কালো বরফ: অন্তর্দহনের সুতীব্র প্রকাশ
প্রকম্পিত, বিস্তৃত ঢেউয়ের মতো সাবলীল, কলকল ও সুতৃপ্ত তার শব্দপ্রয়োগ। যেন হৃদয় নিংড়ে সমস্ত ব্যথা ঝেড়ে ফেলে। দমকা হাওয়ার মতো কখনো প্রকট, কখনো ধীর তার নির্মাণ।
দেশভাগের চরম যাতনা নিয়ে শিশুচিত্তে তার বর্ণনা এবং পরবর্তী কোনো এক সময়ে জীবন যখন মধ্যদুপুরের ভরাট রোদে এসে পৌঁছোয়, যখন চারিদিক কেবল হাহাকার জাগানিয়া স্বপ্ন মনে হয়, সেই রোমন্থনের ব্যাপক শূন্যতায় ফেলা আসা গল্প তার লেখনীতে এমন দুর্দান্তভাবে ফুটে ওঠেছে, যা অগ্রাহ্য করবার উপায় নেই।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারাসাতে জন্ম নেয়া মাহমুদুল হক একদম শৈশবে তার দৃষ্টিতে দেশভাগ, এর প্রকটতা, প্রভাব এবং সংকট বেশ সুনিপুণভাবেই রচনা করেছেন ‘কালো বরফ’-এ।
উপন্যাসটি যেমন সরল, তেমনি সরস এবং শব্দপ্রয়োগে দারুণ সৌন্দর্য্যখচিক। চিত্তগ্রাহী পাঠক এক পড়ায় শেষ না করে উঠতে পারবে না। রূপ এবং চিত্রকল্পে মাহমুদুল হক যথার্থ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন বাঙালির সবথেকে সংকটময় সময়টির সাথে যেখান থেকে হিন্দু-মুসলমানের ঐতিহাসিক সম্প্রীতি ধীরে ধীরে মরচে পড়া লোহার মতো ক্ষয়ে যেতে থাকে।
তৎকালীন জীবন ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া এক বালকের অর্জনের সবটুকু ত্যাগ যে কতো বেদনার হতে পারে, মাহমুদুল হক তা দেখিয়েছেন। পুরোপুরি জীবনের অংশ না হলেও লেখক যে সেই সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তা স্বচ্ছভাবেই প্রকাশ পায়। কেননা হক জন্মেছিলেন ১৯৪১ সনে। দেশভাগের সময় বারাসাতের কালীকৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৬ বছর বয়সী বালকের চিত্তে দেশভাগ পরবর্তী সময়ে বাবার সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার ফলত পাকিস্তানে চলে যাওয়া (পরবর্তীতে বাকি পরিবারসহ তাদেরও চলে যাওয়া) এবং তাদের পারিপার্শ্বিক সামাজিক অবক্ষয় ও সংকট বেশ প্রবলভাবেই প্রভাব ফেলেছিল। যার কারণে করুণ মর্মদহনের গল্প, বিশেষত অনুভূতি এবং পর্যবেক্ষণগুলো তিনি ভালোভাবেই তার উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। সেদিক থেকে বলা যায়, উপন্যাসটি অনেকাংশে আত্মজৈবনিকও বটে।
শিল্পগত দিক থেকে, শব্দবুননের কৌশলতায়, অপেক্ষাকৃত উপেক্ষিত অনুভবগুলোকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রে এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণে মাহমুদুল হকের জুড়ি মেলা ভার।
কালো বরফ বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে স্বতন্ত্র এবং সার্থক একটি উপন্যাস, যা পাঠকদের আড়ালে পড়ে যাওয়া চোখের দৃষ্টি গ্রাহ্য করতে, অগ্রাধিকার না দেয়া বাস্তবতাগুলোকে ইঙ্গিত করে দেখিয়ে দিতে যথেষ্ট সহায়ক হবে।
লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে