নির্মাণশিল্পে পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা: ঝুঁকিতে নগর অবকাঠামো
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ যখন নিরাপদ ও আধুনিক নগরায়ণের পথে এগোতে চাইছে, ঠিক তখনই দেশের মূল চালিকাশক্তি নির্মাণ খাত আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে নজিরবিহীন দুর্নীতি, তদারকহীনতা ও কাঠামোগত অনিয়মের চক্রে। বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনার নিয়মকানুন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। নকশা বহির্ভূত বাড়তি তলা নির্মাণ, সেটব্যাক না রাখা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর অবাধ ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা ও স্বার্থান্বেষী মহল—এদের ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশে খাতটিতে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ নৈরাজ্য। নগর বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি আর বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; এটি সুসংগঠিত ‘পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা’।
এই অব্যবস্থাপনার দ্বিবিধ মারাত্মক পরিণতি দেশের সামনে এক অশনী সংকেত। একদিকে রাজধানী ঢাকাসহ প্রধান নগরীগুলো প্রতিনিয়ত অগ্নিকান্ড, ভবন ধস ও ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে পড়ছে; অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকির কারণে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য রাজস্ব থেকে।
.png)
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এবং একাধিক নগর উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নগর অবকাঠামোর এক আতঙ্কজনক চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি বহুতল ভবন কোনো না কোনোভাবে অনুমোদিত নকশা বা বিএনবিসি লঙ্ঘন করে নির্মিত। নকশায় গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের কথা বলা হলেও প্রায় ৭০ শতাংশ ভবনে সেই জায়গা পরবর্তীতে দোকান, গুদাম বা ফ্ল্যাটে রূপান্তর করা হয়। ভবনের চারপাশে আইনানুযায়ী চার থেকে পাঁচ ফুট সেটব্যাক রাখার নিয়ম থাকলেও ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশিতে কার্যকর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। অগ্নিনির্বাপক লাইসেন্স কাগজে থাকলেও বাস্তবে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি বন্ধ থাকে বা মালামাল রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও রিয়েল এস্টেট খাতের আর্থিক বিশ্লেষণ বলছে, জমি ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে কেবল নিবন্ধনেই বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার উৎসে কর ও রেজিস্ট্রেশন ফি ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনে অগ্নিকান্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানি এই পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। রাজউকের নথি অনুযায়ী, ভবনটি সাত তলা আবাসিক নকশায় অনুমোদিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে আট তলা নির্মাণ করে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই রেস্তোরাঁ ও দোকানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। কোনো জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ছিল না; মূল সিঁড়িতে রাখা ছিল গ্যাসের সিলিন্ডার। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক নোটিশ সত্ত্বেও তদারককারী সংস্থাগুলোর ঢিলেঢালা ভাব ও অসাধু লেনদেনের সুযোগে ভবনটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়। এটি দুর্ঘটনা ছিল না, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও তদারকহীনতার ফলে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট দুর্যোগ।
একইভাবে ঢাকার পশ্চিমে বসিলা এবং পূর্বে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কসংলগ্ন এলাকায় গত এক দশকে যে বিশাল আবাসন ও বহুতল ভবনের বিস্তার ঘটেছে, তার সিংহভাগই জলাশয় ভরাট ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি) লঙ্ঘন করে নির্মিত। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রাজউকের বন্যা প্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এসব জায়গায় নিচু জমি ও নদীর প্লাবনভূমি ভরাট করে শত শত ডেভেলপার ও ব্যক্তি উদ্যোগে ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। সয়েল টেস্ট ও পিলিংয়ের সঠিক নিয়ম না মেনে এবং অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই নির্মিত এসব ভবনের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ভুয়া প্রজেক্টের নামে সাধারণ মানুষের কাছে প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার কোনো হিসাব সরকারি রাজস্ব বা ব্যাংকিং চ্যানেলে মিলছে না।
নির্মাণ খাতের এই অবস্থা নিয়ে শীর্ষ নগর গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে যাকে আইন অমান্য করা বলছি, তা এখন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনিয়ম নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ভবনের নকশা অনুমোদনের পর তা কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, তা তদারকি করা রাজউকের সরাসরি আইনি দায়িত্ব। কিন্তু চোখের সামনে অতিরিক্ত তলা উঠছে, সেটব্যাক মানা হচ্ছে না, অথচ পরিদর্শন কর্মকর্তা নিরব থাকেন। এই নিরবতার পেছনে বিশাল অর্থের লেনদেন। সিস্টেমকে দুর্নীতিমুক্ত না করলে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।”
বিশিষ্ট পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত বলেন, “যদি রিখটার স্কেলে ৭.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তবে ঢাকার কতগুলো ভবন দাঁড়িয়ে থাকবে, তা নিয়ে বড় সন্দেহ আছে। নদী ও নিচু জমি ভরাট করে সয়েল কমপ্যাকশন না করে যেসব ভবন তোলা হয়েছে, তার বেশিরভাগেরই স্ট্রাকচারাল সেফটি নেই। যখন কোনো শহরের ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভেঙে তৈরি হয়, তখন বুঝতে হবে এটি সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা।”
নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা তুলে ধরে বলেন, “নির্মাণ খাতের এই পরিকল্পিত অনিয়ম দুটি ভয়াবহ ক্ষতি করছে। প্রথমত, শহরকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য ও বিপজ্জনক করে তুলছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের কর ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। অনেক ভুঁইফোড় ডেভেলপার ও ক্রেতা অপ্রদর্শিত বা কালোটাকা এই খাতে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। ফ্ল্যাট ও জমির বাজারমূল্য এবং রেজিস্ট্রেশন মূল্যের মধ্যে আসমান-জমিন তফাত রাখা হয়। শত শত কোটি টাকা রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। সৎ ডেভেলপাররা এই অসৎ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে যাচ্ছেন।”
দায়িত্বপ্রাপ্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সমস্যা স্বীকার করে সংস্কারের কথা বলছেন। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “অতীতে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসচ্ছতা এবং অসাধু মালিকদের যোগসাজশে যে নকশা বিচ্যুতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা আমরা শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করছি। স্যাটেলাইট ইমেজ, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নির্মাণাধীন ভবন নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনছি। অনিয়মের ক্ষেত্রে নোটিশ ও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো প্রভাবশালীর তদবির গ্রহণ করা হবে না। প্রশাসনিক জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি।”
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, “অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি আবাসন খাতে অনিয়ম ও অননুমোদিত ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেশি। আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি প্রকল্পে আইন ও বিএনবিসি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছি। বেসরকারি ডেভেলপারদের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট অডিট ও শর্তাবলী আরোপ করা হচ্ছে। নগরকে সুসংগঠিত করতে সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “স্ট্রাকচারাল সেফটি, উপকরণের গুণগত মান এবং ভূগর্ভস্থ ভিত্তির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করার সুযোগ নেই। বেসরকারি খাতে থার্ড-পার্টি ইঞ্জিনিয়ারিং অডিট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। নকশা বিচ্যুতি জেনেও সই করা প্রকৌশলী বা নকশাকারদের লাইসেন্স বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের কঠোর নিয়ম করা দরকার।”
অপরিকল্পিত নগরশিল্প স্থাপনে রাজস্ব ফাঁকির চিত্র আরও স্পষ্ট। একটি ফ্ল্যাট বা জমির প্রকৃত মূল্য ২ কোটি টাকা হলেও দলিলে দেখানো হয় ৬০-৭০ লাখ। ফলে সরকার সরাসরি ১৫-২০ শতাংশ উৎস কর, ভ্যাট ও রেজিস্ট্রেশন ফি হারাচ্ছে। অননুমোদিত অতিরিক্ত তলা বা অনিয়ম করে তৈরি ফ্ল্যাটের ক্যাশ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে, ছায়া অর্থনীতি বিস্তার লাভ করছে। রিহ্যাব বা রাজউকের তালিকাভুক্ত না হয়েও শত শত অখ্যাত প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণ ও কেনাবেচা করছে, যা ভ্যাট ও কর্পোরেট করের আওতার বাইরে।
উত্তরণের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা স্বাধীন থার্ড-পার্টি অডিট ব্যবস্থা, ওয়ান-স্টপ পেপারলেস ডিজিটালাইজেশন, ডিজিটাল ট্রানজেকশন ও বাস্তবভিত্তিক মৌজা দর নির্ধারণ এবং কঠোর শাস্তি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের সুপারিশ করেছেন। ভবন নির্মাণের সময় স্বায়ত্তশাসিত পেশাজীবী সংস্থাগুলোর যৌথ তদারকি টিম গঠন, সকল ছাড়পত্র প্রক্রিয়া অনলাইন ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের অধীনে আনা, আবাসন খাতে ক্যাশ লেনদেন নিষিদ্ধ করে ডিজিটাল ব্যাংকিং বাধ্যতামূলক করা এবং অনিয়মে জড়িতদের স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলা হয়েছে।
যেকোনো দেশের আধুনিকায়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নির্মাণশিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই শিল্প যদি দুর্নীতি ও পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার কবলে পড়ে নাগরিকদের জীবনকে জিম্মি করে ফেলে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বলছেন, আজ যদি রাজউকসহ তদারকি সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা না আনা হয় এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে আইনি শাসন প্রতিষ্ঠা না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে গোটা নগর অবকাঠামো ভেঙে পড়বে। জীবন, সম্পদ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি রক্ষায় নির্মাণ খাতের এই রোগ উপশম করা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার জরুরি তাগিদ।