অপ্রতিরোধ্য ভেজাল কারবারিরা
দেশের বাজারে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ, তেল, মসলা ও শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণের উপস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের একাংশ অতিমুনাফার আশায় খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু মেশাচ্ছেন বলে পরীক্ষায় উঠে এসেছে। সরকার সম্প্রতি নতুন আইন জারি করে খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। সনদ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি করা যাবে না। তবে মাঠপর্যায়ে আইনটির প্রয়োগ ধীর হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখনো সনদ ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব তথ্য উঠে এসেছে ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) মোট ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৫৮৬টি নমুনায়—অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশে—ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে। সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে ১১২টি নমুনায়।
.png)
আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, শিশুদের জুস, চানাচুর, মরিচ ও হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা ও মধুসহ বিভিন্ন পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক পাওয়া গেছে।
চিপস ও ভাজা খাবারের নমুনায়ও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। পরীক্ষিত চিপসের ৬৫ শতাংশ নমুনায় অ্যাক্রিলামাইড শনাক্ত হয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রায় খাবার ভাজা বা পোড়ানোর সময় তৈরি হওয়া এই রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. নাজরিনা খাতুন বলেন, ‘অ্যাক্রিলামাইড দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শিশুরা বেশি চিপস ও ভাজা খাবার খায় বলে তাদের শরীরে এর প্রভাব আরও গুরুতর। আমরা দেখছি, তরুণ বয়সেও ক্যানসারের রোগী বাড়ছে। নতুন আইন বাস্তবায়ন না হলে এই প্রবণতা কমবে না। সরকারকে দ্রুত সনদ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা বাড়াতে হবে।’
ফল ও শাকসবজির নমুনাতেও পাওয়া গেছে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ। পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ ফলে এবং ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হয়েছে। কিছু ফল আকর্ষণীয় ও চকচকে দেখাতে নিষিদ্ধ রঙ ও রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। রাজধানীর কাওরান বাজারের ক্রেতা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন বাজার করি। আপেল, আম, টমেটো সব চকচকে দেখায়। কিন্তু বাসায় এনে ধুলে রঙ উঠে যায়। শিশুদের জুস কিনলেও ভয় হয়। এখন আর বিশ্বাস থাকে না কোনটা খাওয়া যায়। সরকার সনদ বাধ্যতামূলক করেছে শুনেছি, কিন্তু বাজারে তো কোনো পরিবর্তন দেখি না। ক্রেতা হিসেবে আমরা অসহায়।’
মসলায় ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পরীক্ষিত হলুদের ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। লবণের কিছু নমুনায় সহনীয় মাত্রার তুলনায় ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা শনাক্ত হয়েছে। মসলা বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘হলুদ-মরিচে রঙ মেশানোর অভিযোগ আসে। কিন্তু ক্রেতারা চকচকে পণ্য চায়। আমরা যদি না দিই, ব্যবসা মরে যায়। সরকার যদি কঠোর হয় এবং সনদ ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালু করে, তাহলে সবাই মানবে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা উচিত।’
চালের নমুনাতেও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ১৩টি নমুনায় অতিরিক্ত আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম শনাক্ত হয়েছে। মাছ ও মুরগির নমুনায় ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিও ধরা পড়েছে। সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরের খাবারে রঙ, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ও অতিরিক্ত তেল মেশানো হয়। এসব উপাদান কিডনি ও যকৃতের ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে দুরারোগ্য রোগ সৃষ্টি হয়। আমরা হাসপাতালে প্রতিদিন এমন রোগী দেখছি যাদের কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে অন্তত বাজারের খাবার কিছুটা নিরাপদ হবে।’
দুধ, ঘি, তেল ও আচারের নমুনাতেও পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেটসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে। পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. ফারহানা আক্তার বলেন, ‘মায়েরা অজান্তেই শিশুদের ভেজালযুক্ত জুস, চিপস ও পাউডার দুধ খাওয়াচ্ছেন। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় অভিভাবকরা নিরাপদ পণ্য চিনতে পারবেন। সরকারকে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষিত উপাদানযুক্ত খাবার গ্রহণ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। ক্যানসার, কিডনি, যকৃত ও অন্যান্য অসুস্থতার সঙ্গে খাদ্যদূষণের সম্পর্ক নিয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর কত মানুষ ক্যানসার, কিডনি রোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন—এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ভরযোগ্য গবেষণা বা সরকারি তথ্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ভেজাল কারবারিরা এখনো অপ্রতিরোধ্য। সরকার নতুন আইন করেছে—খাদ্য ব্যবসা করতে হলে সনদ বাধ্যতামূলক। সনদ ছাড়া কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। যারা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো ছাড় নেই। আমরা মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করছি এবং জনবল সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ জানান, ‘নতুন আইনে সনদ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখন থেকে উৎপাদন ও বিক্রির পুরো চেইন নজরদারির আওতায় আসবে। বিএফএসএ ও বিএসটিআইকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। জনবল সংকট দূর করতে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে যাতে ভেজাল কারবারিরা আর সহজে পার না পায়।’
বাজার মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করি। অনেক দোকানে সনদ নেই। নতুন আইন অনুযায়ী সনদ না থাকলে সিলগালা করার ক্ষমতা আমাদের আছে। তবে জনবল কম থাকায় সব জায়গায় পৌঁছানো যায় না। ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে এবং সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, ‘প্রতিদিন ভেজাল খাদ্য নিয়ে অভিযোগ আসছে। নতুন আইনে সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। সনদ না থাকলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আমরা গণশুনানি ও অভিযান অব্যাহত রাখব যাতে ভোক্তারা সুরক্ষা পান।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, ‘আমরা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছি। কিন্তু জনবল সংকট বড় বাধা। প্রতি জেলায় মাত্র কয়েকজন কর্মী দিয়ে পুরো কার্যক্রম চালাতে হয়। নতুন আইনের আওতায় সনদ প্রদান শুরু হয়েছে। সনদ না থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় সনদ নিন এবং মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করুন।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর লাখো মানুষ ক্যানসার, কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম বাড়ছে। ভেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সরকারকে দ্রুত সনদ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকির ঘাটতিতে এ ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। নতুন আইনে সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও অনেক ব্যবসায়ী এখনো সনদ ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনবল সংকট দূর করা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, জেলা পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং এবং ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদক, ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তা—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন সনদ ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা ও বাজার তদারকি কতটা বাড়ানো যায়, তার ওপরই খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।