অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (শেষ পর্ব)
ছুটির ঠিক পরেই জমাট বাঁধা বরফ গলা শুরু করে; তুষার বিরক্তিকর বৃষ্টিতে পরিণত হয়েছিল এবং পৃথিবীটা পানি ভর্তি টসটসে ধূসর ছত্রাকের মতো লাগছিল । তখন ভদকাও শেষ হয়ে গিয়েছিল ।
মারেক মারেক বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়নি । তার ঠান্ডা লেগেছিল এবং সমস্ত শরীরে ব্যথা অনুভব করেছিল । পান করার জন্য কোথায় কিছু খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, এ চিন্তা সে অব্যহত রাখে । হঠাৎ তার মনে হয় বৃদ্ধ মার্তার কাছে হয়তো যে কোনো ধরনের মদিরা থাকতে পারে । বৃদ্ধার বাড়িটি খালি ছিল । কারণ সবসময় তিনি শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য অন্য জায়গায় চলে যান । মারেক মারেক তার মানসপটে বৃদ্ধার রান্নাঘরের টেবিলের নীচে সাজিয়ে রাখা ঘরে তৈরি মদিরার বোতল দেখতে পেল, যদিও আসলে সে জানত যে বৃদ্ধা মার্তা কখনই ঘরে কোনো মদিরা তৈরি করেন না । তবে সম্ভবত এ বছর তিনি কালোজাম বা কিসমিস জাতীয় কুল দিয়ে তৈরি করেছেন এবং তা টেবিলের নিচে লুকিয়ে রেখেছেন । গোল্লায় যাক বুড়ি, সে ভাবে এবং বিছানা থেকে নেমে যায় । সে হেলদোলভাবে হাঁটে । কারণ সে বেশ কয়েক দিন ধরে কিছু খায়নি এবং তার মাথা ব্যথা করছিল, যেন যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে ।
দরজায় তালা লাগানো ছিল । মারেক মারেক লাথি মেরে খুলে ফেলে । দরজার কব্জাগুলোয় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয় । সে অসুস্থ বোধ করে । রান্নাঘরটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বৃদ্ধা মার্তা আগের দিনই চলে গেছেন । চেক অঙ্কিত অয়েল-ক্লথ দিয়ে টেবিলটি আচ্ছাদিত ছিল এবং অয়েল-ক্লথ মেঝে পর্যন্ত ঝুলানো ছিল । অয়েল-ক্লথের উপর একটি বড় রুটির ছুরি রাখা ছিল । মারেক মারেক দ্রুত টেবিলের নীচে উঁকি দেয় এবং অবাক হয়ে দেখে যে, সেখানে কিছুই নেই । সে আলমারি ঝাঁকাতে শুরু করে । তারপর সে চুলার মধ্যে, কাঠের ঝুড়িতে এবং আলমারির দেরাজ খুলে খুঁজতে থাকে । আলমারির ভেতর বিছানার চাদর পরিপাটি করে স্তূপীকৃত ছিল । সবকিছুর মধ্যে শীতের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ—বরফ, ভেজা কাঠ এবং ধাতু । সে সব জায়গায় খোঁজে । গদি এবং হাঁসের পালকের তৈরি লেপ-তোষকের উপস্থিতি অনুভব করে, এমনকি পুরনো রাবারের তৈরি বুট জুতার ভেতরে তার হাত ঢুকিয়ে খোঁজে । শরৎকালে মার্তা সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল যে, তিনি চলে যাওয়ার আগে বাড়িতে প্রস্তুত করা মদিরার বোতলগুলো যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছেন । কিন্তু কোথায় রেখেছেন, তা সে জানে না । ‘নির্বোধ বুড়ি আস্ত একটা শয়তান,’ সে বিড়বিড় করে বলে এবং বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে । সে টেবিলের ওপর হাত প্রসারিত করে এবং তাতে মাথা রেখে বসে । তার অশ্রু অয়েল-ক্লথের ওপর পড়ে কিছু ইঁদুরের বিষ্টা মুছে দেয় । একসময় সে ছুরির দিকে তাকায় ।
বুড়ির রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় সে কাঠের লাঠি দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল । কারণ সে বৃদ্ধা মার্তাকে পছন্দ করে এবং সে চায়নি যে, রান্নাঘরে বরফ প্রবেশ করুক । একই দিনে পুলিশ তাকে ডেকে পাঠায় । ‘আমরা জানি যে, আপনিই ছিলেন, যাহোক না কেন,’ তারা বলেছিল এবং আরও যোগ করেছিল যে, তারা ফিরে আসবে ।
মারেক মারেক পুনরায় শুয়ে পড়ে এবং শীত অনুভব করে । কিন্তু সে জানত যে, কাঠ কাটার জন্য সে দীর্ঘ সময় কুড়াল ধরে রাখতে পারবে না । পাখিটি তার অভ্যন্তরে ঝাঁকুনি দিচ্ছিল এবং সেই ঝাঁকুনি তার শরীরকে কাঁপিয়ে তুলছিল ।
আচমকা সন্ধ্যা নেমে আসে, যেন কেউ বাইরে থেকে আলো নিভিয়ে দিয়েছে । জানালার কাচে হিমশীতল বৃষ্টি অবিরাম আঘাত করছিল । যদি আমার কাছে একটি টেলিভিশন থাকত, মারেক মারেক ভাবে । তখন সে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল এবং ঘুমাতে পারছিল না । রাতে বেশ কয়েকবার সে উঠে একটি পাত্র থেকে পানি পান করেছিল । পানি ছিল ঠান্ডা এবং ভয়ানক । পান করা সেই পানি তার শরীরে অশ্রু কণায় পরিণত হতে থাকে, যা সন্ধ্যায় প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তার কান ভর্তি করে, এমনকি তার ঘাড়ে সুড়সুড়ি দেয় । দিনের বেলা সে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পরে তার প্রথম চিন্তা ছিল যে, পানির ট্যাঙ্কে আর কোনও ভদকা নেই ।
মারেক মারেক উঠে দাঁড়ায় এবং একটি পাত্রে প্রস্রাব করে । তারপর সে দেরাজের মধ্যে রশি খুঁজতে শুরু করে । যখন সে কোনো রশি খুঁজে পেল না, তখন সে একটি পুরনো বিবর্ণ পর্দা ছিঁড়ে ফেলে । পর্দাটি যে তারের উপর ঝুলছিল, সে সেই তারটি খুলে আনে । জানালা দিয়ে সে তাকিয়ে দেখে যে, প্রতিবেশি তার বাইকটি নোয়া রুডার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে । হঠাৎ মারেক মারেক আনন্দিত বোধ করে । অবশেষে বৃষ্টি বন্ধ হয় এবং সমস্ত জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর ধূসর শীতের আলো প্রবেশ করে । তখন পাখিটিও চুপ করে গিয়েছিল; সম্ভবত সে ইতোমধ্যে মারা গেছে । মারেক মারেক তার দিয়ে দড়ি তৈরি করে এবং দরজার পাশে একটি হুকের সঙ্গে বেঁধে রাখে, যার ওপর তার মা হাড়িপাতিল ঝুলিয়ে রাখতেন । সে ধোঁয়ার মত একটা কিছু অনুভব করে এবং সিগারেট খুঁজছে শুরু করে । যখন তার হাত থেকে কিছু বড়ি নিচে পড়ে যায়, তখন সে ছেঁড়া কাগজের মৃদু ঝিরঝির ধ্বনি, মেঝের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ এবং কাঠের পাটাতনের ওপর একটানা শব্দ শুনতে পায় । সে সিগারেট খুঁজে পায়নি । তাই সে সরাসরি আঙটার কাছে যায়, গলায় ফাঁস স্থাপন করে এবং মেঝেতে পড়ে যায় । সে ঘাড়ের পেছনে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে । অল্প সময়ের জন্য তারটি আরও বেশি শক্ত হয়ে যায় । তারপর তারটি শিথিল হয় এবং আঙটা থেকে পিছলে যায় । মারেক মারেক মাটিতে পড়ে যায় এবং সে বুঝতে পারেনি তার কি হয়েছে । তার সারা শরীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে এবং পাখিটি পুনরায় চিৎকার করতে শুরু করে । ‘আমি শূকরের মতো বেঁচে আছি এবং আমি শূকরের মতো মরে যাব,’ মারেক মারেক কন্ঠস্বর সপ্তমে তুলে বলল এবং খালি বাড়িতে সেই তীব্র আওয়াজ একধরনের চ্যালেঞ্জের মতো শোনায় । যখন সে আবার হুকের সাথে তার বাঁধছিল, তখন তার হাত কাঁপছিল । সে গিঁট লাগায়, দড়ি প্যাঁচায় এবং মোচড়ায় । দড়িটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ওপর থেকে ঝুলতে থাকে । তবে এত বেশি উপরে নয় যে, তার চেয়ারের প্রয়োজন ছিল । অন্যদিকে উচ্চতা এত কম নয় যে, সে অনায়াসে বসতে পারে । সে মাথা গলিয়ে দড়ি বাঁধে । এক মুহূর্তের জন্য সে গোড়ালির ওপর ভর করে একবার পেছনে এবং আরেকবার সামনের দিকে ঝোঁকে । তারপর হঠাৎ করে সে নিচে ঝুলে পড়ে । এবার ব্যথা এতটাই বেশি পায় যে, তার মাথা ঘুরতে থাকে । সে মুখ হা করে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে । মেঝেতে শরীরের ভর রাখার সময় তার পা টলতে থাকে । যদিও সে যা চেয়েছিল, পরিস্থিতি সেরকম ছিল না । সে কঠিনভাবে চেষ্টা করে এবং যা ঘটেছে, তা দেখে সে রীতিমত বিস্মিত হয় । একসময় সে এত বেশি আতঙ্কিত হয় যে, সে নিজেকে ভিজিয়ে ফেলে । সে মোজা পড়া পায়ের দিকে তাকায় । তারপর মোজা খুলে প্রস্রাবের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে । আমি আগামীকাল আবার চেষ্টা করব, সে আশাবাদী হয়ে ভাবে । কিন্তু সে তার শরীরের জন্য কোনও সমর্থন খুঁজে পায়নি । তাই সে আবার চেষ্টা করে । কিন্তু ঠিক তখনই সে তার মাথার ভেতর সংঘর্ষের বিকট আওয়াজ শুনতে পায়; ধাক্কা, গুলি এবং বিস্ফোরণ । সে দেওয়াল আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে, কিন্তু তার হাত কেবল ভেজা এবং নোংরা চিহ্ন রাখে । তারপর তার নড়াচড়া থেমে যায় । তারপরও সে আশা করেছিল যে, তাকে লক্ষ্য না করেই খারাপ সমস্ত কিছু চলে যাবে । সে জানালার দিকে আঠার মত দৃষ্টি আটকিয়ে রাখে এবং তার কাছে একটি অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে যাওয়া চিন্তা এসে ভর করে: তার প্রতিবেশি ফিরে আসবে । তারপর জানালার উজ্জ্বল আয়তক্ষেত্রটি অদৃশ্য হয়ে যায় ।
[মূল গল্পে নেই, কিন্তু পাঠকের সুবিধার্থে কয়েকটি অপরিচিত নামের বা শব্দের টীকা জুড়ে দেওয়া হলো]
১ মুক্ত ছন্দের কবি (বিট পোয়েট) হিসেবে খ্যাত এডওয়ার্ড স্টাচুরা (১৯৩৭-১৯৭৯) ছিলেন পোলিশ কবি, লেখক এবং অনুবাদক । তিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন । মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করেন ।
২ জুবিলাটকা – যে অনুষ্ঠানে একজন মহিলা তার জন্ম জয়ন্তী বা বিয়ে বার্ষিকী উদযাপন করে ।
৩ ডেমিজোন – বড় সরু গলার কাঁচের বোতল, যা সাধারণত শুকনো পাতা, নরম বাঁশ বা বেতের ফালি দিয়ে তৈরি ঝুড়ির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয় । উল্লেখ্য, ইতালীর তৈরি ডেমিজোনে সুরা সংরক্ষণ এবং পরিপক্ক করার প্রচলিত ঐতিহ্য রয়েছে ।
.png)
লেখক পরিচিতি: নোবেল বিজয়ী পোলিশ ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, বামপন্থী অধিকারকর্মী এবং বুদ্ধিজীবী ওলগা তোরাকজুক (পুরো নাম ওলগা নভোয়া তোরাকজুক) ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন । মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন । তার প্রথম উপন্যাস দ্য জার্নি অব দ্য বুক পিপল’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে । ইংরেজিতে অনূদিত ‘ফ্লাইটস্’ তার সবচেয়ে সফল এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস । এই উপন্যাসের জন্য তিনি ২০১৮ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার’ পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে ঘোষিত ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জণ করেন । ইংরেজিতে অনূদিত তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হাউজ অব ডে, হাউজ অব নাইট’, ‘প্রিমেভাল অ্যান্ড আদার টাইমস’, ‘ড্রাইভ ইয়োর প্লাউ ওভার দ্য বোনস্ অব দ্য ডেড’, ‘দ্য লস্ট সৌল’ এবং ‘দ্য বুক অব জ্যাকব’। উল্লেখ্য, ‘দ্য বুক অব জ্যাকব’ ২০২২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার’ পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে । তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ।
গল্পসূত্র: ‘মারেক মারেক’ গল্পটি ওলগা তোকারচুকের ইংরেজিতে একই শিরোনামের ছোটগল্পের অনুবাদ । পোলিশ ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অ্যান্টোনিয়া লয়েড-জোনস্ । গল্পটি ‘গ্রান্টা’ ম্যাগাজিনে (অনলাইন সংখ্যা) ২০০২ সালের ২৮ জুন প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে ।
+++++
প্রথম পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/326640
দ্বিতীয় পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/328156
তৃতীয় পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/329561
চতুর্থ পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/331281