিরে গেলেন, তখন কাঠখণ্ডটি কান্নাজুড়ে দিল। ফলে নবীজি (সা.) এটিকে আলিঙ্গন করলেন, অতঃপর এটি শান্ত হল। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন আমি যদি একে আলিঙ্গন না করতাম, তবে অবশ্যই তা কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে কাঁদতে থাকত।
(সুনানে দারেমী ৩৯, মুসনাদে আহমাদ ১/২৪৯, ২৬৩, ২৬৭ ইবনু আবী শাইবা ১১/৪৮৪)
কাণ্ডটি এজন্য কাঁদছিল যেহেতু সে খুতবাকালে জিকির শুনতে পেত।
(বুখারি ৩৩৯১,সহীহ ইবনে খুযাইমাহ: ১৭৭৭)
মাওলানা রুমি মসনবি শরিফে এর দৃশ্যপটটি এঁকেছেন বড় সুন্দরভাবে।
ক্রন্দসী খুঁটি বিরহ বিচ্ছেদে রাসুলকে হারিয়ে
মানুষের মতো করে আর্তনাদ বুক ভাসিয়ে।
পয়গাম্বর বললেন, তুমি কী চাও বল আমাকে,
বলে, বুকটা রক্তে রঞ্জিত আপনার বিচ্ছেদে।
নবীজি খুঁটিকে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাও তুমি, কাঁদছ কেন?
খুঁটি জবাব দেয়, আপনি আমাকে ছেড়ে গেছেন, তাই আমার বুকে এখন রক্ত ঝরে।
ছিলাম আপনার মসনদ আমি, ছেড়ে গেছেন ফেলে
মিম্বরের ওপরে আসন নিয়েছেন তাই হৃদয় জ্বলে।
বললেন, তুমি কি চাও যে এমন খেজুর বৃক্ষ হবে,
পূর্ব পশ্চিমের মানুষ আগ্রহে তোমার ফল খাবে?
নবীজি বললেন, তুমি যে আমার বিরহে কাঁদছ, কি পেলে তুমি শান্ত হবে?
তুমি কি চাও যে, তুমি এমন খেজুর গাছ হবে, যার ফল সারা দুনিয়ার মানুষ আগ্রহ ও ভক্তি নিয়ে খাবে, সবাই পরিতৃপ্ত হবে?
নাকি ওই জগতে আল্লাহ বানাবে তোমায় দেবদারু এমন চিরদিন তুমি তরতাজা রবে, যেখানে জান্নাত কানন।
বলল : তাই চাই। হয় স্থায়ী যাতে মোর এ জীবন,
শুনো হে গাফেল কাঠের চেয়ে হয়ো না তুচ্ছ মন।
খুঁটি বলল, হ্যাঁ আমি চাই চিরন্তন জীবন।
মাওলানা বলছেন, ওহে গাফিল মানুষ!
তুমি অন্তত খুঁটির চেয়ে তুচ্ছ হইও না।
অনন্ত জীবনকে অবজ্ঞা করে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন নিয়ে মত্ত হয়ে থেকো না।
প্রশ্নোত্তর শেষ হলো দাফন করলেন সেই খুঁটি তিনি মাটিতে পুঁতে মানুষের ন্যায় হাশরে উঠবে যেন আখেরাতে।
(মসনবি শরিফ, প্রথম খ, বয়েত : ২১১৩-২১২১)।
ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে