ঢাকা,  বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

[ কৃষি ও প্রকৃতি ]

পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে মানুষ ও প্রকৃতির নৈকট্য

সোহরাব হাসান
প্রকাশিত: ১০:৫০, ২১ অক্টোবর ২০২৬
পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে মানুষ ও প্রকৃতির নৈকট্য
বাংলাদেশকে বলা হয় ১৩ শত নদীর দেশ। আসলে কত নদী আছে তার ঠিক হিসেব নেই। অনেক নদী মরে গেছে, অনেক নদী মাঝপথে গতি হারিয়েছে

মানুষ যখনই প্রকৃতিকে আপন করে নেয়, তখনই সে হয়ে ওঠে প্রকৃতির মানুষ, ভূমি ও বৃক্ষের অত্যন্ত কাছের মানুষ। আর মানুষ যখনই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যায়, সে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে, সেই সঙ্গে পৃথিবীরও। 

মানুষ ও প্রকৃতি পরস্পরের পরিপূরক, প্রকৃতি ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না; তেমনি মানুষ ছাড়াও প্রকৃতিরও মূল্য নেই। প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে নিজেকেই ভালোবাসা। এই যে পাহাড়, বন, শস্যখেত, নদী ও সমুদ্র নিয়ত মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। 

  • আমরা যখন সমুদ্রে যাই প্রকৃতিকে পাই, আমরা যখন পাহাড়ে যাই প্রকৃতিকে পাই। এই যে পাহাড়ের অবিরাম ঝরনা ধারা, এই যে সমুদ্রের অশান্ত তরঙ্গমালা মানব মনে অনির্বচনীয় অনুভ‚তি এনে দেয়, এই যে বনের সবুজ বৃক্ষরাজি, পাখপাখালি কী অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

আমরা এখন যে শহরে বাস করি, সেখানে প্রকৃতি নেই, সবুজ মাঠ নেই, স্রোতস্বিনী নদী নেই, কঠিন কংক্রিটের পাথরে তৈরি এই শহর যেন আমাদের জীবনকেও পাথর করে দিয়েছে। 

এখানে বক, গাঙচিল, শালিকের আনাগোনা নেই। এখানে থই থই জলে ডুবসাঁতার নেই, এখানে প্রস্ফুটিত শাপলার সঙ্গে কিশোরীর লুকোচুরি খেলা নেই। এক কোলাহলময় অথচ নির্জীব শহরে আমরা বাস করছি অথবা আমরা করতে বাধ্য হচ্ছি।

পৃথিবীর খুব কম শহরই আছে, যার তিন দিকে নদী আছে। সেই হিসেবে ঢাকা হতে পারত প্রকৃতি ও আধুনিক স্থাপত্যের আশ্চর্য সমন্বয়। কিন্তু আমরা নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারিনি, প্রতিদিনের আগ্রাসনে ও আক্রমণে আমরা নদীগুলোকে হত্যা করে চলেছি।

এই নদীর হেফাজত করার দায়িত্ব যাদের দেয়া হয়েছে, তারা অনেক আগেই আমানতের খেয়ানত করেছেন। ঢাকা যেমন দুনিয়ার দ্বিতীয় নোংরা শহর তেমনি বুড়িগঙ্গা অসম্ভব দুর্গন্ধময় একটি নদী। অথচ এই নদীর সঙ্গে মেঘনার সরাসরি যোগাযোগ, এই নদী দিয়েই একসময় নৌপথে সারা দেশে পণ্য পরিবহন হতো।

  • বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এখানে নদী কেবল পরিবহনের মাধ্যম বা মৎস্যসম্পদের আধার নয়, নদী হল আমাদের জীবনের অংশ। দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপক‚লবর্তী যে ভ‚খন্ডে আমার জন্ম, সেখানে নদী মানুষের নিত্যসঙ্গী, জীবন ও জীবিকার অবলম্বন। 

আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর, আমাদের তরুণ বয়স কেটেছে এই নদীর পাড়ে, নদীর ভাঙা গড়ার সঙ্গে জোয়ার ভাটার সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠেছি, জীবনকে উপলব্ধি করতে শিখেছি।

যে নদীর পাড়ে আমাদের বসতবাটি গড়ে উঠেছে; তার নাম বিষখালী। কেন বিষখালী নাম হয়েছে জানি না। হয়তো কোনো রাজকন্যার জন্য বিষ খেয়ে কোনো রাজকুমার এই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। 

আমরা দেখেছি নদীর এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড়ে চর ওঠে; ধীরে ধীরে সেই চর জনপদে পরিণত হয়; সেই চরে মালিকানা নিয়ে মারামারি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝির হোসেন মিয়া মেঘনার মোহনায় ময়নার চরে আবাস গড়েছিলেন কুবেরকে নিয়ে। এরকম হাজার হাজার কুবের আছেন, ডাঙা নয়, নদীতেই যারা ঘর বাঁধেন।

আমাদের শৈশবে দেখেছি বর্ষাকালে নদীর জোয়ারে দুই পাড় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত। মাঝে মধ্যে গাছের সারি ও বাড়িঘর দেখা যেত। যাদের ঘরবাড়ি খানিকটা নিচু, তাদের কয়েক দিন জলবাস করতে হতো। টানা কয়েকদিন বর্ষা হলে নৌকাই ছিল চলাচলের একমাত্র অবলম্বন। কেউ কেউ নৌকাজীবন বেছে নিতেন জীবিকার জন্য। 

সেই নদী এখন নেই। এখনো নদীতে নৌকা-লঞ্চ চলে, দূরবর্তী বন্দর থেকে পণ্যবাহী জাহাজ আসে। কিন্তু রাত জেগে জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যায় না। 

সুন্দরবনকে আমরা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশীদার মনে করি, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বলে দাবি করি। অথচ সেই সুন্দরবনকে রক্ষায় আমরা কিছুই করছি না; পৃথিবী বিখ্যাত যে বেঙ্গল টাইগার, তাদেরও আমরা মেরে ফেলছি। 

মেরে ফেলেছি এখানে উদ্ভাবিত নানা বৃক্ষ ও উদ্ভিদ। সুন্দরবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বনবিদ খসরু চৌধুরী লিখেছেন : ‘আদিডাঙ্গার মোহনা থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত এলাকায় গঙ্গা, পদ্মা-মেঘনার অনেক দক্ষিণ শাখা নদী ও সাগরে বিলীন হয়। ফলে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এলাকা পর্যন্ত গড়ে ওঠে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মোহনা অঞ্চল।’ 

  • সুন্দরবন গড়ে উঠেছে গাঙ্গেয় মোহনার কয়েকশ’ দীপাঞ্চলের বনভ‚মি নিয়ে। বসতির বিস্তৃতি এবং গড়ে ওঠা খেতখামারের কারণে সুন্দরবনের আয়তন এখন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার হবে। এর মধ্যে নদীনালা ও খালবিল ৩ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। 

বাংলাদেশের ভাগে পড়েছে সুন্দরবনের ৬ হাজার ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে জলের ভাগ ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার। স্বাভাবিক নদী কালিহাতী ও বিভাজন করে আছে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন। সুন্দরবনের গাছপালার মধ্যে রয়েছে গর্জন, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, পশুর গোলপাতা আর পশুপাখির মধ্যে রয়েছে: বাঘ, হরিণ, বনমোরগ, শিয়াল ইত্যাদি। সুন্দরবন না থাকলে যে এসব কিছুই থাকবে না, প্রকৃতিবিধ্বংসী মানুষ তা বোঝে না।

বাংলাদেশকে বলা হয় ১৩ শত নদীর দেশ। আসলে কত নদী আছে তার ঠিক হিসেব নেই। অনেক নদী মরে গেছে, অনেক নদী মাঝপথে গতি হারিয়েছে। অনেক নদী আমরা হত্যা করেছি। তাই বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে, প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে আমাদের নদী ও বন হত্যা বন্ধ করতে হবে।

উত্তর ও পূর্বদিকে বাংলাদেশের সীমান্তটির দিকে তাকিয়ে দেখুন, যেখানে পাহাড় শেষ, সেখানেই বাংলাদেশের শুরু। আমরা সমতল ভ‚মি পেয়েছি, নদী পেয়েছি, সুন্দরবন পেয়েছি। এটিই বা কম কীসে? প্রকৃতি তো কেবল পাহাড়ে বা সমুদ্রে থাকে না। সমভূমিতেও থাকে; থাকে মানুষের ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসা নেই বলেই আজ প্রকৃতি মানুষের প্রতি বিরূপ আচরণ করছে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!