কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়া দেখার আর কি কি থাকতে পারে। এমন চিন্তা চেতনা করতে করতে রংপুর থেকে আসা পর্যটক অরুনের হোটেলের দরজা কড়া নেড়ে একজন পর্যটন গাইড সামনে হাজির।তখন ভোর ৬টা। নবীন কুমারের ডাকাডাকিতে ঘুম থেকে উঠতেই হল। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম সমুদ্র সৈকতের বালুকা বেলায়। সেখানে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাসে।
এদিকে সেই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেছি পেটে কিছু পড়েনি; তাই পেটে চলছে রাম রাবণের হুঙ্কার। কালবিলম্ব না করে আমি আর নবীন বেড়িয়ে পড়লাম পেট শান্ত করতে। হোটেলে এসে বসতেই ওয়েটার হাসি মুখে হাজির খাবার তৈরি টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখা পেলাম হরেক রকমের আম, আপেল, কমলা, আঙুর, পেঁপে, তরমুজ, বেদানা, আনারস। অন্য টেবিলে পেঁপে, তরমুজ, আমের জুস, সঙ্গে পাউরুটি, নান, পরোটা, সবজি, ডাল, ডিম অমলেট, চিকেন ঝাল ফ্রাই, কাবাব, পুডিং, মিষ্ট আরও কত কী। দেখে মনে হল সবকিছুই খেতে পারব। সবাই দেখলাম লাইন ধরে পছন্দের খাবার নিচ্ছেন। আমরাও লাইন ধরে পছন্দের খাবার নিলাম। ডিম অমলেট, নান রুটি, ঝাল ফ্রাই, আর পুডিং।
.png)
খাবারের টেবিলে বসতেই গাইড কায়ছারের প্রশ্ন আজ কোথায় যাবেন স্যার। আমি ইশারা দিতেই একজন এসে উপস্থিত। বললাম ভাই আপনাদের শহরে নতুন কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় বলুন তো? উত্তরে হাসি মুখে বললেন হিমছড়ি। বললাম গতকালই ঘুরে এসেছি, পরে বলল ও ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে তাও ঘোরা শেষ।
একটু চিন্তা করে বললেন তাহলে আপনি রামু উপজেলার অবস্থিত ভুবন শান্তি ১০০ ফুট দীর্ঘ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি দেখে আসেন ভালো লাগবে। আমি বললাম ভালোই বলেছেন, পেপারে পড়েছি এই সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি খবর। নাশতা শেষে আমরা গাইড কে সাথে নিয়ে একটি অটোতে উঠে গন্তব্যের পানে যাত্রা শুরু করলাম। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম রামুর উত্তর মিঠাছড়ির বড়ুয়া পাড়ায় ‘ভুবন শান্তি ১০০ ফুট দীর্ঘ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি’। ওই দিকেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি ব্রিজ ভাঙা, তাই আর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে আমরা পদব্রজে এগিয়ে গেলাম। চার-পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ আমরা প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম।
জুতা রেখে নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে গৌতম বুদ্ধের পার দেখা পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। শতাধিক সিঁড়ি পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভুবন শান্তি ১০০ ফুট দীর্ঘ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তির কাছে। গৌতম বুদ্ধমূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।
গৌতম বুদ্ধ যেনও খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন তিনি। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন বরাভয় তার দৃষ্টিতে। কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। কথা হল ওই মন্দিরের এক ভিক্ষুর সঙ্গে; তিনি বললেন, ২০০৬ সালে সোনালি রঙের মূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রীমৎ করুণা শ্রীভিক্ষু। ২০০২ সালে শুরু করে ২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। মিয়ানমার থেকে আসা দক্ষ একজন শিল্পীর সঙ্গে নিজেই স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি।
করুণা শ্রীভিক্ষু প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মূর্তিটি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তার। ছবি তুলে গেলাম পাশের গৌতম বুদ্ধের মন্দিরে। সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দর্শন করে কিছু সময় থেকে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে।
আমরা বের হয়ে যাব সেই সময় এক ভিক্ষু আমাদের পেছন থেকে ডাকতে লাগল, বলল প্রসাদ খেয়ে যান আপনারা। প্রসাদ খেয়ে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। এর পাশেই দেখা পেলাম সবুজের সমাহার। বলা যায়, বন-পাহাড়-সমতলের মিলনমেলা যেন।
প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত মূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরা নিয়মিত আসেন এখানে।
যাবেন কীভাবে: এই ‘ভুবন শান্তি ১০০ ফুট দীর্ঘ বিশাল সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি’ দেখতে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। বাস ভাড়া ঢাকা থেকে ৮০০-২২০০ টাকা। তাই দেশের যে প্রান্তেই থাকুন প্রথমেই চলে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং মিনিবাসযোগে রামু থানার উত্তর মিঠাছড়িতে এলেই পাওয়া যাবে বৌদ্ধবিহারটি। রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা-বাগান) এ বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। কক্সবাজার শহর থেকে ট্যাক্সি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা টমটম নিয়ে যেতে পারেন বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।