ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

বৈশাখী ঝড়

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৪:০১, ৬ এপ্রিল ২০২৪
বৈশাখী ঝড়
ফাইল ফটো

(আমার ২০১৫ সনের ৬ এপ্রিল তারিখের পোস্ট। মাঝে মাঝেই  আমার মনে হয় জীবনের  এই একমুখী যাত্রায় আমরা কখনোই পেছনে ফিরে যেতে পারি না। এক দুর্লঙ্ঘ  নিয়তি এটা আমাদের সবার!)

“একদিন নগর সেইখানেও উপস্থিত হবে তার কর্ষিত জমি থেকে রাজস্ব আদায় করে নিতে। তবে যতদিন না সেই দিনটি আসে ততদিন এই কৃষক সেই জমিতে বীজ বুনে চলবে। তারপর সময় হলে সে, বা তার বংশধরেরা আবার হয়ত নতুন যাত্রায় বের হবে নতুন কোন অকর্ষিত ভূমির সন্ধানে। এ যাত্রার শেষ নেই।”

আমার ভাড়া বাসাটা ত্রিকালের সন্ধিক্ষণে  যেন বা এক ছিটমহলের ভেতরে। এর সামনের ও  ডানের দিকে অযুতকাল থেকে ঢাকা সেনানিবাস বয়ে এসে বর্তমানকালে পড়েছে। বাম দিকটায় ‘প্রয়াশ’ ও ‘নির্ঝর  আবাসিক এলাকা’ মিলে একটা নান্দনিক ভবিষ্যৎ রচনা করছে। তার পাশেই ভাসানটেক বস্তি। আমার বাসার সামনে দিয়ে ১১ নম্বর রাস্তা সর্পিল সাপের মতো  প্রবাহিত হয়ে ভাসানটেক বস্তির অতীত এবং সেনানিবাসের বর্তমানের মধ্য দিয়ে ফ্লাই ওভারের কাছে এয়ারপোর্ট- মিরপুর রোডের সাথে মিলে অনিন্দ্য সুন্দর কোন ভবিষ্যতের দিকে চলে গেছে।

Advertisement

আমার বাসাটা মূলত পেছনের সেনানিবাস রেসিডেনশিয়াল এরিয়ার একটা এক্সটেনশন। সামনের ১১ নম্বর রাস্তাটা না থাকলে পেছনের বাড়িগুলোর মতই এটা অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীতকে নির্দেশ করতো। আমার বাসার পাশেই একটা সম্ভবত বিতর্কিত জমিতে এখনও সবুজের সমারোহ। সব মিলে আমি যেখানে বসবাস করি সেখান থেকে একই সাথে ত্রিকাল দর্শন সম্ভব!

গতরাতে সম্ভবত রাত তিনটের দিকে বাইরে অজস্র কুকুরের চিৎকার চেঁচামেচিতে আমাদের সবার ঘুম ভেঙ্গে গেল একযোগে। কুকুরগুলোর নিবাস কোনোটার সেনানিবাস রেসিডেনশিয়াল  এরিয়ায়, অনেকগুলোর ভাসানটেক বস্তিতে এবং কয়েকটার মালিকানা সম্ভবত ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের, যাদেরকে গুলির অভাবে এখনো মেরে ফেলা সম্ভব হয়নি। আমার ছোট মেয়ে রাইয়া ভীষণ বিরক্ত। সে আধো ঘুমের ভেতরেই চিৎকার করে উঠলো, “পাপা, এই দুষ্ট কুকুরগুলো রাতের বেলায় এমন চিল্লাচ্ছে কেন?” তার পর আবার নিবিড় ঘুম। এমনকি আমার স্ত্রীও! জেগে আছি শুধু আমি একা!

কুকুরের চিৎকার চেঁচামেচি স্তিমিত হয়ে আসার কিছুক্ষন পরই শুরু হলো  কয়েক মিনিট পর পর আলোর ঝলকানি আর ট্রাক অথবা ট্রাক্টরের মুহুর্মুহু গর্জন! মনে হচ্ছে  আমার বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে আর্মি কনভয় যাচ্ছে এই রাতের আঁধারকে চিরে। অনন্ত এই যাত্রা। মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে উজ্জ্বল লাল রঙের যন্ত্রদানবেরা শহরের ভেতরে প্রবেশ করে আমাদের বাসা বাড়িগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে সমতল করে দিচ্ছে, আমাদেরকে অনিকেত করে দেওয়ার জন্যে।

আমার মনে আছে কয়েকমাস আগে আমার শুশুরের বাসার কাছে এক ডেভেলপার কোম্পানির লোকেরা রাতের আঁধারে ট্রাক্টর নিয়ে দেয়াল ভেঙ্গে এক বাসার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলো। বাসার মালিক তার রেজিসটারড  অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে সেবারের মতো  তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেও শেষরক্ষা হয়নি। মাত্র কয়েক মাস পরেই পুনর্বার আক্রমনের আশংকায় নিজেই হার্টফেল করে মারা যান তিনি। এখন তার স্ত্রীর ওপরে গিয়ে দায়িত্ব পড়েছে সম্পত্তি রক্ষা করার!

আমার বারান্দার কাঁচের দরজাটা খোলা। শুধুমাত্র একটা নেট দেওয়া আছে। আমি আবার ঘুমের ভেতরে চলে যেতে চেষ্টা করি। গাড়ির বা ট্রাকের অথবা ট্রাক্টরের শব্দ স্তিমিত হয়ে এসেছে। আধো ঘুমের ভেতরে আমি টের পেলাম আমাদের বাসা থেকে দুই বাসা দূরের মহিলাটি আমাদের বাসার গেইটে এসে গার্ডদের সাথে চিৎকার করছেন, “তোরা আমার বাসার জায়গা দখল করে এখানে বিল্ডিং তৈরি করেছিস!” গার্ডরাও  চিৎকার করে তাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না! অথচ আমি জানি যে এই মহিলা কয়েকদিন আগেই মারা গেছেন। আমার স্ত্রী দেখেছে তাকে খাটিয়ায় করে বহন করে নিয়ে যেতে!

এক প্রবল অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে আমার রাতের বাকি প্রহরগুলো ঘুম এবং নির্ঘুমের মধ্যে কাটতে থাকে।

সকালে বৃষ্টিস্নাত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ৯ নম্বর রোডের চায়ের দোকানে পৌঁছে দেখি এক লোক বলছে, “রাতে খুব ঝড় আর বৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ চমকানো দেখে আমার ছেলেটা বলছিল, পাশের মসজিদের মিনারের ওপরে বাজ পরেছে”।

আমি মিনারের দিকে চেয়ে দেখি সূর্যালোকে মিনারটা হাসছে! 

“কখনো গভীর রাতে,
ভোরবেলা আলো অন্ধকারে,
কখনো বৈকালে
ঝিকিমিকি আলো ছায়ায়।
হঠাত্‍‌ সন্ধ্যায় 
সিন্ধু বারোয়াঁয় লাগে তান,
সমস্ত আকাশে বাজে
অনাদি কালের বিরহবেদনা।
তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে 
এ গলিটা ঘোর মিছে 
দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো"। -বাঁশি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) 
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
০৬ এপ্রিল ২০১৫

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!