ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

মার্ক ওয়াহ: ক্রিকেটীয় ব্যাটিং সৌন্দর্যের প্রতীক

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৭:২২, ৯ জুন ২০২৩
মার্ক ওয়াহ: ক্রিকেটীয় ব্যাটিং সৌন্দর্যের প্রতীক
ছবি- ডেইলি বাংলাদেশ

‘ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা, এখানে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই’- এই বাক্যটির কারণেই হয়তো ক্রীড়াঙ্গনে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য ইদানিং আগ্রাসী মনোভাবের জন্য অনেকেই সমালোচিত হচ্ছেন। তবে নব্বইয়ের দশকে ব্যাট হাতে ক্রিকেটীয় সৌন্দর্যকে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি মার্ক ওয়াহ।

মজার ব্যাপার হলো, আশির দশকের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া দলে ওয়াহ ব্রাদারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। কেননা মার্ক ওয়াহ’র আরেক সহোদর ছিলেন। যার নাম স্টিভ ওয়াহ। তিনিও অজিদের নিয়মিত ক্রিকেটার ছিলেন। এ দু’জনে একসঙ্গে গড়েছেন বেশ কয়েকটি রেকর্ড। শুধু তাই নয়, দুই ভাইয়ের ক্রিকেটীয় জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব।

অবশ্য দীর্ঘ ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে বড় ভাই স্টিভের চেয়ে ওয়ানডে ও টেস্ট মিলিয়ে ১২১টি ম্যাচ কম খেলেছেন মার্ক। আর তাতেই স্টিভের চেয়ে শতক ও অর্ধ শতক দুটোই বেশি হাঁকিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে নামের পাশে ৩৮টি সেঞ্চুরি এবং ৯৭টি ফিফটি নিয়ে ক্রিকেটকে বিদায় বলেন এ ব্যাটার।

Advertisement

মার্ক ওয়াহ। ছবি- সংগৃহীতপুরো নাম মার্ক অ্যাডওয়ার্ড ওয়াহ। তবে ক্রিকেট বিশ্বে মার্ক ওয়াহ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ১৯৬৫ সালের ২ জুন অস্ট্রেলিয়ার ক্যান্টারবারির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মার্ক। এরপর সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি।

মার্কের গর্ভধারিণী মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা এবং বাবা ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। ক্রিকেটের সঙ্গে বাবা-মার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে তাদের স্বপ্ন ছিল সন্তানদের স্পোর্টসম্যান হিসেবে গড়ে তুলবেন।

এজন্য ছয় বছর বয়সেই স্টিভ ও মার্ক ওয়াহকে ক্রিকেট, ফুটবল ও টেনিস ক্লাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা দু’জন পছন্দের খেলা হিসেবে ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছিলেন। জীবনে প্রথম যেদিন ব্যাট হাতে নিয়েছিলেন, সেদিনই তারা দু’জন ফিরেছিলেন শূন্য রানে। তবুও থেমে থাকেনি ওয়াহ ব্রাদারের ক্রিকেট যাত্রা। 

১৯৮০ সালের শুরুতেই স্ট্রেস ইনজুরিতে পড়েন মার্ক ওয়াহ। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। এরপর চিকিৎসকের শরনাপন্ন হলে তিনি জানতে পারেন, ওই স্ট্রেস ইনজুরির কারণে থেমে যেতে পারে মার্কের দৈহিক বৃদ্ধি। 

তবে নিয়তি হয়তো লিখে রেখেছিল ভিন্ন কিছুই। ইনজুরিতে দীর্ঘ এক বছর মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে মার্ক ওয়াহকে। ভাগ্যবশত ওই সময়ের মধ্যে তার উচ্চতা প্রায় এক ফুট বেড়ে যায়। এরপর আবারো শুরু হয় মার্কের ক্রিকেট উৎসব।

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মার্ক ওয়াহ ও স্টিভ ওয়াহ। ছবি- সংগৃহীত

১৯৮৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার অনুর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পান মার্ক। যেখানে শ্রীলংকার বিপক্ষে এক ম্যাচে ১২৩ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলে টিম ম্যানেজমেন্টের নজরে আসেন তিনি। এর পরের বছরই ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। ঘরোয়া লিগে প্রত্যাশ্যা অনুযায়ী পারফর্ম করেও জাতীয় দলে সুযোগ হচ্ছিল না জুনিয়র ওয়াহর। এতে খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।

গায়ে জাতীয় দলের জার্সি তুলতে হাড় ভাঙা পরিশ্রম শুরু করেন ওয়াহ। এরপর ঘরোয়া লিগে ব্যাট-বল হাতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন তিনি। যার ফল হিসেবে ১৯৮৮ সালে অজিদের ডেরায় ডাক পান। তবে অভিষেক ম্যাচে ব্যাটিং কিংবা বোলিং কিছুই করার সুযোগ হয়নি তার।

ওয়ানডে দলে অভিষেক হওয়ার তিন বছর পর সাদা পোশাকের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলে সুযোগ পান মার্ক। সেবার প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। টেস্টে সুযোগ পেয়েই খোলস থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপর ইংলিশ বোলারদের তুলোধুনো করে দুর্দান্ত এক শতক তুলে নেন। অবশ্য ওই ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস উইকেটে থিতু হওয়ার আগেই সাজঘরে ফিরে যান এ ডানহাতি ব্যাটার।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মার্ক ওয়াহকে। ক্যারিয়ারের শুরুটা মিডল অর্ডার হিসেবে শুরু করলেও কয়েক বছরের মধ্যেই আলোচনা উঠে আসেন মার্ক। এক পর্যায়ে অজি টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে ওপেনিং করানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর যেনো অন্য এক মার্ক ওয়াহর দেখা পায় ক্রিকেট বিশ্ব। 

বড় ভাই স্টিভ ওয়াহ’র সঙ্গে মার্ক ওয়াহ। ছবি- সংগৃহীতএক দিনের আন্তর্জাতিক (ওডিআই) ক্যারিয়ারে ওপেনিংয়ে ব্যাট করে ৪৪ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ৫ হাজার ৭২৯ রান করেন মার্ক। আর সবমিলিয়ে ওয়ানডেতে ৩৯.৩৫ গড়ে ৮ হাজার ৫০০ রান করেন তিনি। এর মধ্যে ১৮টি সেঞ্চুরি ও ৫০টি অর্ধ শতক হাঁকিয়েছেন এ ব্যাটার।

অন্যদিকে টেস্ট ক্রিকেটেও মার্কের ঝুলিতে আছে ৮ হাজারের বেশি রান। ক্রিকেটের মর্যাদাপূর্ণ ফরম্যাটে ৪১.৮১ গড়ে ব্যাটিং করে তুলে নিয়েছেন ২০টি সেঞ্চুরি।

তবে শুধু ব্যাটিংয়েই নয়, বোলিংয়েও সিদ্ধহস্ত ছিলেন মার্ক। জাতীয় দলে কখনো মিডিয়াম পেসার হিসেবে আবার কখনো স্পিন বোলিং করেছেন তিনি। তবুও তার বোলিং পরিসংখ্যান বেশ সমৃদ্ধ। টেস্ট ও ওয়ানডে মিলে তার ঝুলিতে রয়েছে ১৪৪ টি উইকেট। ব্যাটিং ও বোলিংয়ের কীর্তিকে ছাপিয়ে ফিল্ডিংয়েও সেরাদের সেরা তকমা পেয়েছেন। স্লিপ পজিশনে ফিল্ডিং করে পুরো টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৮১ টি ক্যাচ তালুবন্দী করেছেন জুনিয়র ওয়াহ।

অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিং রুমে টেস্ট জার্সিতে দুই ওয়াহ। ছবি- সংগৃহীতমার্ক ওয়াহ ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত কাটিয়েছেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপে। ওই বিশ্বকাপে অজিদের হয়ে ওপেনার হিসেবে তিনটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন তিনি। যার সুবাদে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল অজি বাহিনী। তবে পাকিস্তান বিশ্বকাপের সেমি এবং ফাইনাল ম্যাচে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি এ ব্যাটার।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখতে হয়েছে মার্ক ওয়াহকে। ১৯৯৮ সালে শ্রীলংকা সফরের সময় তার এবং শেন ওয়ার্নের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ওঠে। ভারতীয় জুয়াড়ির কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় এ দুই কিংবদন্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনার দীর্ঘ ৪ বছর পর ইংল্যান্ড সফরে বাদ পড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে বিদায় বলে দেন মার্ক।

বাইশ গজকে বিদায় বললেও ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন মার্ক। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সেই দায়িত্ব ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর ধারাভাষ্যকার হিসেবে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন এ ক্রিকেটার।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআইএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!