ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

সম্ভাবনা থেকে সংকটে গণঅধিকার পরিষদ

নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩:০৫, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্ভাবনা থেকে সংকটে গণঅধিকার পরিষদ
ফাইল ছবি

তরুণদের নেতৃত্বে নতুন ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে গণঅধিকার পরিষদ একটি সম্ভাবনাময় ‘তৃতীয় ধারা’ গড়ে তোলার আশা জাগিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, নীতিগত বিচ্যুতি এবং রাজনৈতিক কৌশলের কারণে দলটি পরবর্তীতে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। ফলে দলটি তার নিজস্ব স্বতন্ত্রতা ধরে রাখতে না পেরে ক্ষমতার রাজনীতি ও বড় দলের ধারায় বিলীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা বলেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক টানাপোড়েন দলটির সাংগঠনিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে রাজনীতির মাঠে যে সম্ভাবনা নিয়ে দলটি যাত্রা শুরু করেছিল, তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কোন্দল কাটিয়ে কার্যকরভাবে মাঠে ফিরতে না পারলে দলটির রাজনৈতিক প্রভাব আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

Advertisement

২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে কোটা সংস্কার আন্দোলনের উদ্দেশ্যে এই প্ল্যাটফর্মটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ’। এই ব্যানারে ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা। নানা বিতর্ক থাকলেও জয় পায় ভিপি এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে। এরপর ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারাদেশে সুসংগঠিত হতে থাকে ছাত্র অধিকার পরিষদ, যা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার দ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর ‘গণঅধিকার পরিষদ’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে দলটি পথচলা শুরু করে। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ—এই চার মূলনীতির ওপর ভরসা করে মো. রাশেদ খান, হাসান আল মামুন, বিন ইয়ামিন মোল্লাসহ কোটাবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন নেতা ও দেশের বহু তরুণ দলটিতে সারথি হিসেবে যুক্ত হন। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রচলিত ধারার বাইরে গণঅধিকার পরিষদ একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় ধারা’ গড়ে তুলবে।

তবে দুই বছর পূর্ণ না হতেই দলটির নেতারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৩ সালের জুনে আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া ও সদস্যসচিব নুরুল হক একে অপরকে পাল্টাপাল্টি অব্যাহতি দেন। পরবর্তীতে নুরুল হকের সমর্থকেরা ১০ জুলাই জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করেন। তারা নুরুল হককে সভাপতি ও মুহাম্মদ রাশেদ খানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। অন্যদিকে, রেজা কিবরিয়াকে আহ্বায়ক ও ফারুক হাসানকে ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব করে অপর একটি অংশ দলীয় কার্যক্রম চালাতে থাকে। শেষপর্যন্ত ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রেজা কিবরিয়া গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করেন।

এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করলেও প্রাথমিক পর্যায়ে নিবন্ধন পেতে ব্যর্থ হয় গণঅধিকার পরিষদ। ২০২৪ সালের জুনে বিভক্ত দুই পক্ষ পুনরায় একত্রিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়। একই বছরের ১৪ আগস্ট দলটি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। ৩১ আগস্ট তৃণমূল কর্মীদের আল্টিমেটামের পর, ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ‘ট্রাক’ প্রতীকসহ দলটিকে নিবন্ধন প্রদান করে।

২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দলটির উচ্চতর পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সভাপতি নুরুল হক নুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এদিকে, দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক ও পরবর্তীতে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান ২০২৫ সালে গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) পদে নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়া দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনের আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কয়েক শত নেতা-কর্মী দল ছেড়েছেন।

সাধারণ মানুষের আশা ছিল, প্রচলিত রাজনৈতিক সংকট ও সীমাবদ্ধতার বাইরে এসে গণঅধিকার পরিষদ একটি উদার ও স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত দলটি তার নিজস্ব স্বতন্ত্রতা ধরে রাখতে না পেরে বড় দলের রাজনৈতিক ধারায় বিলীন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গণঅধিকার পরিষদের একজন প্রতিনিধি সংসদে আছেন, কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন সংসদে থাকা আর দল হিসেবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। প্রতিষ্ঠার পর নেতাদের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, বর্তমান অবস্থা তার চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, সংসদে আসন পেলেও দল হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করা তাদের জন্য বেশ কঠিন।’

আঞ্চলিক ইতিহাস ও রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ গণঅধিকার পরিষদের বর্তমান স্থবিরতা ও রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংকটময় ইস্যুতে তাদের সরগরম ও মুখর থাকার কথা ছিল। কিন্তু গণঅধিকার পরিষদের ক্ষেত্রে বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।’

দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও শীর্ষ নেতৃত্বের পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি আরও জানান, যেসব প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এই দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তারা আজ বিভক্ত হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছেন। দলটির প্রধানও বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বাকিদের রাজনীতিতে এখন তেমন কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আলতাফ পারভেজ জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো দল একবার দিক বা মূল লক্ষ্য হারিয়ে ফেললে, সেখানে আবার মূলধারায় ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। গণঅধিকার পরিষদের উচিত ছিল বিএনপির জোটে বিলীন না হয়ে নিজেদের আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে নিজস্ব পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো—তবেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারত।’

তবে জনবিচ্ছিন্নতা ও দলীয় নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ বলেন, ‘আমরা এখন বর্তমান সরকারের অংশ। এছাড়া আমাদের দলের প্রধান একজন ক্যাবিনেট সদস্য। এ পরিস্থিতিতে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না। তাই বলে যে আমরা চুপচাপ বসে আছি বিষয়টা এমন নয়। সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের ছাত্র অধিকার পরিষদ কর্মসূচি পালন করেছে। পাশাপাশি আমরাও মনে করি সরকারের সংকটের দিকে নজর দেওয়া উচিত। সেভাবে পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।’

দলের মধ্যে বিভক্তি, দল ত্যাগ ও বিএনপির সঙ্গে জোটে যাওয়া সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বে ভাটা পড়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে চলে যাওয়ার সে যাবে, আবার যার ইচ্ছে এসে যোগ দেবে। এতে দলের কিছু যায় আসে না। দল দলের নিয়মে চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছি, তার মানে আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে- বিষয়টা এমন নয়। বিএনপির সঙ্গে সরকারের অংশ হওয়ায় আমাদের রাজপথে কর্মসূচি নেই। এছাড়া সবই ঠিক আছে। বর্তমানে সারা দেশে কমিটি গঠনের কাজ চলছে। পাশাপাশি আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

অবশ্য দলটির কেন্দ্রীয় আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নতুন দল হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি আত্মপ্রকাশের পর গণঅধিকার পরিষদের যে গতি ছিল, সেখানে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই ছন্দপতন ঘটেছে। এ ছাড়া জনগণ আমাদের প্রতিবাদী একটি রূপে দেখেছে। আওয়ামী লীগের সময় যখন কেউ কথা বলতে সাহস পেত না, তখন গণঅধিকার পরিষদ অন্যায়ের বিপক্ষে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছে। মানুষ এসব দেখে দল হিসেবে আমাদের পছন্দ করত। কিন্তু আমরা সরকারে গিয়ে বোবা হয়ে গেছি। সবই দেখছি, দেশের জনগণ হিসেবে আমি নিজেও ভুক্তভোগী, কিন্তু আমাদের কথা বলার সুযোগ নেই।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/এমএ/এসআই/একেকে
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!