ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাসঃ দ্য প্লেগ)

দ্য প্লেগ (পর্ব ৪১) 

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১১:৪২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৪১) 
ছবিঃ অন্তর্জাল, প্রতীকী (কোয়ারেনটাইন ক্যাম্প)

কর্তৃপক্ষ আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হলো। সেটি হলো খাদ্য-সরবরাহকে চালু রাখা। ব্যবসায়ীরা প্রচুর লাভ করতে শুরু করল। বাজারে যে জিনিসগুলো সহজভ্য নয়, সেগুলোর দাম বাড়িয়ে দিলো। অনেকগুণে। ফলাফল হলো যে, ধনীদের তেমন সমস্যা না হলেও গরীব মানুষেরা খাদ্যের প্রচন্ড সংকটে পড়ে গেল। ফলে প্লেগ তার নিরপেক্ষ কাজকর্ম অর্থাৎ মৃত্যুর মধ্যদিয়ে শহরের মানুষদের মধ্যে সমতা আনার চেষ্টা করলেও সমাজে এর বিপরীত প্রভাব পড়ল। সুন্দর ও অসুন্দরের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে গেল। মানুষের হৃদয়ে অবিচার ও বঞ্চিত হবার অনুভূতি তীব্র হয়ে উঠল। মৃত্যু তাদেরকে চির-অভ্রান্ত সমতার কথা স্মরন করিয়ে দিলেও তারা এই ধরণের সমতা পছন্দ করল না।

গরীব মানুষেরাই বেশি আক্রান্ত হলো এবং তারা গ্রামাঞ্চলের নিকটবর্তী শহর ও গ্রামগুলোতে ফিরে যেতে আকুল হয়ে উঠল। কারণ, সেখানে খাবারের দাম ছিল সস্তা ও জীবনযাত্রার ওপরে কোনো আরোপিত নিষেধাজ্ঞা  ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা ভাবল যে, তাদেরকে এইসব সুখী জায়গাগুলোতে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল কর্তৃপক্ষের। তারা তাদের এই অনুভূতিগুলোকে শ্লোগানে রূপ দিয়ে চারদিক মুখরিত করে তুলল। দেয়ালের  গায়ে গায়ে লেখা হতে লাগলঃ “রুটি অথবা মুক্ত বাতাস”। শ্লেষাত্মক এই যুদ্ধ-কান্না ক্রমশ হয়ে উঠল বিক্ষোভপ্রদর্শনের সংকেত। এগুলোর মধ্যদিয়ে প্রত্যেককেই মনে করিয়ে দেওয়া হলো যে, সহজে চেপে রাখা সম্ভব হলেও সবার মধ্যেই  একটা কদাকার ও অস্থির মেজাজ দ্রুত বেড়ে উঠছে।

বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, খবরের কাগজগুলো তাদেরকে দেওয়া নির্দেশাবলীগুলো প্রচারের মধ্যদিয়ে চারদিকে আশার বাণী ছড়াতে লাগল। জনগণ সেগুলো পড়ে জানতে পারল যে, তারা ‘দৃষ্টান্তমূলক সাহস ও সংযম’ প্রদর্শন করছে। কিন্তু যে শহর নিজেই নিজের ওপর আপতিত হয়েছে এবং যেখানে কোনোকিছুই গোপন রাখা সম্ভব নয়, সেখানে দৃষ্টান্ত জিনিসটা মায়া ছাড়া অন্যকিছু বলে কারো কাছে মনে হলো না। সুতরাং সাহস ও সংযম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্থাপিত কোয়ারেনটাইন বা আইসোলেশ ক্যাম্পে একবার পরিদর্শন করাই শ্রেয়  হবে। তবে এই সময়ে আমাদের বর্ণনাকারী অন্যত্র ব্যস্ত থাকার কারণে এগুলোর কোনোটিতেই তিনি পরিদর্শনে যেতে পারেননি। একারণেই আমাদেরকে এই জায়গাগুলোর বর্ণনা ও অবস্থা জানার জন্যে ত্যারুর ডায়রীতে ফিরে যেতে হয়েছে। 

Advertisement

ত্যারুর দিনপঞ্জীতে মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়ামে স্থাপিত ক্যাম্পে র‌্যাম্বার্টের সাথে তার পরিদর্শনের যে বর্ণনা পাই তা  হলো নিম্নরূপঃ

স্টেডিয়ামটির অবস্থান শহরের শেষ সীমানায় গাড়ি চলাচলের সড়ক ও একটা পতিত ভূমির মধ্যবর্তী স্থানে। পতিত ভূমিটি মালভূমির শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যে মালভূমির ওপরেই ওরান শহর গড়ে উঠেছে। স্টেডিয়ামটির চারদিক উঁচু কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ফলে কেবলমাত্র এর চারটি প্রবেশ দরজায় প্রহরী বসালেই যে কারো পক্ষে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। দেয়ালগুলো কর্তৃপক্ষের আরেকটি উদ্দেশ্য পূরণ করে থাকে। সেটি হলো কোয়ারেন্টাইনে থাকা দুর্ভাগ্যবান মানুষদেরকে এগুলো রাস্তায় চলাচলরত মানুষদের  দৃষ্টির বাইরে রাখে। 

এই সুবিধার বিপরীতে এখানকার  বাসিন্দারা সারাদিন ধরে রাস্তায় গাড়ি চলার শব্দ শুনতে পেলেও সেগুলোকে তারা  দেখতে পায় না। কেবল সেগুলোর চলাচলকে অনুভব করে রাস্তা ওপর থেকে আসা শব্দের মাত্রা বেড়ে যাওয়া শুনে। বিশেষ করে যখন শহরের লোকজন কাজে গমন করে অথবা কাজ শেষ করে নিজেদের বাসস্থানে ফিরে আসে। এগুলো থেকে তারা বুঝতে পারে যে, নাগরিক জীবন থেকে তাদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে, যা আগের মতোই চলছে, তাদের থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই। তারা অনুভব  করে যে, স্টেডিয়ামের চারপাশের উঁচু দেয়ালগুলো তাদের জগতকে বাস্তব পৃথিবী থেকে আলাদা করে দিয়েছে। পরস্পর পাশাপাশি থাকা দুই  অনাত্মীয় পৃথক গ্রহের মতো। 

ত্যারু ও র‌্যাম্বার্ট এক রবিবারের বিকেলকে নির্বাচন করল স্টেডিয়াম পরিদর্শনের জন্যে। তাদের সাথে গেল গনজালেস এবং সেই ফুটবল খেলোয়ার (যার সাথে র‌্যাম্বার্ট যোগাযোগ রেখেছিল এবং যাকে সে দায়িত্ব দিয়েছিল এই ক্যাম্পের কার্যক্রমের ওপরে নজরদারি করার জন্যে)। র‌্যাম্বার্ট এসেছে গনজালেসকে ক্যাম্পের কমান্ডেন্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে। সেদিন বিকেলে গনজালেসের সাথে দেখা হতেই ফুটবল খেলোয়াড় তাকে জানালো যে, প্লেগের  আগে সে  এখানেই ফুটবল খেলত। কিন্তু প্লেগের কারণে এই খেলার মাঠকে কর্তৃপক্ষ অধিযাচন করে নেয়ার কারণে তার খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। একারণেই সে র‌্যাম্বার্টের দেওয়া দায়িত্বটি গ্রহন করেছে এই শর্তে যে শুধুমাত্র সপ্তাহান্তে কাজ করবে। 

সেদিনের আকাশটি ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সেদিকে তাকিয়ে গনজালেস মন খারাপ করে বলল যে, এই ধরনের একটা দিন, যা খুব গরম অথবা বৃষ্টির নয়, তা খেলার জন্যে খুবই যথাযথ হতো। 

এরপর সে কল্পনা করল যে, এখানে সে তার পরিচিত ড্রেসিং রুম, লোকজনের দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা, গাঢ় মাটির পটভূমিতে খেলোয়ারদের রঙিন শার্ট, লেবু বা লেমনেড ইত্যাদির গন্ধ পাচ্ছে। ত্যারুর বর্ণনায় এটাও এসেছে যে, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ে খেলোয়ার ছোট ছোট পাথরগুলোকে লাথি দিচ্ছিল এবং চিৎকার করছিল ‘গোল’ বলে। এবং কয়েকটা শিশু স্টেডিয়ামের পাশেই খেলছিল। তাদের দিক থেকে একটা বল তাদের তিনজনের দিকে ছুটে আসতেই গনজালেস সেটিকেমতো ফিরিয়ে দিয়েছিল। প্রবল দক্ষতা সহকারে। 

স্টেডিয়ামে ঢোকার পরেই তারা দেখতে পেল সেখানকার স্ট্যান্ডগুলো লোকজনে ভর্তি হয়ে আছে। পুরো মাঠটিতে  ছড়িয়ে আছে কয়েক শ’ লাল রঙের তাবু, যে গুলোর ভেতরে বিছানাপত্র ও কাপড়চোপড় দেখা যাচ্ছে। স্ট্যান্ডগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছিল বৃষ্টি অথবা গরমের সময়ে শিক্ষানবিশদের ব্যবহারের জন্যে। ক্যাম্পের নিয়মানুযায়ী প্রত্যেককেই সুর্যাস্তের সময়ে তার তাবুতে গিয়ে থাকতে হয়। স্ট্যান্ডগুলোর নীচে গোসলের শাওয়ার আছে। এগুলোকে  এক সময়ে খেলোয়ারদের ড্রেসিং রুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে এগুলোকে অফিস ও হাসপাতালে  রুপান্তর করা হয়েছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অধিকাংশই স্ট্যান্ডের আশেপাশে আছে।  কেউ কেউ মাঠের ভেতরে পায়চারি করছে। কেউ কেউ আবার হামাগুড়ি দিয়ে তাবুর ভেতরে ঢুকছে। 

“এরা সারাদিন কী করে?” ত্যারু র‌্যাম্বার্টকে জিগ্যেস করল।
“কিছুই না।“

দেখা গেল প্রায় সকলেরই হাতই খালি এবং তারা অলসভাবে হাত নাড়ছে। এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো আছে। সেটা হলো নির্জনতা।

“যখন তারা প্রথম এখানে এসেছিল, তখন তারা এতোটাই হট্টগোল করত যে, তুমি নিজের কথাই শুনতে পেতে না,” র‌্যাম্বার্ট বলল। “কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারা সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে।”

ত্যারুর নোটে এই পরিবর্তনের পেছনে কী কাজ করেছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সে তাদেরকে বর্ণনা করেছে তাবুর ভেতরে একসাথে ঢোকানো একপাল  মানুষ হিসেবে, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে মাছির গুঞ্জন শুনত, নিজেদের শরীর খামচাত, এমনকি যখন কোনো মনোযোগী শ্রোতা পেত, তাদের কাছে নিজেদের ভয় অথবা ক্ষোভ প্রকাশ করত। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন ক্যাম্পটি লোকজনে ভর্তি হয়ে গেল, তখন সহানুভূতিশীল শ্রোতার সংখ্যাও কমে গেল। তখন নিজেদের শান্তিরক্ষার জন্যে চুপচাপ হয়ে গেল। কারণ, তারা পরস্পরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করল। 
হ্যা, তারা সবাইকে সবাইকে অবিশ্বাস ও সন্দেহ করতে লাগল। কারণ, প্রথমদিকে তারা মনে করত যে, তাদেরকে পৃথক রাখার পেছনে কোনো ভালো কারণ আছে, কিন্তু কিছু লোক এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ত্যারু তাকিয়ে দেখল যে, প্রত্যেকেই শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এবং জীবন বলতে যা বোঝায় তার থেকে তারা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এক সময়ে যেহেতু তারা সারাক্ষণ মৃত্যুর কথা চিন্তা করতে পারত না, সেহেতু তারা অন্যকিছুও চিন্তা করা বাদ দিয়ে দিলো এবং পূর্ণ ছুটিতে চলে গেল। 

“কিন্তু সবচেয়ে খারাপ হলো,” ত্যারু লিখেছে,” তারা ভাবতে লাগল যে সবাই তাদেরকে ভুলে গেছে।”

তাদের বন্ধুরা তাদেরকে ভুলে গেছে, কারণ তাদের চিন্তা করার অন্য অনেক বিষয় আছে। এবং যারা তাদেরকে ভালোবাসত তারাও তাদেরকে ভুলে গেছে, কারণ তারা তাদেরকে কীভাবে ক্যাম্পের বাইরে আনা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করতে ও পদক্ষেপ নিতে গিয়ে নিজেদের সর্বশক্তিকে নিয়োগ করে ফেলেছে। ফলে তারা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করতে করতে তারা তাদেরকেই ভুলে গেছে, যাদের মুক্তির জন্যে তারা কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কেউই কারো সম্পর্কে চিন্তা করতে পারছিল না, এমনকি তাদের চরম দুঃসময়েও। কারণ, কারো সম্পর্কে চিন্তা করা মানেই হলো সেই ব্যক্তি সম্পর্কে দিনের প্রতিক্ষণ চিন্তা করা, অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা না করে, যা ছিল তাদের জন্যে খুবই ক্লান্তিকর। 

কিছুক্ষণ পরক্যাম্প ম্যানেজার এসে জানালো যে, মিঃ ওথোন নাম্রের এক ভদ্রলোক তাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন। গনজালেসকে অফিসে রেখে তারা ম্যানেজারের সাথে মাঠের এক কোণে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেল মিস্টার ওথোনকে বসে থাকতে। তিনি তারা আসতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

ম্যাজিস্ট্রেট ঠিক আগের মতোই পোশাক পরেছিলেন। শক্ত কলারসহ।

একমাত্র পরিবর্তন যা ত্যারু লক্ষ্য করল, তা হলো তার মাথার ওপরের চুলের গুচ্ছটি আঁচড়ানো নেই এবং তার একটি জুতার ফিতে খোলা। এছাড়া তাকে দেখতে খুবই ক্লান্ত মনে হচ্ছিল এবং একবারের জন্যেও তিনি আগতদের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন যে, তাদেরকে দেখতে পেয়ে তিনি খুশি হয়েছেন এবং অনুরোধ করলেন ডাক্তার রিও’কে তার ধন্যবাদ দিতে, তার সাহায্যের জন্যে। 

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ম্যাজিস্ট্রেট আবার বললেনঃ

“আমি আশা করি যে, মৃত্যুর আগে জ্যাক খুব বেশি কষ্ট পায়নি।”

এই প্রথমবার ত্যারু তাকে শুনল নিজের সন্তানের নাম উচ্চারণ করতে। এবং বুঝতে পারল যে, তার ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছিল মেঘের ভেতর দিয়ে। সেটির আলো স্ট্যান্ডগুলোর ওপরে এসে পড়ছিল। উপস্থিত সবার মুখকে কিছুটা হলুদ রঙে রাঙিয়ে দিয়ে।

“না,” ত্যারু বলল, “আমি মনে করি না যে, সে খুব কষ্ট পেয়েছে।”

তারা চলে আসার সময়ে দেখল যে, ম্যাজিস্ট্রেট তখনো আলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। 

আরো পড়ুন> দ্য প্লেগ (পর্ব ৪০)
                > দ্য প্লেগ (পর্ব ৩৯)

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ট্যাগ: দ্য প্লেগ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!