ব্যাটারদের কাজ ও শান্তর কথার মাঝে মিল কোথায়?
‘আজ আমরা যতক্ষণ পেরেছি, ব্যাট করার চেষ্টা করেছি। আমাদের শক্তি অনুযায়ী খেলতে পেরেছি।’ চেন্নাই টেস্টের চতুর্থ দিনে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ২৮০ রানের শোচনীয় ব্যবধানে হারের পর এমন দাবিই করলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। তার এ কথা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
চতুর্থ দিন তো বটেই, টেস্টের তৃতীয় দিনেও তার কথার সঙ্গে সফরকারী দলের ব্যাটারদের কাণ্ডের মিল প্রকৃতপক্ষে পাওয়া যাবে না। তাদের আউটের ধরণেই সেটি পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয়।
ওপেনার জাকির হাসান দ্বিতীয় ইনিংসে ক্রিজে থিতু হয়ে খেলেন ৩৩ রানের ইনিংস। জাসপ্রিত বুমরাহর বলে যখন ড্রাইভ করার সময় তার শরীর থেকে ব্যাটের দূরত্ব ছিল। জয়সওয়াল বাঁদিকে ঝাপিয়ে দারুণ ক্যাচ নেন। অবিবেচকের মতো শট খেলে জাকির সম্ভাবনাময় ইনিংসের অপমৃত্যু ঘটান।
.png)
আরেক ওপেনার সাদমান ৩৫ রান করে ইনিংস লম্বার আশা জানিয়েছিলেন। রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে স্কয়ারের পেছনে ফ্লিক শটে শুভমান গিলের হাতে ক্যাচ উপহার দিয়ে আসেন।
টেস্টে একসময় ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে ওঠা মুমিনুল হক যেন নিজেকে অনেকদিন ধরেই হারিয়ে খুঁজছেন। অশ্বিনের অফ স্টাম্পের উপরে করা বল বাঁক নিয়েছিল। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলতে যাওয়া মুমিনুল অফ স্টাম্প সামলাতেই পারেননি, উল্টো বিস্ময়করভাবে হন বোল্ড।
তেড়েফুঁড়ে ব্যাটিং করতে গিয়ে মুশফিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার ধারের কাছে না গিয়ে নিজের ও দলের বিপদ ডেকে আনেন। পাকিস্তান সফরে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলেও চেন্নাই টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে ছিলেন দায়িত্বজ্ঞানহীন। দলের প্রয়োজনে যখন শান্ত মেজাজে ব্যাট করার দরকার ছিল, তখন অহেতুক উইকেট থেকে বেরিয়ে এসে খেলা মুশফিকের শটটি সোজা চলে যায় মিড অফে দাঁড়ানো লোকেশ রাহুলের হাতে।
শান্তর বলা কথায় আবার ফেরা যাক। তিনি আজ অর্থাৎ চেন্নাই টেস্টের চতুর্থ দিন যতটা সম্ভব ব্যাট করে যাওয়া ও শক্তি অনুযায়ী খেলতে পারার দাবি ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী পর্বে বললেন। বাস্তবে আসলে কী ঘটেছে, তা উল্লেখ করাটা অতি প্রাসঙ্গিক।
শনিবার বাংলাদেশ ৪ উইকেটে ১৫৮ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা আরম্ভ করার পর ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে লাঞ্চ বিরতির আগেই ২৩৪ রানেই গুটিয়ে যায়। এক পর্যায়ে স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ১৯৪ রান। সেখান থেকে শুরু হওয়া ব্যাটিং ধসে মাত্র ৪০ রান যোগ করতেই তারা শেষ ৬ উইকেট হারায়। প্রথম ইনিংসে স্কোরবোর্ডে ৪০ রান উঠতেই ছিল না ৫ উইকেট। ব্যাটারদের বাজেভাবে উইকেট বিলিয়ে আসা ছিল দৃষ্টিকটু।
ব্যাটিং অর্ডার এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার পর শক্তি অনুযায়ী খেলতে পারার দাবি কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর নয়। প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে এটাই যদি হয় সর্বোচ্চ সামর্থ্য, তাহলে টেস্টে উন্নতির গন্তব্যের পথটা এখনো অনেক দূরেই রয়েছে।
বোলিংয়ে অবশ্য ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া শান্ত অবশ্য তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদের প্রথম ২-৩ ঘণ্টার দারুণ বোলিংয়ের কথা উল্লেখ করেন। তবে ভারত তারপর সত্যিই দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছে বলেও স্বীকার করেন। পেস আক্রমণ নিয়ে টাইগার অধিনায়কের আত্মতুষ্টি থাকাটা স্বাভাবিক হলেও দলের ব্যাটারদের কাজটা ঠিকঠাক মতো করতে না পারলে ম্যাচের ফল যে ইতিবাচক আসবে না, দ্রুত সেই উপলব্ধি আসাটা জরুরি।
বাংলাদেশের অধিনায়ক ১২৭ বলে ৮ চার ও ৩ ছক্কায় ৮২ রানের ইনিংস খেলে জাদেজার বলে এক্সট্রা কভারে জাসপ্রিত বুমরাহর ক্যাচে পরিণত হন। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘ব্যাটার হিসেবে আমি সবসময় অবদান রাখার চেষ্টা করি। আমি আমার ব্যাটিং উপভোগ করি।’ এই কথায় অবশ্য বিরোধিতার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় পর তার ব্যাটে রান আসাটা ভালো লক্ষণ। দলের বাকিদেরও সেই পথ অনুসরণ আবশ্যক।
পাকিস্তান সফরের মতো চেন্নাইতে হাসেনি লিটন, মিরাজ, মুশফিক, সাদমানদের ব্যাট। সাকিব তো লম্বা ইনিংস খেলাতা ভুলতেই বসেছেন। ওপেনিং জুটিতে নেই ধারাবাহিকতা। প্রতিপক্ষের পেস বোলাররা রাউন্ড দ্য উইকেটে বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটারদেরদের বিপক্ষে বল করলে হয় তা স্টাম্পের ভেতরে ঢুকে যাওয়াটা যেন অবধারিত। এলবিডব্লিউর কিংবা বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরার দৃশ্যটা বছরের পর বছর নিয়মিতভাবে দেখতেই হচ্ছে।