ত্রিমুখী চাপে অস্তিত্বের লড়াইয়ে তাঁতশিল্প
সারা দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরেই এ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়ে আসছে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখন অভাব-অনটন, ঋণের বোঝা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর-বেলকুচি, পাবনা, টাঙ্গাইলের পাথরাইল-বল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারসহ দেশের প্রধান তাঁত-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে একসময় যে তাঁতকলগুলো ব্যস্ত থাকত, সেগুলোর অনেকই এখন নিস্তব্ধ।
সুতার দাম বৃদ্ধি, রঙ ও রাসায়নিকের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ঘনঘন লোডশেডিং এবং বাজারে সস্তা পাওয়ারলুম ও আমদানিনির্ভর পণ্যের চাপ—সব মিলিয়ে চরম সংকটে পড়েছে দেশের তাঁতশিল্প। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না পণ্যের দাম। ফলে ছোট ও প্রান্তিক তাঁতিরা লোকসান গুনতে গুনতে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
.png)
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বেলকুচি ও এনায়েতপুর এলাকায় একসময় কয়েক লাখ তাঁতকল ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এসব তাঁতকলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষ জড়িত ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
শাহজাদপুরের তাঁত মালিক আলমাস হোসেন বলেন, গত বছর এক ডোপ সুতার দাম ছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এখন সেটা ২২ হাজার টাকার কাছাকাছি উঠে গেছে। অথচ লুঙ্গির বিক্রয়মূল্য কমেছে। রমজানে যে লুঙ্গি ২২০-২৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন সেটা ১৮০-২০০ টাকায় নামিয়ে আনতে হচ্ছে। লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময় ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন করতে হয়। এতে ব্যয় আরও বেড়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ছোট তাঁতিরা আর টিকতে পারছেন না।
তাঁত মালিক আব্দুস সাহিদও লোডশেডিং ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন অর্ধেক হয়ে গেছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় খরচ চারগুণ বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের দাম বাড়ছে না। ছোট তাঁতিরা টিকতে পারছেন না। অনেক কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
সুতা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা মো. শাকিল আহমেদ বলেন, ভারতীয় সুতা আসা কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাঁতিরা খোলা বাজার থেকে দ্বিগুণ দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
শাহজাদপুরের তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাহমুদ দাবি করেন, গত এক বছরে শুধু শাহজাদপুরেই প্রায় এক লাখ ১২ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। একই সময়ে বাজারের বেচাকেনা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে বলেও তিনি জানান।
টাঙ্গাইলের বল্লা ইউনিয়নের ৬০ বছর বয়সী তাঁতি মোহাম্মদ আমীর হোসেন প্রায় ৪০ বছর ধরে হাতের তাঁতে শাড়ি বুনছেন। তিনি বলেন, একসময় বল্লায় প্রায় ৫০ হাজার তাঁতি ছিলেন। প্রতিটি বাড়িতে তাঁতের শব্দ শোনা যেত। এখন তিন-চার হাজারের বেশি নেই।
তিনি জানান, অনেক তাঁতি ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে তাঁত বিক্রি করে রিকশা চালাচ্ছেন কিংবা শহরে গিয়ে দিনমজুরি করছেন। তাঁর ভাষায়, কাঁচামালের দাম আগে যেখানে ১ হাজার ৩০০ টাকা লাগত, এখন ৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। শাড়ি বিক্রি করে খরচ উঠছে না। সরকার যদি এখনই হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে এই পেশা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে।
টাঙ্গাইলের পাথরাইলের প্রবীণ তাঁতি বিশ্বনাথ বসাক বলেন, ১০০ কাউন্টের সুতা বান্ডেলের দাম দুই বছরে ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে পড়ে আমরা আরও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হই। সরকারি সহযোগিতা না পেলে এই শিল্প টিকবে না। আমাদের সন্তানদের আর এই পেশায় আগ্রহ নেই।
পাবনার দোগাছী কুলুনিয়া গ্রামের পাওয়ারলুম মালিক মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ৮০ কাউন্ট সুতা আগে ২৬-২৮ হাজার টাকায় পাওয়া যেত। এখন ৩০ হাজার টাকার বেশি। লুঙ্গিতে লাভ কমে গেছে ১০-১৫ টাকায়। দশটি তাঁতের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তিনি জানান, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোতে এই কাউন্টের সুতা উৎপাদন হয় না। ফলে ভারত ও চীন থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সুতার দামও অস্থির হয়ে পড়েছে।
তাঁতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিশেষ করে মৌসুমি চাহিদার সময় লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিরাজগঞ্জের তাঁতিদের অভিযোগ, অনেক সময় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসার পর তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না।
তাঁতশিল্পের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন সিদ্দিকী জানান, সিরাজগঞ্জের প্রবেশমুখে তাঁত কুঞ্জ ব্র্যান্ডিং জেলার জন্য আধুনিক মানের ‘বিজনেস হাব’ গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, শিল্পকে এগিয়ে নিতে রঙ, সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্য কমিয়ে সহজে তাঁতি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, আমদানি সুপারিশ প্রক্রিয়ায় জটিলতা ছিল। এখন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রান্তিক তাঁতিরা সরাসরি সুবিধা পান। আমরা চাই তাঁতশিল্প টিকে থাকুক এবং তাঁতিরা ন্যায্য মূল্যে কাঁচামাল পান।
তবে তাঁতি সমিতিগুলোর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সুতা ও রং আমদানির সুপারিশ প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকায় খোলা বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। তাঁদের দাবি, আগে যে কাপড় তৈরি করতে ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে প্রায় ১ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
টেক্সটাইল খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ১৯৯০-এর দশকে পাঁচ লাখের বেশি থাকলেও ২০১৮ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে তা প্রায় এক লাখ ১৬ হাজারে নেমে আসে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন দশকে প্রায় ৭৮ শতাংশ হাতের তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষক ড. মনজুর আলম বলেন, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই শিল্পকে ধ্বংস করছে। সরকারকে স্বল্প সুদে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বিপণন সহায়তা দিতে হবে। নইলে ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।
আরেক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আব্দুল ওহাব শামস বলেন, পাওয়ারলুম ও আমদানি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হাতের তাঁত টিকতে পারছে না। নকশা উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং এবং রপ্তানি বাজার খুলে দিতে হবে। তাঁতিদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা জরুরি।
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দেশীয় শিল্প রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁতশিল্পকেও এর আওতায় আনা হবে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এক কর্মশালায় বলেন, শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে। প্রকৃত তাঁতিদের উপকারে আসবে এমন সংস্কার দ্রুত করা হবে। প্রান্তিক তাঁতিদের ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহের কথা ভাবা হচ্ছে।
শুধু সিরাজগঞ্জ বা টাঙ্গাইল নয়, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও নরসিংদীর বাবুরহাট এলাকাতেও তাঁতশিল্পের সংকট স্পষ্ট। একসময় এসব এলাকায় হাজার হাজার তাঁত চললেও এখন অনেক গ্রামে তাঁতের শব্দ শোনা যায় না। কাজ হারানো তাঁতিদের কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।
তাঁতশিল্পের এই সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, মুসলিনসহ ঐতিহ্যবাহী বুনন কৌশল হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
তাঁতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ সংকট কমানো, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নকশা উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক তাঁতির জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, অন্যদিকে দেশের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।