মহররম মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্বের তাৎপর্যপূর্ণ সেই আশুরার দিন। এই দিনেই হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, স্থিতি, উত্থান ও পৃথিবীতে অবতরণ ও দীর্ঘ দিন ক্ষমা প্রার্থনা শেষে এদিনই তার তওবা কবুল করা হয়।
ফেরআউনের কবল থেকে হজরত মুসা (আ.) এর মুক্তি, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর বিজয় ও দাম্ভিক নমরুদের পরাজয় ঘটে। হজরত নুহ (আ.) এর নৌযানের যাত্রা আরম্ভ এবং বন্যা-প্লাবনের সমাপ্তিও আশুরাতেই সংঘটিত হয়েছিল।
.png)
নবীদের ঘটনার বাইরেও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ইন্তেকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালায় হুসাইন ইবনে আলী (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। এই দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইসলাম এবং ইসলাম পূর্ব সময় থেকেই। এই দিন এবং এর আগে পরে একদিন মিলিয়ে রোজা রাখতেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যদের রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন তিনি। (সহিহ মুসলিম: ২৫২০)
রমজান মাসের রোজার পর অন্যান্য নফল রোজার মধ্যে সব থেকে ফজিলত ও গুরুত্বপূর্ণ রোজা হলো আশুরার রোজা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার অনেক আগে থেকে মক্কায় অবস্থানকালীন সময়েও মহররমের ১০ তারিখ তথা আশুরা দিন রোজা রাখতেন।
মহররম মাসে আশুরার রোজাসহ আইয়ামে বিজের রোজা রাখা খুবই ফজিলতপূর্ণ। এবার জেনে নিন মহররমে আশুরা ও আইয়ামে বিজের রোজার দিনক্ষণ ও ফজিলত-
বাংলাদেশে যারা আশুরার রোজা রাখবেন, তারা যদি আশুরার আগে দিন ৯ মহররম তথা ২৮ জুলাই রোজা রাখতে চান; তবে তাদেরকে অবশ্যই ৮ মহররম ২৭ জুলাই দিবাগত রাতে সেহরি খেতে হবে। আবার আশুরার পরের দিন ১১ মহররম তথা ৩০ জুলাই রোজা রাখতে চান; তবে তাদেরকে অবশ্যই ২৯ জুলাই দিবাগত রাতে সেহরি খেতে হবে। সে হিসেবে আশুরা ও আইয়ামে বিজের রোজাগুলো রাখা যেতে পারে। তাহলো-
(১) মহররমে আশুরার রোজা: আগামী ২৮ জুলাই (শুক্রবার) ৯ মহররম, ২৯ জুলাই (শনিবার) ১০ মহররম এবং ৩০ জুলাই (রোববার) ১১ মহররম রোজা রাখা। অর্থাৎ যারা আশুরার রোজা রাখতে চায়; তারা আশুরার আগের দিনসহ ২ দিন ২৮-২৯ জুলাই (শুক্র ও শনিবার) অথবা আশুরার পরের দিনসহ ২ দিন ২৯-৩০ জুলাই (শনি ও রোববার) রোজা রাখবে। আবার আশুরার আগের ও পরের দিন মিলিয়ে ৩দিন রোজা রাখায়ও কোনো দোষ নেই।
(২) মহররমের আইয়ামে বিজের রোজা: আবার হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমে আইয়ামে বিজের ৩ দিন রোজা রাখার বিষয়টি তো আছেই। সুতরাং কেউ চাইলে ২৮-৩০ জুলাই (৯-১১ মহররম) ৩দিন রোজা রাখতে পারে। আবার ১-৩ আগস্ট (১৩-১৫ মহররম) আইয়ামে বিজের রোজা রাখতে পারে। সে হিসেবে মহররমে ৬ দিন রোজা পালন করতে পারে।
মহররমের রোজার ফজিলত
আশুরা উপলক্ষে মহররম মাসে রোজা রাখার ফজিলত ও মর্যাদা অনেক বেশি। আশুরায় রোজা রাখা সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক হাদিসে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাহলো-
(১) হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার দিনের রোজার ওপরে অন্য কোনো দিনের রোজাকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি এবং এ মাস অর্থাৎ রমজান মাসের ওপর অন্য মাসের গুরুত্ব দিতেও দেখিনি’। (বুখারি)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, আমি আশা রাখি যে, এর দ্বারা বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’। (মুসলিম)
(২) হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মহররম মাসের ১০ তারিখে নিজে রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন তখন সাহাবাগণ বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! এই দিনকে ইহুদি-নাসারারাও মহান দিন হিসেবে পালন করে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন সামনের বছর আসবে তখন ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ মহররম রোজা পালন করবো।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, পরবর্তী বছরের মহররম মাস আসার আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছিলেন’। (মুসলিম)
এ কারণেই হজরত ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল এবং ইসহাকসহ অন্যান্যরা ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখও রোজা রাখাকে মোস্তাহাব মনে করতেন। কেননা ১০ তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রোজা রেখেছেন আর ৯ তারিখে রোজা রাখার ইচ্ছা করেছিলেন।
আইয়ামে বিজের রোজার ফজিলত
আইয়ামে বিজের রোজা রাখার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ বছরজুড়ে সহজে রোজার সওয়াব পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম এ রোজা। এ ছাড়াও বছর জুড়ে রোজার সওয়াব পাওয়ার আরো আমল আছে। তবে তুলনামূলক ভাবে সহজে ও সারা বছর রোজার সওয়াব মেলে এ রোজায়। হাদিসের বর্ণনা থেকে তা প্রমাণিত। কিন্তু তা কীভাবে?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হে আব্দুল্লাহ! তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা রাখবে। কেননা নেক আমলের বদলে তোমার জন্য রয়েছে দশগুণ নেকি। এভাবে সারা বছরের রোজা হয়ে যায়’।
প্রতি চন্দ্র মাসে তিনটি রোজা রাখা মুস্তাহাব। দিনগুলো হলো আইয়ামুল বিজ তথা প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫তম দিন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এ রোজাগুলো ছাড়তেন না। তিনি সব সময় আইয়ামে বিজের রোজা রাখতেন। এমনকি সফরেও। তবে রোজাগুলো ফজিলতপূর্ণ হলেও তিনি উম্মতের জন্য এ রোজাকে বাধ্যতামূলক করেননি। হাদিসে পাকে এসেছে-
‘তুমি যদি (প্রতি) মাসে তিনটি রোজা রাখতে চাও, তাহলে ১৩, ১৪ এবং ১৫তম দিনে রোজা রাখবে’। (তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমাদ)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আন প্রতিদিন রোজা রাখতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রতিদিন রোজা রাখতে নিষেধ করেন এবং উপদেশ দেন এভাবে-
‘হে আবদুল্লাহ! আমি এ সংবাদ পেয়েছি যে, তুমি প্রতিদিন রোজা রাখো এবং সারা রাত নামাজ আদায় করে থাক। আমি বললাম, ঠিক (শুনেছেন) হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন- এরূপ করবে না (বরং মাঝে মাঝে) রোজা রাখো আবার ছেড়েও দাও। (রাতে) নামাজ আদায় করো আবার ঘুমাও। কেননা তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক আছে, তোমার মেহমানের হক আছে। (বরং) তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা রাখবে। কেননা নেক আমলের বদলে তোমার জন্য রয়েছে দশগুণ নেকি। এভাবে সারা বছরের রোজা পালন হয়ে যায়’। (বুখারি)
হজরত ইবনু মিলহান আল-ক্বাইসি তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের আইয়ামে বিজের রোজার ব্যাপারে নসিহত করেছেন; আমরা যেন তা (মাসের) ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ পালন করি। তিনি আরো বলেছেন, এটা সারা বছর রোজা রাখার মতোই’। (আবু দাউদ)
হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সালাম বেহেশতের নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তাদের শরীর থেকে জান্নাতি পোশাক চলে যায়। আর তাদের শরীরের রংও কুৎসিত হয়ে যায়। এরপর হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে রোজা রাখলে আবার তাদের শরীরের রং পূর্বের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে যায়। তাই এই তিন দিনকে আইয়্যামে বিজ বা উজ্জ্বলতার দিন বলা হয়।
বিভিন্ন সময় ও স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মহররম মাসের রোজা পালন
মহররমে আশুরা উপলক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোজা পালনের ৪টি অবস্থা ছিল। তাহলো-
(১) মক্কায়: তিনি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে নিজে আশুরার রোজা পালন করেছেন কিন্তু কাউকে সে সময় রোজা রাখতে নির্দেশ দেননি।
(২) মদিনায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন ইয়াহুদিদেরকে এই দিনে রোজা রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করে জানার পর তিনিও এই দিনে রোজা পালন করাকে পছন্দ করলেন এবং সাহাবাদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।
(৩) দ্বিতীয় হিজরিতে: হিজরি দ্বিতীয় বছরে যখন রমজানের রোজা ফরজ হয় তখন তিনি সাহাবাদেরকে আাশুরার রোজা রাখার আর নির্দেশ দেননি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি সাহাবাদেরকে আর নির্দেশও করেননি আবার নিষেধও করেননি।
(৪) নবীজির ইন্তেকালের আগে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের আগে তিনি ও তার সাহাবায়ে কেরামগণ সবাই শুধু মহররমের ১০ম তারিখ রোজা রাখতেন। কিন্তু সাহাবাগণ যখন অভিযোগ জানালেন যে, এই দিনটিতে ইয়াহুদিরাও উৎসবের দিনে হিসেবে গণ্য করে থাকে এবং রোজা রাখে; তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমি যদি পরবর্তী বছর বেঁচে থাকি তবে ইন শা আল্লাহ ৯ তারিখও রোজা পালন করব’।
সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, মহররম মাসে আশুরাসহ আইয়ামে বিজের ৩ দিন রোজা পালন করা। যাতে রয়েছে অশেষ ফজিলত ও মর্যাদা।