মাত্র এক বছর আগেই ভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু বাস্তবতা হলো- বিতর্ক যেন সাকিবের পিছু ছাড়ে না।
দেশের ক্রিকেটের পোস্টারবয় সাকিবকে ঘিরে সবশেষ বিতর্ক একটি চুক্তি ঘিরে। সেই চুক্তির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে জুয়া। টাইগার অলরাউন্ডার তো বলেছিলেন, তিনি বিতর্কে না জড়ানোর ব্যাপারে আরো সতর্ক থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে হলো এর ঠিক উল্টো।
.png)
সাকিব কি তিন বছর আগের ঘটনা ভুলে গিয়েছেন? খেলোয়াড়ি জীবনের সবচেয়ে বড় ঐ দাগটা তার ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাকে সে বছরের অক্টোবরে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ২ বছরের জন্য (বিভিন্ন শর্ত রেখে এক বছর স্থগিত)।
সাকিবকে নিষিদ্ধ করার কারণ কী ছিল, তা প্রায় সবারই জানা। জুয়াড়ির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া, দেখা করতে চাওয়া বা কিছু বার্তা ডিলিট করা... সাকিবের এ ঘটনায় রহস্য আছে অনেক কিছু নিয়েই। তবে সেসব অতীত। শাস্তির সময় কাটিয়ে সদর্পেই ক্রিকেটে ফিরে আসেন তিনি।
এরপরও সাকিব বিতর্কে জড়িয়েছেন অনেকবার। কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো হয়তো না বুঝেই। কিন্তু এবার তিনি যে বিষয়ে বিতর্কে জড়ালেন সেটি আসলে কী নিয়ে? কার সঙ্গে?
‘বেটউইনার’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত। সাকিবের দাবি ছিল, তার চুক্তি হয়েছে মূলত বেটউইনার নিউজ নামে একটি ক্রীড়াভিত্তিক ওয়েবসাইটের সঙ্গে।
কিছু সূত্র জানায়, ঐ প্রতিষ্ঠান তাকে ১০ কোটি টাকাও দিয়েছে।
নামে ক্রীড়াভিত্তিক ওয়েবসাইট হলেও সেখানে খেলার খবরাখবর ছিল সামান্যই। এটি যে জুয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বেটউইনারের অঙ্গসংস্থা, সেটা সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ, জেনে-বুঝেই এ চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন সাকিব। পরোক্ষভাবে বলতে গেলে একটি জুয়া প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছিলেন তিনি!
সর্বশেষ খবর, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) চাপে বেটউইনারের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করেছেন সাকিব। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ ঘোষণা আসার আগে সাকিব-বিসিবির মাঝে কম নাটক হয়নি। দিনশেষে দেখা যাচ্ছে বিসিবিই জয়ী।
বাংলাদেশের আইনে বেটিং (জুয়া) নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে রয়েছে বিসিবির নিষেধাজ্ঞাও। তাই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার শুরু থেকেই সাকিবকে এ চুক্তি বাতিলের কথা বলে আসছিল বিসিবি। তবে সাকিব নিজের পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়ে যাচ্ছিলেন।
এ অবস্থায় সাকিবকে দেশের ক্রিকেট থেকেই বাদ দেওয়ার কথা বলে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।
বোর্ডের সিদ্ধান্তের পক্ষে তার বক্তব্য ছিল, আমাদের কাছে কোনো সন্দেহ নেই যে এটা সারোগেট ব্র্যান্ড, একই ওরা। একেক নামে একেকটা দিচ্ছে, কিন্তু মূলত একটি বেটিং কোম্পানি। যারা গ্যাম্বলিং, ক্যাসিনো, এগুলো নিয়ে জড়িত।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ক্লিয়ার কাট বলা আছে, কিসের কিসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারবে না। এ কোম্পানিটির তো সম্পর্ক আছে! আপনি বলতে পারেন, বেটউইনারনিউজ একটা নিউজ ওয়েবসাইট। কিন্তু বেটউইনারের তো বেটিং আছে, গ্যাম্বলিং আছে, সবই আছে। এটার তো অংশ।
এরপর পাপন সাকিবকে ক্রিকেট বা চুক্তি যেকোনো একটি বেছে নেয়ার কথা জানিয়ে বলেন, আমরা বলেছি এরকম সম্পর্কই থাকতে পারবে না। আমাদের ভাবনা পরিষ্কার। আলোচনার কিছু নেই। এখন সাকিবকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে দেশের ক্রিকেটে থাকবে; নাকি বেটিংয়ে।
এমন ঘোষণার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণ করেননি সাকিব আল হাসান। কিছু সময় পরই জানিয়ে দেন, দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলাই তার কাছে প্রাধান্য পাবে। এ কারণে বেটউইনারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছেন তিনি।
এর মাধ্যমে শেষ হয় বেটউইনার নিয়ে সাকিব-বিসিবির নাটক। এখানে পরোক্ষভাবে বেশি লাভবান হয়েছে বেটউইনার। কারণ সাকিব-বিসিবি দ্বন্দ্বে তারা যে পরিমাণ লাইমলাইট পেয়েছে, এখন চুক্তি না থাকলেও বহু সংখ্যক মানুষের কাছে তারা পৌঁছতে সমর্থ হয়েছে।
কয়েকদিন আগেও যাদের বেটউইনার সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, তারাও এখন জানেন এখানে কী হয়। ফলে খুব বেশি বিজ্ঞাপন ছাড়াই এখন তাদের কথা ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। এটা সাকিবের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কিনা, সেটা তিনি ও বেটউইনারই বলতে পারবে।
সূত্র জানায়, চুক্তি বাতিল করায় এখন এমনিতে সাকিবকে তেমন কিছু বলার থাকবে না বিসিবির। তবে দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলে এ অলরাউন্ডারকে শাস্তির আওতায় আনতে পারে শুধু চুক্তি করা নিয়ে।
কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার আগে বিসিবির কাছ থেকে ক্রিকেটারদের অনুমতি নিতে হয়। সাকিব সেটা করেননি। তবে ঘটনা যাই হোক, এখানে দিনশেষে লাভটা বেটউইনারই।