গ্রুপ পর্বে তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে ওঠা পর্তুগালের সামনে স্পষ্ট ফেভারিট ছিল ফ্রান্স। দলে নেই তারকার অভাব। অন্যদিকে পর্তুগালের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র বলতে ছিলেন শুধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোই। তাই আরো একটি শিরোপা নিজেদের নামের পাশে লিখতেই যেন নামে ফরাসিরা। তবে পর্তুগাল কি ছেড়ে কথা বলার দল?
ম্যাচের ২৫তম মিনিটে সেই উৎসবের আমেজে নামল মিশ্র প্রতিক্রিয়ার অন্যরকম অনুভূতি। দলকে শিরোপা এনে দেওয়ার লড়াইয়ে মেগা ফাইনালে যে ইনজুরিতে মাঠে লুটিয়ে পড়েছেন রোনালদো! ১৮ তম মিনিটে চোটের কারণে কিছু সময়ের জন্য মাঠের বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। হাঁটুতে স্ট্রেপ পেঁচিয়ে আবারো দলের জন্য, দেশের জন্য খেলতে নামেন সিআর সেভেন। কিন্তু এবার আর টিকতে পারলেন না।
.png)
মাঠে তাকে কিছুক্ষণ শুশ্রূষা করার পর যখন স্ট্রেচারে করে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন সিআর সেভেন। এভাবে কে-ই বা বাইরে যেতে চায়? তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার ইউরো যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে সেখানেই। দেশের হয়ে মেজর টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতার স্বপ্ন কি তবে অপূর্ণই থেকে যাবে?
২০০৪ সালে এমনই এক ইউরোর ফাইনালে হার নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল পর্তুগাল। সেদিন রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর নিজের কান্না আটকে রাখতে পারেননি রোনালদো। স্ট্রেচারে শুয়ে কি রনের মনে সেই মুহূর্তটাই ভেসে উঠেছিল আরেকবার? এত কাছে এসেও আরেকবার না পাওয়ার আক্ষেপ, এটাই কি তবে নিয়তি?
না। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পুরো নাম ক্রিস্টিয়ানো দস সান্তোস অ্যাভেইরো। হারার আগে হার না মানা এক অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা তিনি। আর তাই যেন মাঠের বাইরে তথা ডাগ আউটে গিয়েও চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের পাশে থেকে দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন সতীর্থদের। যেন ক্ষণিকের জন্য সেদিন নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন সতীর্থদের গুরু!
১০৯ মিনিটে এল শুভক্ষণ। সাবস্টিটিউট হিসেবে নামা এদার যখন ফরাসি গোলরক্ষক হুগো লরিসকে পরাস্ত করেন, আবেগ আর চেপে রাখতে পারেননি রোনালদো। চোট নিয়ে মাঠের বাইরে থেকেও সতীর্থদের দিয়ে এভাবে কি ফুটবল ইতিহাসেই দলকে কাপ জেতাতে পেরেছেন কেউ?
রোনালদো এমন এক চরিত্র, যার জীবনে আছে এরকম অসংখ্য হার না মুহূর্ত। অন্যরা যেখানে একসময় পেরে না উঠে হাল ছেড়ে দেয়, সেখানে জাতীয় দল ও ক্লাব সবখানেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সব ম্যাচে গোল, অ্যাসিস্ট, হ্যাটট্রিক বা দারুণ সব মুহূর্ত উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে রোনালদোর চেয়ে সেরা এই পৃথিবীতে কয়জন আছে?
অথচ একসময় হয়তো পৃথিবীর আলোই দেখা হতো না ক্রিস্টিয়ানোর। অভাবের সংসারে জন্মের আগেই তাকে মেরে ফেলার কথা ভেবেছিলেন মা ডলোরেস দস সান্তোস অ্যাভেইরো। মিউনিসিপ্যালিটির মালি হিসেবে কাজ করে তার বাবা খুব একটা আয় করতেন না। আর পরিবারে এরই মধ্যে ছিল তিন সন্তান। তাই আরেকটা উটকো ঝামেলা নিতে চাননি ডলোরেস।
কিন্তু তখনও কি রোনালদোর মা জানতেন, তার পেটেই আছেন এক রত্ন! যার আলোয় উদ্ভাসিত হবে বিশ্ব, যার হাসিতে হাসবে পুরো পৃথিবী! সৃষ্টিকর্তা চেয়েছিলেন বলেই হয়তো শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মুখ দেখেন সিআর সেভেন। ১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, পর্তুগালের মাদেইরায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
রোনালদোর ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প কে না জানে! তবে তার এই সাফল্য হয়তো বা আরো পূর্ণতা পেতো, যদি তার বাবা বেঁচে থাকতেন। তবে মা-কে নিয়েই সব সাফল্য ও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন রন। এখন তার এই সাফল্য উদযাপনের সঙ্গী হিসেবে আছেন আরেকজন, বান্ধবী জর্জিনা রদ্রিগেজ। যিনি সময়ের সেরা তারকার আরেকটি অনুপ্রেরণা।
অবশ্য রোনালদো নিজেই তো অনুপ্রেরণার আরেক নাম। আপনার কি মনে আছে সেই মার্তুনিসের কথা? ছোট্ট সেই ছেলেটিকে ২০০৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার ভয়ংকর সুনামির সময় উদ্ধার করা হয়েছিলো রোনালদোর জার্সি পরিহিত অবস্থায়। পরে তাকে স্পোর্টিং লিসবন ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেন রোনালদো, বানিয়ে দেন পুরোদস্তুর একজন ফুটবলার। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার আইডির নাম মার্তুনিস রোনালদো।
রোনালদোর এরকম ঘটনার কথা কয়টাই বা লেখা যায়? তবে সিরিয়ান শরণার্থী শিশু জাইদ-এর কথা কি ভোলা যাবে? যার ইচ্ছে পূরণে রিয়াল মাদিদের হোম ভেন্যু তথা সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে ঢুকেছিলেন রন। আর সে মুহূর্তে শিশুটি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার মুখের দিকে।
লেবাননের তিন বছর বয়সী হায়দারের বাবা মাকে মেরে ফেলেছিল আইএস। আর সেই শিশুকে হাসপাতালে পাওয়া গেছিলো রোনালদোর জার্সি পরা অবস্থায়। খবর পেয়ে শিশুটিকে দেখতে ছুটে গিয়েছিলেন রোনালদো। আর তাকে দেখে তীব্র আবেগে কেঁদেই ফেলেছিল হায়দার। এরকম কত শিশু-কিশোরের জীবনের আইডল রোনালদো, তা হয়তো জানেন না তিনি নিজেও।
ফুটবলার পরিচয়ের বাইরে মানবসেবায় নিজেকে দারুণভাবে নিয়োজিত রেখেছেন রোনালদো। অনেক বড় বড় তারকা শখ করে গায়ে ট্যাটু আঁকলেও রন তা করেন না। কারণ নিয়মিত রক্ত দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। আর পৃথিবীর নানা প্রান্তে কত মানুষকে তিনি নানাভাবে সাহায্য করে যাচ্ছেন, তার হিসেব কি আদৌ দেওয়া সম্ভব?
রোনালদোকে ভালোবাসেন এমন মানুষের সংখ্যা তো মোটেও কম না। তার প্রতিটি গোল, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অর্জন নিজেদের মনে করে উদযাপন করেন বিশ্বের মিলিয়ন মিলিয়ন ভক্ত। আট থেকে আশি, রোনালদোর পায়ের জাদুতে কে মোহিত হয় না? তিনি খেলতে নামলে সবাই যেন প্রার্থনায় বসে যায়, জাদুকরের পা থেকে একটি গোলের আশায় তাকিয়ে থাকে চাতক পাখির মতো।
সাফল্যের পাশাপাশি কম সমালোচনার শিকার হন না রোনালদো। কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "Your love makes me strong, your hate makes me unstoppable!" যখন সমস্ত পৃথিবী তার বিরুদ্ধে চলে যায়, চারপাশ থেকে তীরের মতো ছুটে আসে সমালোচনা, তখন রনের নিশ্চয়ই প্রচন্ড মনে পড়ে বাবাকে। যিনি ছিলেন তার খেলার সবচেয়ে বড় ভক্ত।
শত দারিদ্র্যের মাঝেও ছেলেকে ফুটবল খেলার জন্য উৎসাহ জুগিয়ে গেছেন রোনালদোর বাবা হোসে অ্যাভেইরো। ছোটবেলায় রোনালদো গোল করার পর সেটা সবাইকে বলে বেড়াতেন তিনি। তার স্বপ্ন ছিল একদিন রোনালদোর খেলা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ টিভিতে দেখবে। এখন তার ছেলের খেলা ঠিকই কোটি কোটি মানুষ দেখে। শুধু দেখতে পারেন না তিনি। তবে নিশ্চয়ই হোসে ওপর থেকে সব দেখছেন! মাঝে মাঝে হয়তো ভাবেন, ছেলেটা সত্যিই আমার স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
রোনালদো এখন বিশ্বজুড়ে এক ভালোবাসার নাম, এক হার না মানা যোদ্ধার নাম, একটি অনুপ্রেরণা ও ভরসার নাম। রোনালদোর আক্রমণাত্মক মানসিকতার জন্য অনেকেই তাকে উদ্ধত বলেন। হয়তো এটাই সত্যি। তবে ট্রফির ক্ষুধা, সেরা হবার তাড়না কিংবা সাফল্যের লালসার পেছনে ছোটার জন্য সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে হয়। আর সেই সীমাকে অতিক্রম করে যাবার জন্য একটু উদ্ধত হওয়া হয়তো খুব একটা খারাপও না!
রোনালদোর কথা তো যতই বলা হোক কম হবে। পর্তুগীজ এই মহাতারকা বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাবজয়ী এই ফরোয়ার্ড উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ গোল দেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে এরই মধ্যে জিতেছেন ইউরো শিরোপা। ক্লাব ক্যারিয়ারে ৯২১ ম্যাচে ৬৮৮ গোল করার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে ১৮৪ ম্যাচে ১১৫ গোল করেছেন সময়ের সেরা এই ফরোয়ার্ড।
ব্যক্তিগত সাফল্য, দলীয় শিরোপা সবদিক দিয়েই দিয়ে রোনালদো সেরাদের সেরা হয়েছেন বহু আগেই। বয়স ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর কয়েক বছর পর হয়তো আর তাকে জাতীয় দল ও ক্লাবের জার্সি গায়ে আর দৌড়াতে দেখা যাবে না। তবে এতেই কি শেষ হয়ে যাবে তার কীর্তি? সহজ উত্তর হবে- না।
কারণ রোনালদো শুধু আজকের না। তিনি সবসময়ের, সবার জন্য।