ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূল: ওলগা তোকারচুক

অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (১ম পর্ব)

অনুবাদ: ফজল হাসান
প্রকাশিত: ১৭:০১, ২২ জুলাই ২০২২
অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (১ম পর্ব)
ছবিঃ অন্তর্জাল (প্রতীকী)

শিশুটির মধ্যে সুন্দর কিছু রয়েছে—কথাটি প্রত্যেকেই বলেছে । মারেক মারেকের ছিল শুভ্র-সোনালি চুল এবং কোনো এক দেবদূতের মতো নিষ্পাপ মুখমন্ডল । তার বড় বোনেরা তাকে খুবই ভালোবাসত । তারা তাকে একটি পুরনো জার্মান প্র্যামে বসিয়ে পাহাড়ের রাস্তায় ঠেলত এবং তার সঙ্গে খেলা করত, যেন সে একটি পুতুল । তার মা তাকে স্তন্যপান করানো বন্ধ করতে চাননি । যখন শিশু মারেক মারেক মায়ের স্তন চুষত, তখন তার জন্য মা বিশুদ্ধ দুগ্ধ কল্পনা করতেন এবং তিনি নিজের স্তনবৃন্তের মাধ্যমে নিজেকে উন্মোচন করার স্বপ্ন দেখতেন । তাই তিনি ভবিষ্যৎ জীবনে মিসেস মারেক হওয়ার চেয়ে সেই স্বপ্ন দেখা আরো ভালো মনে করতেন । কিন্তু মারেক মারেক বড় হয়ে মায়ের বুকের দুধ পান করা বন্ধ করে দেয় । তার পরিবর্তে মারেক মারেকের বাবা বৃদ্ধ মারেক নিজের জন্য পথ খুঁজে পেয়েছিল এবং স্ত্রীর গর্ভে আরো বেশ কয়েকটি সন্তান জন্ম দিয়েছিল । 

কিন্তু এত হাস্যোজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত হওয়া সত্ত্বেও শিশু মারেক মারেক মোটেও ভোজনরসিক ছিল না এবং রাতে কান্নাকাটি করত । এ কারণেই হয়তো তার বাবা তাকে পছন্দ করত না । যখনই সে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরত, তখনই সে শিশু মারেক মারেককে মারধর শুরু করত । যদি মারেক মারেকের মা তাকে মারধর থেকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসেন, তাহলে সে স্ত্রীকেও প্রহার করত, যতক্ষণ না তারা বাঁচার জন্য উপরের ঘরে পালিয়ে যেত এবং বৃদ্ধ মারেককে নাক ডাকার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য বাড়ির বাকি অংশ ছেড়ে দিত । শিশু মারেকের বোনেরা তাদের ছোট ভাইয়ের জন্য দুঃখবোধ করত । তাই বোনেরা মিলে শিশু মারেককে সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে থাকার কৌশল শিখিয়েছে । মারেক মারেক পাঁচ বছর বয়স থেকে বেশিরভাগ সন্ধ্যায় ভূগর্ভস্থ ঘরে লুকিয়ে থাকত । সেখানে সে নিঃশব্দে কান্নাকাটি করত এবং কান্নার সময় তার চোখ থেকে কোনো অশ্রু গড়িয়ে পড়ত না ।

Advertisement

ভূগর্ভস্থ ঘরে মারেক মারেক বুঝতে পেরেছিল যে, তার অন্তরের ব্যথা বাইরে থেকে আসে না, বরং ভেতর থেকে আসে এবং তার মাতাল বাবার অত্যাচার ও মায়ের আদর-সোহাগের সঙ্গে ব্যথার কোনো সম্পর্ক নেই । কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই ব্যথা করে, ঠিক যেমন প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে এবং প্রতি রাতে অসংখ্য তারা আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে । এটা কেবলই বেদনা বাড়ায় । সে এখনও জানে না যে, ব্যথাটা আসলে কী ছিল । তবে কখনও কখনও তার মনের মধ্যে ভেসে উঠত একধরণের উষ্ণ গরম আলো ডুবে গিয়ে পুরো বিশ্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার অস্পষ্ট স্মৃতি । সে জানে না সেসব স্মৃতির উৎপত্তি কোথায় হয়েছিল । সে তার শৈশবের যা কিছু মনে করতে পারে, তা হলো চিরন্তন গোধূলি, অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ, বিষাদে নিমজ্জিত পৃথিবী এবং শুরু বা শেষ না হওয়া সন্ধ্যার শীতলতা ও দূর্দশা । এছাড়া গ্রামে বিদ্যুৎ আসার দিনটির কথাও তার মনে পড়ে । সে ভেবেছিল যে, পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে পাহাড়ের উপর দিয়ে কুচকাওয়াজ করে আসা উঁচু পিলারগুলো যেন গির্জার বিশাল স্তম্ভ । 

মারেক মারেক তার গ্রামের প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা নওয়া রুদার জেলা গ্রন্থাগারের সদস্য হয়েছিল । তারপর সে গ্রন্থাগার থেকে একটি বই তুলে এনে তার বাবার দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল এবং বইটি পড়ার জন্য সে অনেক সময় নিয়েছিল ।

নোয়া রুদার গ্রন্থাগারটি ছিল পুরনো ভাঁটিখানা দালানে এবং এখনও সেখানে চোলাই মদ ও বিয়ারের গন্ধ পাওয়া যায়; দেওয়াল, মেঝে এবং সিলিংয়ে একই কটুগন্ধ বিরাজমান—এমনকি মনে হয় যেন বইয়ের পৃষ্ঠায় বিয়ার ঢেলে দেওয়া হয়েছে । মারেক মারেক এই তীব্র গন্ধ পছন্দ করত । পনের বছর বয়সে সে প্রথমবারের মতো মদ্যপান করে মাতাল হয়েছিল । তার কাছে সেই অনুভূতি ভালোই লেগেছিল । সে বিষণ্ণতার কথা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল । সে অন্ধকার এবং আলোর মধ্যে পার্থক্য দেখতে পায়নি । তার শরীর শ্লথ হয়ে গিয়েছিল এবং সে তার ইচ্ছে মতো কাজ করেনি । তা-ও তার কাছে ভালো লেগেছে । তার মনে হয়েছিল সে যেন নিজের দেহ থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং কোনো কিছু না ভেবে কিংবা অনুভব না করেই সে নিজের পাশে বেঁচে আছে ।

মারেক মারেকের বড় বোনদের বিয়ে হয় এবং তারা বাড়ি ছেড়ে চলে যায় । তার ছোট এক ভাই অবিস্ফোরিত বোমার আঘাতে নিহত হয় । অন্য আরেক ভাই ক্লডজকোর একটি বিশেষ স্কুলে থাকত । তাই বৃদ্ধ মারেকের হাতে বিভিন্ন কারণে মারধর খাওয়ার জন্য কেবল মারেক মারেক ছিল, যেমন মুরগির খাঁচা বন্ধ না করার জন্য, যথেষ্ট পরিমাণে ছোট করে ঘাস না কাটার জন্য, শস্য মাড়াই যন্ত্র চালু করার অংশটি ভাঙার জন্য । কিন্তু মারেক মারেকের বয়স যখন প্রায় কুড়ি বছর, তখন সে প্রথমবারের মতো তার বাবাকে পাল্টা আঘাত করেছিল । তারপর থেকে তারা নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ত । ইতোমধ্যে যখনই মারেক মারেকের কাছে সামান্য ফাঁকা সময় থাকত এবং মদ্যপান করার জন্য অর্থকড়ি থাকত না, তখন সে মুক্ত ছন্দের কবি স্ট্যাচুরা১-র সাহিত্য পড়ত । তার জন্য লাইব্রেরীর মহিলারা লেখকের সংগৃহীত গ্রন্থ এনে দিত এবং সেগুলো নীল কাপড়ে মোড়ানো থাকত, যা জিন্সের মতো দেখাত ।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!