ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]
কোরআন-হাদিসের দলিল

হজরত ঈসা (আ.) যে মসজিদে অবতরণ করবেন 

গাজী মো. রুম্মান ওয়াহেদ
প্রকাশিত: ১৯:২২, ১১ ডিসেম্বর ২০২৪
হজরত ঈসা (আ.) যে মসজিদে অবতরণ করবেন 
ছবি: অন্তর্জাল

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং অতি মূল্যবান এক স্থাপনা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত উমাইয়া মসজিদ। এটি গ্রেট মস্ক অব দামাসকাস নামেও পরিচিত। এটি শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয় বরং  বর্তমান বিশ্বে যে কয়টি প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য আদি অবকাঠামোর ওপর এখনো টিকে আছে, তার মধ্যে অন্যতম এটি।

উমাইয়া মসজিদ বা গ্রেট মস্ক অব দামাসকাস এর বয়স ১৩শ’ বছরের বেশি। এ মসজিদকে ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম পথিকৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয় সারাবিশ্বে। কেয়ামতের আগে এই মসজিদের ওপরই অবতরণ করবেন হজরত ঈসা (আ.)। তার আগমণের পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে অনেক দলিল রয়েছে।

কোরআন থেকে দলিল

Advertisement

(১) মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং তারা বলে আমরা মারইয়ামের পুত্র আল্লাহর রাসূল ঈসাকে হত্যা করেছি। মূলতঃ তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি; বরং তাদেরকে সন্দেহে ফেলা হয়েছে। নিশ্চয়ই যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল তারাই সে বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। প্রকৃতপক্ষে তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী। আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করবে এবং উত্থান দিবসে তিনি তাদের উপর সাক্ষ্য প্রদান করবেন। (সূরা: নিসা, আয়াত: ১৫৭-১৫৯) এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় মুফাসি্সরগণ বলেনঃ আখেরী জামানায় যখন ঈসা (আ.) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন সকল আহলে কিতাব তার প্রতি বিশ্বাস করবে। ইহুদিদের দাবী তখন মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।

আরো পড়ুন >>> আল্লাহর ৯৯ নাম ও তার অর্থ (পর্ব- ১)

(২) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) কেয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কেয়ামতের ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ করোনা। আমার অনুসরণ করো। এটাই সরল পথ’। (সূরা: যুখরুফ, আয়াত: ৬১) অত্র আয়াতে কেয়ামতের পূর্বে ঈসা (আ.) এর আগমণের কথা বলা হয়েছে। এটি হবে কেয়ামতের একটি বড় আলামত। তার আগমণ কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ বহন করবে’। ( তাফসিরে কুরতুবী, তাবারী ও ইবনে কাসির)

হাদিস থেকে দলিল

(১) নবী মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঐ আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। অচিরেই ন্যায় বিচারক শাসক হিসেবে ঈসা (আ.) তোমাদের মাঝে আগমণ করবেন। তিনি ক্রুশচিহ্ন ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর হত্যা করবেন এবং জিযইয়া প্রত্যাখ্যান করবেন। ধন-সম্পদ প্রচুর হবে এবং তা নেয়ার মতো কোন লোক পাওয়া যাবে না। এমনকি মানুষের কাছে একটি সেজদা দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত বস্তু হতে শ্রেষ্ঠ হবে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন: তোমরা চাইলে আল্লাহর এই বাণীটি পাঠ কর, ‘আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে এবং উত্থান দিবসে তিনি তাদের ওপর সাক্ষ্য প্রদান করবেন’। (বুখারি, অধ্যায়: কিতাবু আহাদীসুল আম্বীয়া। মুসলিম, অধ্যায়: ঈসা (আ.) এর অবতরণ) এখানে আবু হুরায়রা (রা.) বুঝাতে চাচ্ছেন যে, আহলে কিতাবের লোকেরা অচিরেই ঈসা (আ.) এর মৃত্যুর পূর্বেই তার ওপর ঈমান আনবে। আর সেটি হবে আখেরী জামানায় তার অবতরণের পর।

(২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত লড়াই করে বিজয়ী থাকবে। অতঃপর ঈসা (আ.) আগমণ করবেন। সেদিন মুসলমানদের আমির তাকে লক্ষ্য করে বলবেন: আসুন! আমাদের ইমামতি করুন। তিনি বলবেন: না; বরং তোমাদের একজন অন্যজনের আমির। এ কারণে যে, আল্লাহ এই উম্মতকে সম্মানিত করেছেন’। (মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান)

(৩) নবী মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘সে (দাজ্জাল) যখন মুসলমানদের ঈমান ধ্বংসের কাজে লিপ্ত থাকবে আল্লাহ তাআলা তখন ঈসা ইবনে মারিয়াম (আ.)-কে পাঠাবেন। জাফরানের রঙ্গিন ২টি পোষক পরিহিত হয়ে এবং ২ জন ফেরেশতার পাখার ওপর হাত রেখে দামেস্ক শহরের পূর্বে অবস্থিত সাদা মিনারের উপরে তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন সদ্য গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তির মাথা থেকে যেভাবে পানি ঝরতে থাকে সেভাবে তার মাথা থেকে পানির ফোটা ঝরতে থাকবে এবং যখন মাথা উঁচু করবেন তখন অনুরূপভাবে তার মাথা হতে মণি-মুক্তার মতো চকচকে পানির ফোটা ঝরতে থাকবে। কাফেরের শরীরে তার নিঃশ্বাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাফের মৃত্যু বরণ করবে। চোখের দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত গিয়ে তার নিঃশ্বাস শেষ হবে। তিনি দাজ্জালকে ফিলিস্তীনের লুদ্দ শহরের গেইটে পাকড়াও করে হত্যা করবেন। অতঃপর তার নিকট এমন কিছু লোক আসবেন যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফিতনা হতে হেফাজত করেছেন। তিনি তাদের চেহারায় হাত বুলাবেন এবং বেহেশতের মধ্যে তাদের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে সংবাদ দিবেন’।  (মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুল ফিতান)

(৪) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘মুসলমানদের ইমাম যখন তাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য সামনে চলে যাবেন তখন ঈসা ইবনে মারইয়াম আগমণ করবেন। ইমাম যখন ঈসা (আ.) এর আগমণ অনুভব করবেন তখন পিছিয়ে আসতে চেষ্টা করবেন যাতে ঈসা (আ.) সামনে গিয়ে মানুষের ইমামতি করেন। ঈসা (আ.) ইমামের কাঁধে হাত রেখে বলবেন: তুমিই সামনে যাও এবং তাদের নামাজ পড়াও। কারণ তোমার জন্যই এ নামাজের ইকামত দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনি ইমামতি করবেন’। (ইবনে মাজাহ, সহিহ ইবনে খুজায়মা। ইমাম আলবানী সহিহ বলেছেন, সহিহুল জামে আস্ সাগীর: হাদিস নম্বর: ২৭৭) এখানে যে ইমামের কথা বলা হয়েছে আলেমদের বিশুদ্ধ মতে তিনি হলেন ইমাম মাহদী।

ঈসা (আ.) এর আগমণ সম্পর্কে আরো অনেক হাদিস রয়েছে। এ সমস্ত সহিহ হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন যে, কেয়ামতের পূর্বে ঈসা (আ.) শেষ নবীর উম্মত হয়ে দুনিয়াতে আগমণ করবেন। এতে বিশ্বাস করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উমাইয়া মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে হজরত ইয়াহইয়া (আ.) এর কবর। এছাড়া এ মসজিদের পাশে অনেক বীরযোদ্ধার কবর রয়েছে। জেরুজালেম বিজয়ী বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবীসহ তার বংশধরদেরও অনেকের কবর রয়েছে এ মসজিদের পাশে। বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ মসজিদে বসে কোরআনে কারিমের ব্যাখ্যা করতেন মানুষের কাছে। মসজিদের ৩টি মিনারের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু ঈসা মিনার ২৫৩ ফিট।

মসজিদ নির্মাণের হাজার বছর আগে থেকে বিভিন্ন দেবতার উপাসনা করা হতো এখানে। দীর্ঘকাল ধরে এখানে ছিল রোমনাদের জুপিটার মন্দির। পরে ৩৯১ সালে জুপিটার মন্দিরকে খ্রিস্টান চার্চে পরিণত করা হয়। পরে এ চার্চ হজরত ইয়াহইয়া (আ.) এর নামে উৎসর্গ করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যামন উপাসনালয় এবং পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণের পরে এখানে থাকা অনেক মূল্যবান প্রত্ন নিদর্শন বর্তমানে সিরিয়ার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

৬৩৪ সালে খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদের নেতৃত্বে দামেস্ক জয় হয়। ৬৬১ সালে ইসলামি খেলাফত উমাইয়া বংশের অধীনে আসে। এরপর দামেস্ক হয় মুসলিম বিশ্বের প্রশাসনিক রাজধানী। ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদ ৭০৫ সালে এখানে মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।

পারস্য ইতিহাসবিদ ইবনে আল ফকিহ লিখেছেন, ৭০৫ সালে মসজিদ নির্মাণ শুরুর পর খননের সময় এর নিচে একটি গোপন বাক্সে রক্ষিত একটি মস্তক পাওয়া যায়। এ মস্তক হজরত ইয়াহইয়া (আ.) এর বলে বিশ্বাস। খলিফা প্রথম ওয়ালিদ এটি জানার পর তিনি মস্তকটি মসজিদের মধ্যে সমাহিত করে তার ওপর একটি বিশেষ পিলার নির্মাণের নির্দেশ দেন। পরে এ স্থানে মাজার ও গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-কে খ্রিস্টানরাও তাদের নবী দাবি করে। সে কারণে এ মসজিদ খ্রিস্টানদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া আগে থেকেই এখানে ছিল তাদের চার্চ।

এ মসজিদ যখন নির্মাণ করা হয় তখন এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। ভারত, ইরান, গ্রিস ও মরক্কো থেকে ১২ হাজার দক্ষ কারিগর সংগ্রহ করা হয় এর স্থাপত্যশৈলীর জন্য। এ ছাড়া বাইজানটাইন কারিগরদের নিয়োজিত করা হয় এর মোজাইকের কাজে। ৭১৫ সালে শেষ হয় মসজিদ নির্মাণ।

৭৫০ সালে উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসে এবং ইসলামি খেলাফতের রাজধানী হয় বাগদাদ। আব্বাসীয়দের সময়ও এ মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মিসরের ফাতিমিদের দখলে আসে এ শহর। এরপর আবার তুরস্কের সেলজুক রাজার মাধ্যমে উদ্ধার হয় এ শহর। এরপর ক্রুসেডের সময়ও এ শহরের আধিপত্য নিয়ে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে লড়াই চলে এবং শেষ পর্যন্ত নুরউদ্দিন জঙ্গি দখল করেন এ নগরী। পরে সুলতান সালাহউদ্দিন আইউবী, তার কাছ থেকে মামলুক এবং মামলুকদের কাছ থেকে তুরস্কের উসমানীয়রা ১৫১৬ সালে দখলে নেয় এ নগরী।

দখল-পাল্টা দখলে বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ মসজিদ। বিশেষ করে ১৪০০ সালে তিমুর দামেস্ক নগরী পুড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিলে মসজিদের মূল গম্বুজসহ একটি মিনার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় এ মসজিদ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি বিভিন্ন সময় মুসলিম শাসকরা এ মসজিদের সংস্কারও করেন।

উসমানীয়দের পর সর্বশেষ বড় আকারে এ মসজিদ সংস্কার করেন সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদ।

শত শত বছর পার হলেও এখনো উমাইয়া মসজিদ বা গ্রেট মস্ক অব দামাসকাস এর আদি অলঙ্করণ এবং সাজসজ্জা অমলীন যা মুগ্ধ করে দর্শকদের। এ মসজিদ সিরিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জিআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!