ঢাকা,  রোববার   ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ভ্রমণ ]

পর্যটন, বাণিজ্য ও বিমান যোগাযোগে নেপাল-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব

আনন্দ প্রসাদ পোখারেল
প্রকাশিত: ১৪:০২, ৪ অক্টোবর ২০২৬
পর্যটন, বাণিজ্য ও বিমান যোগাযোগে নেপাল-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব
আনন্দ প্রসাদ পোখারেল, সাবেক সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী, নেপাল

নেপাল ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ক‚টনৈতিক সম্পর্ক নয়; এর ভিত্তি ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক নৈকট্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জনগণের গভীর আন্তরিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভৌগোলিকভাবে দুদেশের মধ্যে ভারতের একটি সংকীর্ণ ভূখন্ড থাকলেও মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং সামাজিক মূল্যবোধে অনেক মিল রয়েছে।

১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ক‚টনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে দুদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে।  বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই বন্ধুত্বকে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।

পর্যটন, বাণিজ্য, বিমান যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ- এই খাতগুলোতে পরিকল্পিত সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে নেপাল ও বাংলাদেশ উভয় দেশই উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে।

Advertisement
  • নেপাল হিমালয়, এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লুম্বিনী, পশুপতিনাথ, কাঠমান্ডু উপত্যকা, পোখারা, চিতওয়ান ও নাগরকোটের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। পর্বতারোহণ, ট্রেকিং, অ্যাডভেঞ্চার, ধর্মীয় ভ্রমণ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনে নেপালের একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অবস্থান রয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সমুদ্র, নদী, বন, হাওর, পাহাড়, প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্য ও জীবনধারার দেশ। কক্সবাজার, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেটের চা-বাগান ও হাওর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, নওগাঁর পাহাড়পুর, বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অমূল্য সম্পদ।

নেপালের পাহাড় ও বাংলাদেশের সমুদ্র, নদী ও ম্যানগ্রোভ বনকে একটি যৌথ পর্যটন ধারণার মধ্যে আনতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

দুই দেশের পর্যটনশিল্প একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক নেপালে এসে হিমালয় ও ঐতিহাসিক কাঠমান্ডু উপত্যকা পরিদর্শনের পর বাংলাদেশের কক্সবাজার, সুন্দরবন ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ভ্রমণ করতে পারেন।

একইভাবে বাংলাদেশে আসা একজন পর্যটক স্বল্প সময়ে নেপালের পোখারা, লুম্বিনী কিংবা এভারেস্ট অঞ্চলের অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। এ জন্য “হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর” নামে নেপাল-বাংলাদেশ যৌথ পর্যটন প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে। এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কাঠমান্ডু-পোখারা-লুম্বিনীর সঙ্গে ঢাকা-কক্সবাজার-সুন্দরবন অথবা ঢাকা-সিলেট-পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ।

দু'দেশের ট্যুর অপারেটর, হোটেল, বিমান সংস্থা ও পর্যটন বোর্ড যৌথভাবে এ ধরনের প্যাকেজ পরিচালনা করলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার পর্যটকদের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটন দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণের আরেকটি বড় ক্ষেত্র। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান।

  • বাংলাদেশের পাহাড়পুর, ময়নামতি এবং বিভিন্ন প্রাচীন বৌদ্ধবিহারকে লুম্বিনীর সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ পর্যটন সার্কিট তৈরি করা যেতে পারে।

নেপালের পশুপতিনাথ, জনকপুর ও মুক্তিনাথের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মন্দির ও ধর্মীয় স্থানগুলোর যোগাযোগ স্থাপন করেও হিন্দু ধর্মীয় পর্যটনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

একইভাবে বাংলাদেশের মসজিদ, মাজার, বৌদ্ধবিহার, মন্দির ও গির্জার সহাবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সামনে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে।

চলচ্চিত্র, সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, খাবার ও লোকজ উৎসবের মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও গভীর করা সম্ভব।

যৌথ পর্যটন বিকাশে সভা, সেমিনার ও পর্যটন মেলার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঠমান্ডু ও ঢাকায় পালাক্রমে নেপাল-বাংলাদেশ পর্যটন সম্মেলন এবং যৌথ ট্রাভেল মার্ট আয়োজন করা যেতে পারে।

সেখানে দুদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিমান সংস্থা, ট্যুর অপারেটর, হোটেল-রিসোর্ট, বিনিয়োগকারী, পর্যটন সাংবাদিক ও গবেষকেরা অংশ নেবেন। একই সঙ্গে পোখারা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের মতো শহরে গন্তব্যভিত্তিক ব্যবসায়িক সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সভা-সেমিনার যেন শুধু বক্তব্য, স্মারক বিনিময় ও ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

প্রতিটি আয়োজন থেকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। দুই দেশের গণমাধ্যমে পর্যটনবিষয়ক বিশেষ প্রকাশনা, তথ্যচিত্র ও ভ্রমণ প্রতিবেদন প্রচার করা গেলে সাধারণ মানুষের আগ্রহও বাড়বে।

পর্যটনের বিকাশ অনেকাংশে সহজ ও সাশ্রয়ী বিমান যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকা ও কাঠমান্ডুর মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ থাকলেও যাত্রীদের চাহিদা, ভ্রমণ মৌসুম এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজন বিবেচনায় ফ্লাইটের সংখ্যা, আসনক্ষমতা ও সময়সূচি আরও সুবিধাজনক করা দরকার।

  • বিমানভাড়া যেন সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের নাগালের মধ্যে থাকে, সে জন্য দুদেশের জাতীয় ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করা উচিত।

ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে কাঠমান্ডু এবং বাংলাদেশের সঙ্গে পোখারা ও ভৈরহাওয়ার সম্ভাব্য বিমান যোগাযোগের বাণিজ্যিক কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যেতে পারে। যাত্রীসংখ্যা ও বাজার সম্ভাবনা অনুকূল হলে মৌসুমি কিংবা নিয়মিত নতুন রুট চালু করা সম্ভব।

বিমান যোগাযোগকে শুধু যাত্রী পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের কার্গো ধারণক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশলসামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও ইলেকট্রনিক পণ্য নেপালে পাঠানো যেতে পারে। নেপাল থেকে বাংলাদেশে ফলমূল, ভেষজ পণ্য, চা, কফি, হস্তশিল্প ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য দ্রুত আনার সুযোগ রয়েছে।

বিমানবন্দরে দ্রুত কার্গো খালাস, পচনশীল পণ্যের জন্য হিমাগার, ডিজিটাল শুল্কব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য একক সেবা চালু করা গেলে আকাশপথে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে।

  • দু'দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে নিয়ে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা দরকার।

পর্যটকদের জন্য বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিদেশি পর্যটক কোনো দেশে প্রবেশের পর প্রথম অভিজ্ঞতা লাভ করেন বিমানবন্দরে এবং বিদায়ের সময় শেষ অভিজ্ঞতাটিও সেখানেই তৈরি হয়।

ইমিগ্রেশন, লাগেজ সরবরাহ, মুদ্রা বিনিময়, সিম কার্ড, পরিবহন, হোটেল বুকিং ও পর্যটন তথ্য সব সেবা একটি সমন্বিত ডেস্কের মাধ্যমে দেওয়া গেলে ভ্রমণ অনেক সহজ হবে।

ঢাকা ও কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে নেপালি ও বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য পারস্পরিক পর্যটন সহায়তাকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। অনলাইন ভিসা, সহজ প্রবেশ প্রক্রিয়া এবং পর্যটকবান্ধব ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুসারে, পর্যটনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছুক একজন নেপালি নাগরিক বছরে একবার বিনা ফিতে ৩০ দিনের একক প্রবেশ ভিসা পেতে পারেন এ ধরনের সুবিধার প্রচার বাড়ানো দরকার।

পর্যটন ও বিমান যোগাযোগের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নেপাল-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সম্ভাবনা বর্তমান পরিমাণের তুলনায় অনেক বড়।

বাংলাদেশ একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজার ও শক্তিশালী উৎপাদন অর্থনীতি। অন্যদিকে নেপাল প্রাকৃতিক সম্পদ, জলবিদ্যুৎ, কৃষিপণ্য, ভেষজ উদ্ভিদ এবং পর্যটনে সমৃদ্ধ।

বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ‘ট্রেড অ্যান্ড পেমেন্ট এগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে;  কিন্তু শুল্ক, অশুল্ক বাধা, পণ্যের মান সনদ, সীমান্ত অবকাঠামো, ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিবহন ব্যয়ের জটিলতার কারণে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা, নির্বাচিত পণ্যে শুল্কসুবিধা দেওয়া এবং কাস্টমস প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও সমন্বিত করা গেলে বাণিজ্য দ্রæত বাড়তে পারে।

  • বাংলাদেশের ওষুধ, তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক, আসবাব, কৃষিযন্ত্র, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার নেপালের বাজারে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে নেপালের ভেষজ পণ্য, কৃষিজাত সামগ্রী, ফলমূল, চা, কফি, হস্তশিল্প এবং জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে। দুদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

নিয়মিত পণ্য প্রদর্শনী, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সফর, যৌথ চেম্বার, ডিজিটাল বাণিজ্য তথ্যভান্ডার এবং ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠকের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং তরুণ স্টার্টআপদের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

স্থল যোগাযোগ বাণিজ্য ও পর্যটন সম্প্রসারণের কেন্দ্রীয় শর্ত। বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা এবং নেপালের কাকরভিট্টাকে সংযুক্তকারী পথ দুদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থল করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বর্তমানে ভারতীয় ভূখন্ড অতিক্রম করে এই যোগাযোগ পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। দ্রুত যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী যান চলাচল, সীমান্তে সমন্বিত তল্লাশি, ইলেকট্রনিক কার্গো ট্র্যাকিং এবং একক কাস্টমস নথি চালু করা গেলে সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

ভবিষ্যতে ঢাকা–কাঠমান্ডু সরাসরি বাস এবং রেল সংযোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও গুরুত্বসহ বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল বা বিবিআইএন কাঠামো এবং দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি কার্যকর বহুমুখী পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

  • স্থলবেষ্টিত দেশ নেপালের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব বন্দর ব্যবহারের কার্যকর সুযোগ নেপালকে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে বিকল্প পথ দিতে পারে।

বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত ট্রানজিট চুক্তির প্রটোকল তৃতীয় দেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্যের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে চুক্তির সুবিধা বাস্তবে কাজে লাগাতে বন্দর, রেল, সড়ক, স্থলবন্দর, কাস্টমস ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। নিয়মিত কার্গো চলাচল নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন খাত আয় করবে এবং নেপাল কম ব্যয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

জ্বালানি সহযোগিতা নেপাল-বাংলাদেশ অংশীদারত্বের সবচেয়ে রূপান্তরমূলক ক্ষেত্রগুলোর একটি। নেপালের বিপুল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য ভারতকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।  ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, যৌথ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, আন্তঃদেশীয় সঞ্চালন লাইন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণার মাধ্যমে এ সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বহু নেপালি শিক্ষার্থী বাংলাদেশের মেডিকেল, প্রকৌশল ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। একইভাবে নেপালের পর্যটন, আতিথেয়তা, পর্বতারোহণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় বিনিময়, যৌথ গবেষণা, বৃত্তি, শিক্ষার্থী সফর এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়ানো উচিত। পর্যটন গাইড, হোটেলকর্মী, বিমানবন্দরকর্মী, পর্বতারোহণ প্রশিক্ষক, উদ্ধারকারী দল ও পর্যটন পুলিশের জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে দুদেশের সেবার মান উন্নত হবে।

নেপাল ও বাংলাদেশ উভয় দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাবের মুখোমুখি। হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া, হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি, পাহাড়ি বন্যা, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপক‚লীয় দুর্যোগ সবই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নদী ও বদ্বীপ অঞ্চলেও পৌঁছায়। ফলে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ-পূর্ব সতর্কতা, পানি ব্যবস্থাপনা, পাহাড় ও বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে দুই দেশের যৌথ গবেষণা ও নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের সময় প্রকৃতির ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

  • দু'দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সরকার একা সব কাজ করতে পারবে না। বেসরকারি খাত, চেম্বার অব কমার্স, বিমান সংস্থা, পর্যটন বোর্ড, ট্যুর অপারেটর, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

নেপাল ও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন, জাতিসংঘ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় মঞ্চে সহযোগিতা করছে। দুই দেশের সরকারও বাণিজ্য, পর্যটন, জ্বালানি ও সংযোগকে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।  এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে সময়বদ্ধ ও বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পে রূপ দেওয়া।

নেপাল-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। হিমালয় এবং বঙ্গোপসাগরকে একই অর্থনৈতিক ও পর্যটন ধারায় যুক্ত করা গেলে দুই দেশের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া লাভবান হবে।

সহজ ভিসা, সাশ্রয়ী ও নিয়মিত বিমান যোগাযোগ, কার্যকর স্থল করিডোর, বন্দরসুবিধা, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য, যৌথ পর্যটন প্যাকেজ, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ এই বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু চুক্তি স্বাক্ষর বা আনুষ্ঠানিক সফর হওয়া উচিত নয়; বরং এমন একটি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, যার সুফল সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ সরাসরি অনুভব করবেন।

নেপাল ও বাংলাদেশ একে অপরকে অনেক কিছু দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। নেপালের পাহাড়, জলবিদ্যুৎ, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন এবং বাংলাদেশের সমুদ্র, নদী, বন্দর, উৎপাদনশিল্প ও বৃহৎ বাজার এই দুই শক্তির সমন্বয় পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

পারস্পরিক আস্থা, কার্যকর যোগাযোগ, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন, বাণিজ্য ও বিমান যোগাযোগে নেপাল-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব দক্ষিণ এশিয়ার সফল আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হবে।

লেখক : আনন্দ প্রসাদ পোখারেল
সাবেক সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী, নেপাল
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!