ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

‘পেরিলা’ কমাতে পারে ভোজ্যতেলের চাহিদা, হতে পারে রফতানিও

খায়রুল বাশার আশিক
প্রকাশিত: ১৯:২৯, ১৪ জুন ২০২২
‘পেরিলা’ কমাতে পারে ভোজ্যতেলের চাহিদা, হতে পারে রফতানিও
পেরিলা। ছবি: সংগৃহীত

দেশে দিন দিন বাড়ছে ভোজ্যতেলের চাহিদা। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় বাড়ছে আমদানি ব্যয়। আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং মানসম্মত ভোজ্যতেলের ফলন বৃদ্ধিতে দেশে নতুন তেলফসল ‘পেরিলা’ হাতছানি দিচ্ছে সম্ভাবনার। পেরিলা চাষের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের চাহিদাও অনেকটাই মেটানো সম্ভব। পাশাপাশি রফতানি করা গেলে আয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।  

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট ভোজ্যতেলের চাহিদা ৫১ দশমিক ২৭ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ৪৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়। এর মূল্য ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় ২৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। আমাদের দেশে তেলফসলের মধ্যে সরিষা, চীনাবাদাম, তিল, তিসি, সয়াবিন ও সূর্যমুখী প্রভৃতি চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী থেকেই সাধারণত তেল বানানো হয়। বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র চার ভাগ তেল ফসলের আবাদ হয়। দেশে মোট ৪ দশমিক ৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়। যা থেকে ৬ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন সরিষা এবং সরিষা থেকে ২ দশমিক ৫০ লাখ টন তেল উৎপন্ন হয়।

ভোজ্যতেলের এমন চাহিদা ও ঘাটতির মধ্যে সম্ভাবনাময় হাতছানি দিচ্ছে পেরিলা। পেরিলা চাষ করে বেশ ভালো লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পেরিলা ফসলের চাষাবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে অনেক কম মূল্যে পেরিলা তেল বাজারজাত করা সম্ভব হবে। 

Advertisement

পেরিলা কি?

পেরিলা বাংলাদেশে অভিযোজিত একটি নতুন ভোজ্যতেল ফসল। এটির সরিষার মতোই দানাদার বীজ হয়। যা থেকে মাড়াই করে তেল পাওয়া যায়। মাড়াইয়ের পর ৪০ শতাংশ তেল পাওয়া যায়, যেখানে সরিষা থেকে পাওয়া যায় ৪০-৪২ শতাংশ তেল। 

পেরিলার পরিচয়

পেরিলা মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার জাত যা কোরিয়ান পেরিলা নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Perilla frutescens (L.) Britton এবং এটি Lamiaceae (Mint) পরিবারভুক্ত। 

পেরিলার উপকারিতা

সায়েন্টিফিক বিশ্লেষণে পেরিলার পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ৫১ শতাংশ ওমেগা-৩ পাওয়া গেছে। পেরিলায় থাকা ঔষধি উপাদান হার্টের জন্য খুবই উপকারী। এখানে প্রাপ্ত চর্বির ৯১ শতাংশ অসম্পৃক্ত যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া মস্তিষ্ক ও ত্বকের জন্যও উপকারী।

তেল উৎপাদন ছাড়াও সবজি হিসেবে গোল্ডেন পেরিলার ব্যবহার রয়েছে। বাইরের অনেক দেশে সবজি হিসেবে রয়েছে পেরিলা পাতার আলাদা চাহিদা। তাছাড়া সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় রান্নায় আলাদা স্বাদ আনতেও এটি ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন ফাস্ট ফুডেও রয়েছে এর ব্যবহার।

দক্ষিণ কোরিয়ার পেরিলা জাত, যা কোরিয়ান পেরিলা নামে পরিচিত। ছবি:সংগৃহীত

বাংলাদেশে পেরিলা সম্ভাবনা

জানা গেছে, কোরিয়া থেকে আমদানি করা প্রতি লিটার ‘পেরিলা তেল’ বাংলাদেশের বাজারে ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি পুষ্টিগুণের কারণে ধনী শ্রেণির মধ্যে এই তেলের বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

কৃষক বর্ষা মৌসুমে ক্ষেতের আইলে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা যে কোনো উঁচু জায়গায় এটি চাষ করে তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় তেল সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন। সেইসঙ্গে বাজারেও বিক্রি করতে পারেন। এ বীজে ২৫ শতাংশের বেশ আমিষ থাকে। ফলে এই তেল সংগ্রহের পর যে খৈল পাওয়া যায় তা যথেষ্ট প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও উপাদেয়।

দেশে পেরিলার যাত্রা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক পেরিলা চাষ বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন। দীর্ঘদিন গবেষণা করে পেরিলাকে দেশীয় আবহাওয়ায় অভিযোজন করাতে সক্ষম হয়েছেন এ গবেষক দল। গবেষক দলটির মতে সাউ-পেরিলা’ বাংলাদেশে উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ আবহাওয়ায় অভিযোজন সম্পন্ন।

কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ এম এম তারিক হোসেনের তত্ত্বাবধানে ২০০৭ সাল থেকে এর ধারাবাহিক গবেষণা শুরু হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় বীজ বোর্ড সাউথ কোরিয়ান ভ্যারাইটির সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) নামে জাতটির নিবন্ধন দেয় এবং স্থানীয় কৃষকদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। 

পেরিলা নিয়ে সরকারের ভাবনা

২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) নামে বাংলাদেশে প্রথম এর একটি জাত নিবন্ধিত হয়। জাতটি এখন মাঠ পর্যায়ে চাষ শুরু হয়েছে। 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানাচ্ছে, সাধারণ ভোজ্য তেলের চেয়ে বাড়তি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হাই ভ্যালু তৈল ফসল পেরিলার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এটি এখন বাংলাদেশের মাটিতে যে কেউ চাষ করতে পারেন। 

উচ্চমূল্যের এই তৈল ফসলটি অবমুক্তির পরই ১৪টি উপজেলায় (প্রতি উপজেলায় এক বিঘা করে) পরীক্ষামূলক চাষ হয়। ২০২০ সালে প্রাথমিকভাবে দেশের ৪৫টি উপজেলার ১৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে পেরিলা চাষে উৎসাহ দেখিয়েছে কয়েকটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাল-তীরকে এর বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

সরকারের কৃষি বিভাগ আশা করছেন, দেশে নতুন ভোজ্য তেল সাউ-পেরিলার চাষ সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে। 

পেরিলা চাষ 

পেরিলা চাষের আগে বেশ কিছু বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। চাষের আগে সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়োজন। 

পানি জমে থাকে না- এমন প্রায় সব ধরনের মাটিতে এ ফসল চাষের উপযোগী। তবে বেলে দোঁ-আশ বা দোঁ-আশ মাটি পেরিলা চাষের জন্য বেশি ভালো।

বীজতলা তৈরি, বীজ বপন ও জমি তৈরি

খরিপ-২ মৌসুম, বীজ বপনের উপযুক্ত সময় ১০ জুলাই-২৫ জুলাই। পেরিলা অত্যন্ত ফটোসেনসেটিভ ফসল। সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে পেরিলা গাছে ফুল আসা শুরু হয়।

কাজেই গাছের পর্যাপ্ত অঙ্গজ বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ফলন পেতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশ্যই বীজ বপন করতে হবে। প্রতি হেক্টরে এক থেকে দেড় কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। বীজতলার প্রস্থ এক থেকে দেড় মিটার হবে। দৈর্ঘ্য জমির আকার অনুযায়ী যেকোনো মাপে নেওয়া যাবে। বীজতলায় জৈবসারের ব্যবস্থা করলে স্বাস্থ্যবান চারা পাওয়া যাবে।

বীজতলায় দুই বেডের মাঝে নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে বৃষ্টি হওয়ার পর অতিরিক্ত পানি বীজতলায় জমে না থাকতে পারে। বীজের আকার ছোট হওয়ায় মাটি যথাসম্ভব ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। পিঁপড়ার আক্রমণ যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খরিপ-২ মৌসুমে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় বীজ বপনের পর প্রথম ১৫ দিন পর্যন্ত বীজতলার চার পাশে খুঁটি দিয়ে উঁচু করে পলিথিন দেওয়া যেতে পারে।

বীজ বপনের কয়েক মাস পরেই দেখা মিলবে এমন পেরিলা গাছ। ছবি: সংগৃহীত

১ থেকে ৪ ইঞ্চি গভীর লাইন করে বীজ বপন করলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বাড়ে। অথবা বীজ ছিটিয়ে দিয়ে ঝুরঝুরে মাটি উপরে দিয়ে দিতে হবে। বীজ বপনের পর বীজতলায় হালকা করে পানি দিতে হবে। বীজতলা যেন একেবারে শুকিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

চার থেকে পাঁচটি আড়াআড়ি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হবে। জমির চারপাশে নালার ব্যবস্থা করলে পানি নিষ্কাশনের জন্য সুবিধা হবে। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩০-৪০ সেন্টিমিটার এবং লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বজায় রেখে চারা রোপণ করতে হয়।   

চারা রোপণ

বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর চারা রোপণের উপযোগী হয়। এ সময় প্রতিটি চারায় পাঁচ থেকে ছয়টি পাতা হয়। চারা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গেই রোপণ করতে হবে।

চারা উত্তোলনের পর চারার আঁটি বাঁধার সময় শিকড়ে মাটি রেখে দিলে রোপণের পর গাছের দ্রুত বৃদ্ধিতে উপকার হয়। মূল জমিতে সাধারণত দুই মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করে চারা রোপণ করলে পানি নিষ্কাশনের জন্য ভালো হয়। 

দুই বেডের মাঝে ২০-৩০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত নালা রাখতে হবে। সাধারণত বেড তৈরি ছাড়াও চারা রোপণ করা যায়। সেক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চারা রোপণের পর পরই হালকা সেচ দিতে হবে।

সেচ ও নিষ্কাশন

বর্ষাকাল বা খরিপ-২ মৌসুমে পেরিলার চাষ হওয়ায় সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে ফুল আসার সময় একটানা ১৫-২০ দিন বৃষ্টি না হলে হালকা সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হতে পারে। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে সেজন্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

অন্যান্য পরিচর্যা

চারা রোপণের ১০-১৫- দিন পর প্রথমবার এবং ২৫-৩০ দিন পর দ্বিতীয়বার নিড়ানি দিতে হয়। এ ফসলে সাধারণত রোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ খুবই কম হয়। তবে কাটুই পোকা, হক মথ, বিছা পোকা প্রভৃতি পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। ক্ষতির ধরন দেখে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিতে হবে।

বীজ বা ফসল পরিপক্বতার সময়

চারা রোপণের ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে পেরিলা ফসল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত বীজ পরিপক্ব হলে গাছের পাতা ঝরে যায়। গাছের পাতা ৮০ শতাংশ হলুদ হলে বীজ ধূসর রং ধারণ করে এবং বীজ সংগ্রহের উপযোগী হয়। বাইরের দিক থেকে বীজ দেখা যায় বলে বীজের পরিপক্বতা সহজেই বুঝা যায়।

বাংলাদেশে পেরিলার বাণিজ্যিক উৎপাদন। ছবি: সংগৃহীত

ফসল মাড়াই/সংগ্রহ পদ্ধতি

বীজে পরিপক্বতা আসার পর গাছের গোঁড়া কেটে দিতে হয় অথবা পুরো গাছ উপড়ে ফেলতে হয়। তারপর শক্ত চটের বস্তা অথবা শক্ত পলিথিন বা ত্রিপল বিছিয়ে গাছগুলো ধরে হালকাভাবে পিটিয়ে বীজ সহজেই সংগ্রহ করা যায়। হেক্টরে এক দশমিক তিন থেকে এক দশমিক পাঁচ টন ফলন হয়ে থাকে।

বীজ সংরক্ষণ

বীজ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। বীজের আর্দ্রতা সাত থেকে আট শতাংশ হলে বীজ টিন অথবা প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ সংরক্ষণের পাত্রে বাতাস যেন চলাচল না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সংরক্ষিত বীজ যথাসম্ভব আর্দ্র নয় এমন ঠাণ্ডা জায়গায় রাখতে হবে। সংরক্ষণের জন্য বীজভর্তি পাত্র মাটির সংস্পর্শে রাখা বাঞ্ছনীয়। 

পেরিলার বাণিজ্যিক উৎপাদনের ফলে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব বলে আশা করছেন গবেষকরা। পেরিলা তেল গ্রহণে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে অন্যদিকে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এর চাষ বাড়ানো গেলে তেল উৎপাদন বাড়িয়ে রফতানি করাও সম্ভব। 

তথ্য সহায়তা: বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) 

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!