আবুধাবির আকাশে ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য
মরুভূমির শহর আবুধাবির আধুনিক নগরায়ণের মাঝেও এমন একটি স্থাপনা রয়েছে, যার সৌন্দর্য, স্থাপত্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক আবহ দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সময় মুগ্ধ করে রাখে। সেটি হলো শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ। শুভ্র মার্বেলের বিশাল গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার, রঙিন পাথরের কারুকাজ, ফুলের নকশায় সাজানো বিশাল প্রাঙ্গণ, ঝলমলে ঝাড়বাতি এবং সূক্ষ্ম ইসলামি অলংকরণে নির্মিত এই মসজিদ আবুধাবির অন্যতম পরিচিত স্থাপত্য নিদর্শন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের স্বপ্ন ও উদ্যোগে মসজিদটির নির্মাণ শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর। ঈদুল আজহা ২০০৭ সালে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে নামাজ আদায় শুরু হয়। মসজিদটি আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এমন একটি উদাহরণ, যেখানে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের স্থাপত্যধারা একসঙ্গে স্থান পেয়েছে।
.png)
সাদা মার্বেলে গড়া অপূর্ব স্থাপত্য
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর শুভ্র সাদা রূপ। মসজিদের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত মার্বেল ও অলংকরণ ভবনটিকে দিনের আলোয় উজ্জ্বল এবং রাতের আলোয় আরও রহস্যময় করে তোলে।
মসজিদটির নকশায় মরক্কো, মুঘল, অটোমান, মামলুক ও ফাতিমীয়সহ বিভিন্ন ইসলামি স্থাপত্যধারার প্রভাব রয়েছে। ফলে পুরো স্থাপনাটি একদিকে যেমন ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, অন্যদিকে আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তিরও পরিচয় বহন করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটিতে ৮২টি গম্বুজ রয়েছে।
প্রধান নামাজের হলের ওপর অবস্থিত কেন্দ্রীয় গম্বুজটি সবচেয়ে বড়। এর ব্যাস প্রায় ৩২ দশমিক ৬ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৮৪ মিটার। গম্বুজের বাইরের অংশে সাদা মার্বেল, পেঁয়াজ আকৃতির অলংকরণ এবং সোনালি কাচের মোজাইকে সজ্জিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি চূড়া ব্যবহার করা হয়েছে। গম্বুজের নিচের জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরের অংশে কোরআনের আয়াত বিভিন্ন আরবি ক্যালিগ্রাফি শৈলীতে সাজানো হয়েছে।
_1790696953.jpg)
চার মিনারের অনন্য নকশা
মসজিদটির চার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি মিনার দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রতিটি মিনারের উচ্চতা প্রায় ১০৬ থেকে ১০৭ মিটার। মিনারগুলোর নকশায় বিভিন্ন সময়ের ইসলামি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য একত্র করা হয়েছে।
মিনারগুলোতে বর্গাকার, অষ্টভুজ ও বৃত্তাকার বিভিন্ন স্তরের সমন্বয় দেখা যায়। কোথাও সোনালি অলংকরণ, কোথাও সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে। ফলে চারটি মিনার শুধু আজানের স্থান হিসেবে নয়, পুরো মসজিদের স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত।
ফুলের নকশায় সাজানো বিশাল প্রাঙ্গণ
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণ বা ‘সাহান’ স্থাপনাটির অন্যতম আকর্ষণ। প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ বর্গমিটার আয়তনের এই প্রাঙ্গণে একসঙ্গে প্রায় ৩১ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
প্রাঙ্গণের মেঝেতে সাদা ও বিভিন্ন রঙের মার্বেল দিয়ে ফুলের বিশাল নকশা তৈরি করা হয়েছে। ইতালি, ভারত, গ্রিস ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছে এই অলংকরণে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রাঙ্গণের নকশায় ৯০ লাখের বেশি মোজাইক টুকরা ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্রিটিশ শিল্পী কেভিন ডিন এই ফুলের নকশার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুলের নকশা এতে স্থান পেয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সাদা মার্বেলের বিশাল মেঝেতে রঙিন ফুলের একটি বাগান ফুটে উঠেছে।
_1790697014.jpg)
পানির প্রতিফলনে বদলে যায় সৌন্দর্য
মসজিদের চারপাশে থাকা প্রতিফলন-পুকুরও এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। দিনের আলোয় সাদা গম্বুজ ও মিনারের প্রতিচ্ছবি পানিতে পড়ে একটি ভিন্ন দৃশ্য তৈরি করে। সূর্যাস্তের পর আলোকসজ্জার সঙ্গে পানিতে প্রতিফলিত মসজিদের ছবি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
রাতে মসজিদের আলোকসজ্জায় চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবও রাখা হয়েছে। আলোকব্যবস্থার মাধ্যমে মসজিদের বাইরের অংশের রঙ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। পূর্ণিমার সময় তুলনামূলক সাদা আলো থেকে চাঁদের ক্ষয়পর্বের সঙ্গে সঙ্গে আলো গাঢ় নীলের দিকে যায়।
প্রধান নামাজের হল
মসজিদের সবচেয়ে বড় নামাজের হলটি একসঙ্গে প্রায় ৭ হাজার ৮০০ মুসল্লিকে ধারণ করতে পারে। জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ, রমজানের বিশেষ নামাজসহ বড় জামাতের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সামঞ্জস্যপূর্ণ বিন্যাস। কেন্দ্রকে ঘিরে দুই পাশের অধিকাংশ নকশা ও উপাদানকে প্রায় আয়নার মতো করে সাজানো হয়েছে।
প্রধান নামাজের হলের ভেতরে ৯৬টি স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভগুলোতে মাদার অব পার্ল বা ঝিনুকজাতীয় মুক্তার আবরণ এবং সোনালি রঙের খেজুরপাতার নকশা দেখা যায়। স্তম্ভগুলো শুধু সৌন্দর্য বাড়ায়নি, ভবনের কাঠামোগত নকশারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে।
_1790697070.jpg)
বিশ্বের অন্যতম বড় হাতে বোনা কার্পেট
মসজিদের প্রধান নামাজের হলের মেঝেতে থাকা বিশাল কার্পেট দর্শনার্থীদের জন্য আরেকটি বিস্ময়ের বিষয়। এটি হাতে বোনা একটি বিশাল একখণ্ড কার্পেট, যার নকশায় ইসলামি শিল্পের ফুলেল ও জ্যামিতিক মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে।
ইরানি শিল্পী আলী খালিকির নকশায় কার্পেটটি তৈরিতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারিগর কাজ করেন বলে গুগল আর্টস অ্যান্ড কালচারের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এর ওজন প্রায় ৩৫ টন।
সবুজের ওপর সূক্ষ্ম ফুলেল নকশায় সাজানো এই কার্পেট বিশাল নামাজের হলের সাদা মার্বেল ও স্তম্ভের সঙ্গে একটি চমৎকার বৈপরীত্য তৈরি করে।
ঝাড়বাতিতে কোটি কোটি ক্রিস্টাল
মসজিদের অভ্যন্তরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হলো বিশাল ঝাড়বাতি। এখানে মোট সাতটি ঝাড়বাতি রয়েছে। প্রধান নামাজের হলের তিনটি বড় ঝাড়বাতি বিশেষভাবে নজরকাড়া।
সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতিটির নকশায় খেজুরগাছের প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। এর ব্যাস ১২ মিটার এবং উচ্চতা ১৫ দশমিক ৫ মিটার। এতে ১৫ হাজার ৫০০টি এলইডি আলো রয়েছে। ঝাড়বাতিতে ২৪ ক্যারেট সোনার আবরণ এবং সোয়ারোভস্কি ক্রিস্টাল ব্যবহার করা হয়েছে। সবুজ, লাল ও হলুদ রঙের ক্রিস্টাল বলের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি বলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এই ঝাড়বাতিগুলোর নকশা শুধু জাঁকজমক প্রদর্শনের জন্য নয়; এতে ইসলামি শিল্পের ফুলেল নকশা ও আরব সংস্কৃতির প্রতীক খেজুরগাছকে একত্র করা হয়েছে।
কিবলা দেয়াল ও মিহরাব
মসজিদের কিবলা দেয়ালও অত্যন্ত নান্দনিক। মিহরাবের নকশায় মধুর প্রবাহের প্রতীকী ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। সোনালি কাচের মোজাইকে তৈরি নকশাটি ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো করে সাজানো।
কিবলা দেয়ালে ব্যবহৃত রঙ ও অলংকরণ তুলনামূলকভাবে সংযত রাখা হয়েছে, যাতে নামাজরত মুসল্লিদের মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটে। ইসলামি শিল্প ও স্থাপত্যের সঙ্গে ধর্মীয় পরিবেশের ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির স্থাপত্যের মিলন
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর নকশায় একক কোনো অঞ্চলের স্থাপত্যকে অনুসরণ করা হয়নি। বরং ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপত্য ঐতিহ্যকে আধুনিক নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মিলিয়ে একটি নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণও এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড, মরক্কো, মিসর, তুরস্ক, গ্রিস, পাকিস্তান, ইতালি, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এই বৈচিত্র্য মসজিদটিকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, আন্তর্জাতিক স্থাপত্য ও শিল্পকলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করেছে।

ধর্মীয় স্থাপনা থেকে সাংস্কৃতিক আকর্ষণ
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদে মুসল্লিদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও দর্শনার্থীরাও আসেন। মসজিদ কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের জন্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা করে থাকে। এসব আয়োজনে ইসলামি স্থাপত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও মসজিদের বিভিন্ন নকশার তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।
ফলে মসজিদটি আবুধাবির ধর্মীয় জীবনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে এসে ইসলামি স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পান।
রাতের শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ
দিনের আলোয় সাদা মার্বেলের মসজিদটি যেমন উজ্জ্বল, রাত নামলে এর সৌন্দর্য যেন সম্পূর্ণ নতুন রূপ নেয়। গম্বুজ, মিনার ও দেয়ালে পরিকল্পিত আলোকসজ্জা পুরো স্থাপনাকে এক স্বপ্নিল পরিবেশে পরিণত করে।
বিশেষ করে পানিতে মসজিদের প্রতিচ্ছবি, নীলাভ আলো এবং আকাশের অন্ধকারের সঙ্গে সাদা স্থাপত্যের বৈপরীত্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। এ কারণে সূর্যাস্তের পরের সময়টি মসজিদের স্থাপত্য দেখার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
ইসলামী স্থাপত্যের আধুনিক প্রতীক
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ শুধু বড় আকারের একটি মসজিদ নয়; এটি ইসলামি স্থাপত্যের বিভিন্ন ধারার একটি আধুনিক সমন্বয়। গম্বুজ থেকে মিনার, স্তম্ভ থেকে কার্পেট, মোজাইক থেকে ঝাড়বাতি, ক্যালিগ্রাফি থেকে আলোকসজ্জা, প্রতিটি অংশেই নকশা ও সৌন্দর্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
মসজিদটির স্থাপত্যে সাদা রঙের আধিপত্য শান্তি ও পবিত্রতার একটি আবহ তৈরি করে। একই সঙ্গে রঙিন মার্বেল, ফুলের নকশা, সোনালি অলংকরণ ও ক্রিস্টালের ব্যবহার স্থাপনাটিকে রাজকীয় সৌন্দর্য দিয়েছে।
আবুধাবির আধুনিক নগরজীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ তাই একই সঙ্গে ধর্মীয় স্থাপনা, স্থাপত্যের নিদর্শন, শিল্পকলার প্রদর্শন এবং সাংস্কৃতিক মিলনস্থল। এর বিশাল গম্বুজ ও মিনার দূর থেকে যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি ভেতরের সূক্ষ্ম কারুকাজ কাছে গেলে দর্শনার্থীদের নতুন নতুন সৌন্দর্যের সন্ধান দেয়।
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই, এর বিশালত্বের পাশাপাশি সূক্ষ্মতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি গম্বুজের ভেতরের ক্যালিগ্রাফি, একটি স্তম্ভের ফুলেল নকশা, মার্বেলের ছোট ছোট মোজাইক কিংবা পানিতে প্রতিফলিত মিনারের ছবি, প্রতিটি অংশ যেন পুরো স্থাপত্যের সৌন্দর্যের আলাদা গল্প বলে।
আবুধাবির এই মসজিদ তাই আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ইসলামি স্থাপত্যগুলোর একটি। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এর নকশা, শিল্পকর্ম ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য একে বিশ্বজুড়ে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।