ঢাকা,  বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ নারী নক্ষত্র ]

কংক্রিটের বুকে সবুজ প্রাণ

কঠিনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর উষ্ণায়ন
ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০৩, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
কংক্রিটের বুকে সবুজ প্রাণ
এটা বাংলাদেশের জন্য গর্বের, আগামী প্রজন্মের মেয়েদের জন্য এক নীরব, দৃঢ় বার্তা - চাইলে কঠিন কংক্রিটকেও নরম করা যায়, চাইলে বর্জ্য থেকেও ভবিষ্যৎ গড়া যায়

কংক্রিট - যাকে আমরা শুধু ইট, বালি, সিমেন্টের জমাটবদ্ধ কঠিন রূপ ভাবি। অথচ সেই কঠিন জিনিসটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর উষ্ণায়নের এক বড় কারণ।

আর সেই কঠিনকেই নরম, টেকসই আর পরিবেশবান্ধব করে তুলতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের এক মেয়ে - ড. শোহানা ইফফাত। বুয়েটের ক্লাসরুম থেকে শুরু হওয়া তার যাত্রা আজ পৌঁছে গেছে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে, বিশ্বমঞ্চে।

বুয়েটের আঙিনা থেকেই শুরু

  • ড. শোহানা ইফফাতের গল্পটা আমাদেরই গল্প। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.এসসি. সম্পন্ন করেন ২০১১ সালে, এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম.এসসি. করেন ২০১৪ সালে, যেখানে তার গবেষণার বিষয় ছিল ইন্টারনাল কিউরিং অফ কংক্রিট।

শিক্ষক হিসেবেও তার শুরুটা এখানেই। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। তারপর উচ্চতর গবেষণার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন সিমেন্ট কম্পোজিটে ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে।

আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিংডেল স্টেট কলেজ (SUNY) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

কংক্রিটের বুকে সবুজ প্রাণ
ড. ইফফাতের গবেষণার মূল মন্ত্র একটাই - নির্মাণকে আরও টেকসই করা। তার অফিসিয়াল প্রোফাইল অনুযায়ী, তার গবেষণা টেকসই এবং উচ্চ-কার্যক্ষমতাসম্পন্ন নির্মাণ সামগ্রী, বিশেষ করে কংক্রিট ন্যানোটেকনোলজি, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ এবং হালকা কংক্রিট নিয়ে।

ভাবুন তো, যে প্লাস্টিক, স্টাইরোফোম আমরা ফেলে দিই, যা পরিবেশ দূষণ করে, সেই বর্জ্যই যদি হয়ে ওঠে ভবনের উপাদান! এটাই তিনি করে দেখাচ্ছেন।

তার সর্বশেষ গবেষণাগুলো চমকে দেওয়ার মতো। ২০২৬ সালে Discover Civil Engineering জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাত পুনর্ব্যবহৃত কংক্রিট অ্যাগ্রিগেট, বর্জ্য প্লাস্টিক এবং স্টাইরোফোম দিয়ে কংক্রিট তৈরি করা যায়। এটি শুধু বর্জ্য কমায় না, কংক্রিটকে হালকা করে এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমায়।

এর আগে ২০২৫ সালে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন - একটি গ্রাফিন অক্সাইড ন্যানোরিবন দিয়ে উচ্চ-আর্লি-স্ট্রেংথ সিমেন্ট কংক্রিট নিয়ে এবং অন্যটি পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক মিশ্রিত সিমেন্ট কংক্রিটের ভৌত-যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

চলতি বছর ১১ জুন ২০২৬, SUNY Sustainability Conference-এ তিনি তার গবেষণা উপস্থাপন করেন - “Recycled Waste-Modified Cement Concrete: A Case Study for Sustainable Construction” শিরোনামে।

শুধু গবেষণা নয়, তিনি একজন শিক্ষক, একজন মেন্টর। তিনি আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (ACI) এর সহযোগী সদস্য এবং আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স (ASCE) এর সদস্য।

বুয়েটের যে মেয়েটি একদিন ক্লাসে বসে স্বপ্ন দেখত, আজ তার ক্লাসে বসে স্বপ্ন দেখছে আমেরিকার শিক্ষার্থীরা। এটা শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, এটা বাংলাদেশের জন্য গর্বের, আগামী প্রজন্মের মেয়েদের জন্য এক নীরব, দৃঢ় বার্তা - চাইলে কঠিন কংক্রিটকেও নরম করা যায়, চাইলে বর্জ্য থেকেও ভবিষ্যৎ গড়া যায়।

বুয়েট থেকে বিশ্বমঞ্চ - ড. শোহানা ইফফাত সেই সেতুটাই তৈরি করে চলেছেন, একটু একটু করে, পরিবেশবান্ধব কংক্রিটের মতোই টেকসইভাবে।

মূল তথ্যসূত্র: Farmingdale State College (SUNY) এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, Springer Nature এবং সংশ্লিষ্ট জার্নাল। শুধুমাত্র একজন বাংলাদেশি শিক্ষাবিদের গবেষণা ও অবদানকে তুলে ধরার জন্য।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!