নবুয়ত লাভের ১১তম বছর (৬২১ খ্রিস্টাব্দ) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জন্য দুঃখ ও শোকের বছর ছিল। এ সময় তিনি তার কঠিন সময়ের ২ জন প্রিয় ব্যক্তি স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালেবকে হারিয়েছেন। তা ছাড়া ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তায়েফ গেলে সেখান থেকেও আশাহত হয়ে ফেরেন।
এরপর মহান আল্লাহ ইসরা ও মেরাজের মাধ্যমে প্রিয় রাসূলকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন।
.png)
সেদিন রাতে মহানবী (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জিবরাইল (আ.) এর সঙ্গে বোরাক নামের বিশেষ বাহনে করে বাইতুল মুকাদ্দাসে যান। সেখানে নবী-রাসূলদের সঙ্গে ২ রাকাত নামাজ পড়ে তিনি ৭ আসমান অতিক্রম করেন। সেখানে তার সঙ্গে বিভিন্ন নবীর দেখা হয়।
সিদরাতুল মুনতাহার আগ পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন জিবরাইল (আ.)। এরপর মহানবী (সা.) জান্নাত, জাহান্নামসহ সৃষ্টির বিভিন্ন রহস্য প্রত্যক্ষ করেন।
ফেরার সময় মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তিনি নিজ উম্মতের জন্য ৫ ওয়াক্ত নামাজ উপহার নিয়ে আসেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।
পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে: سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
উচ্চারণ: ‘সুবহা-নাল্লাযীআসরা-বিআ‘বদিহী লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারা-মি ইলাল মাসজিদিল আকসাল্লাযী বা-রাকনা- হাওলাহূলিনুরিয়াহূমিন আ-য়া-তিনা- ইন্নাহূ হুওয়াসসামী‘উল বাসীর’।
অর্থ: ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার ৪ দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল’। (সূরা: বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)
পবিত্র শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বেশ কিছু প্রচলনসহ বিশেষ নামাজ ও রোজা রাখার প্রথাও প্রচলিত রয়েছে। আর এ ব্যাপারে শরিয়ত কী বলে?
প্রথমেই জেনে নিই শবে মেরাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে
শবে মেরাজ কোরআন-হাদিস ও ইজমায়ে উম্মত-এর অকাট্য দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত। এই রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে কোনো মুসলমানের সন্দেহ নেই। এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) অনেক বছর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও শবে মেরাজকেন্দ্রিক কোনো আমলের ব্যাপারে বিশেষ হুকুম দেননি। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও বিশেষ আমল করেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর তিরোধানের পর প্রায় ১০০ বছর সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। তারা ২৭ রজবকে বিশেষভাবে উদ্যাপন করেছেন বলে একটি ঘটনাও পাওয়া যায়নি। যে কাজ রাসূলুল্লাহ (সা.) করেননি, সে কাজ সাহাবায়ে কেরামও পরিহার করেছেন। সুতরাং ২৭ রজবে কোনো আমলকে দীনের অংশ মনে করা, সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হাদিস ও সুন্নতসম্মত নয়। এটাকেই বেদআত বলা হবে।
শবে মেরাজ উপলক্ষ্যে অনেককে বিশেষ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে সমবেত হতে দেখা যায়। বহু নারীও সেই রাতে নামাজ আদায় করার পদ্ধতি কী জানতে চান। বহু মুসলমান এই রাত উপলক্ষ্যে মেরাজের রোজা রাখতে চান বা রাখার বিধান জানতে চান। অনেকেই শবে মেরাজের নামাজ বা রোজাকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ মনে করেন।
সহিহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) মেরাজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হাদিসগুলো হলো। ১. তিরমিজি ৩১৩১, ২. প্রাগুক্ত ৩১৩২, ৩. মুসনাদে আহমাদ ২/৫২৮, ৪. মুসলিম ১৬৭, ৫. প্রাগুক্ত ১৬৮, ৬. বুখারি ৩৪৯, ৭. তিরমিজি ৩৪৬২, ৮. মুসলিম ২৭৯, ৯. আহমাদ ৫/৩৮৭, ১০. মুসলিম ১৬৫, ১১. প্রাগুক্ত, ১২. আহমাদ ৩/২২৪, ১৩. প্রাগুক্ত ৩/১৮১, ১৪. প্রাগুক্ত ২/৩৫৩, ১৫. তিরমিজি ৩১৪৭, ১৬. আহমাদ ১/২৫৭, ১৭. প্রাগুক্ত ১/৩০৯-৩১০, ১৮. মুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ৩২৩৫৭, ১৯. তিরমিুজ ৩৪৬২, ২০. মুসতাদরাক ২/৩৬১
শবে মেরাজের নামাজ ও রোজা
নফল নামাজ আদায় করা ও রোজা রাখা অবশ্যই পুণ্যের কাজ। কিন্তু শবে মেরাজ উপলক্ষ্যে বিশেষ কোনো নামাজ ও রোজার বিধান ইসলামি শরিয়তে নেই। এ ব্যাপারে আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) লাতায়েফ ও মাআরেফ গ্রন্থে বলেন, রজব মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ কোনো নামাজ নেই। রজব মাসের প্রথম জুমায় সালাতুর রাগায়েব প্রসঙ্গে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট।
আলেমদের মতে, শবে মেরাজ উপলক্ষ্যে নামাজ বিদআত। পরবর্তী যুগের আলেমগণের মধ্যে যারা এই মত ব্যক্ত করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আবু ইসমাঈল আনসারি, আবু বকর সামআনি, আবুল ফযল ইবনে নাসির ও আবুল ফারায ইবনে জাওযি (রহ.)-সহ আরো অনেক আলেম।
পূর্ববর্তী যুগের আলেমগণ এ ব্যাপারে আলোকপাত করেননি। কেননা এই বিদআত হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পর প্রকাশ পেয়েছে। নবী করিম (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে রজব মাসের রোজা সম্পর্কেও বিশুদ্ধ কোনো হাদিস বর্ণিত নেই।
মেরাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا (মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল) তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্যে। (সূরা: বনি ইসরাঈল, আয়াত: ১) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাত্রিতে অসংখ্য বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন। মানব জাতির পিতা আদম (আ.)-কে দেখেছেন। তার ডানপাশে ছিল শহিদদের (জান্নাতিদের) রুহ এবং বামপাশে ছিল জাহান্নামিদের রুহ।