সঠিক সময়ে ঘুমায় না জবির ৮৪.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন শিক্ষার্থীরা। অনিয়মিত ঘুম, অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত খাবার, আবাসন সংকট, আর্থিক চাপসহ নানা কারণে ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন। এর মধ্যে সঠিক সময়ে ঘুম না হওয়া ও পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ না করার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের চালানো এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০৮ জন, অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত সঠিক সময়ে ঘুমান না।
অন্যদিকে, ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করেন না বলে জরিপে উঠে এসেছে।জরিপে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৬০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৩৯২ জন ছাত্র ও ২০৮ জন ছাত্রী।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৩৯২ জন ছাত্রের মধ্যে ২৭৯ জন রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে ঘুমাতে যান। আর ১১৩ জন ঘুমাতে যান রাত ৩টার পর। অর্থাৎ, অংশ নেওয়া ছাত্রদের কেউই রাত ১২টার আগে ঘুমাতে যাননি—এমন তথ্য জরিপে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ২০৮ জন ছাত্রীর মধ্যে ২০১ জনই রাত ১২টার পর ঘুমাতে যান। বাকি সাতজন রাত ১২টার আগে ঘুমাতে যান। সব মিলিয়ে ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৭জন রাত ১২টার আগে ঘুমাতে যান।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার প্রস্তুতি, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, মেস বা বাসার পরিবেশ এবং অনিয়মিত জীবনযাপন—এসব কারণে অনেকেই নিয়মিত রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করেন না। মাত্র ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত তিন বেলা খাবার খান।
ছাত্রদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৯২ জন ছাত্রের মধ্যে ৩৭৮ জনই দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার খান। নিয়মিত সকালের নাশতা করার ক্ষেত্রেও ছাত্রদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।
জরিপে অংশ নেওয়া ৩৯২ জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২০ জন নিয়মিত সকালে খাবার খান। বিপরীতে, ২০৮ জন ছাত্রীর মধ্যে ১৮৯ জন নিয়মিত সকালের খাবার খান।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়া, সকাল সকাল ক্লাস বা পরীক্ষা থাকা, আবাসিক হলের ডাইনিং বা ক্যান্টিনে সকালের খাবারের মান ও সহজলভ্যতার সমস্যা এবং রাতে দেরি করে ঘুমানোর কারণে অনেকের নাশতা করার সুযোগ হয় না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান মীম বলেন, ধামরাই থেকে প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় ক্লাস থাকায় তাঁকে অনেক সময় সকাল ৫টার দিকে বাসা থেকে বের হতে হয়। ফলে অনেক সময় সকালের নাশতা করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘দুপুরেও স্বাভাবিকভাবে ক্লাস থাকে। ক্লাসের সময় খাওয়া সম্ভব হয় না। আবার ক্লাস না থাকলেও আশপাশে ভালো খাবার পাওয়া যায়—এমন হোটেলের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাফেটেরিয়ার খাবার স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়া এবং বসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক সময় দুপুরের খাবারও খাওয়া হয়ে ওঠে না।’
‘ফলে একেবারে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে খাবার খেতে হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আবাসিক হলের সংকট এবং ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের মান অনুন্নত থাকায় একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়।’
অনিয়মিত ঘুমের বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. মিতা শবনম বলেন, সময়মতো না ঘুমালে ইনসমনিয়া বা নিদ্রাহীনতার সমস্যা তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ঘুম হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সকালের নাশতা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর সকালের খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। নিয়মিত নাশতা না করলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে, ফলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, নাশতা না করার কারণে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মেজাজের পরিবর্তন, বিরক্তিভাব, মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা বলেন, গবেষণা ও তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যদি সঠিক সময়ে ঘুমানো ও নিয়মিত খাবার গ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে আসে, তাহলে সেটিকে একটি ‘অ্যালার্ম’ হিসেবে দেখা উচিত। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা ছাত্রসমাজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই একটি সতর্কবার্তা।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার মতো সমস্যা দেখা দিলে কাউন্সেলিং সেন্টারে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম, আবাসন সংকট কিংবা অন্য কোনো কারণে মানসিক চাপে থাকলে কাউন্সেলিং সেন্টারের সহায়তা নিতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অনাবাসিক হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী পরিবার থেকে দূরে মেস বা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা করেন। ঢাকার মতো শহরে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনযাপনের ব্যয় বহন করতে গিয়ে তাদের নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতা, আবাসন ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ—সবকিছুই শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
‘বিশ্ববিদ্যালয় একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। সমাজের যারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছেন, তাদেরও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজেদের সমস্যাগুলো গোপন না রেখে বিভাগের শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো প্রয়োজন।’
ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘কোনো সমস্যা সামনে এলে শুধু নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করলেই সবসময় তার সমাধান হয় না। মানুষকে শুধু নিয়ম দিয়ে ঠিক করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন মানবিকতা। একজন শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আবাসন কিংবা অন্য কোনো কারণে মানসিক চাপে থাকতে পারেন। তাই শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন বলেন, ‘প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সঠিক সময়ে খাবার দেওয়া এবং সঠিক সময়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা—এটা একেবারে সহজ কোনো বিষয় নয়। তবে শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে। এখানে অবশ্যই কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থায় সংকট রয়েছে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী পুরান ঢাকার ছোট ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হন। পাশাপাশি আমাদের অবকাঠামোগত সংকটও রয়েছে। এখানে মাত্র একটি ক্যান্টিন আছে। এটা দিয়ে এত শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য কীভাবে আরও ভালো সেবা নিশ্চিত করা যায় এবং এসব সমস্যা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে।’
উপাচার্য বলেন, ‘এগুলো দীর্ঘদিনের সমস্যা। আমি চাইলেই দুই দিনে এর সমাধান করতে পারব না। তবে এ বিষয়ে আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। একই সঙ্গে কাউন্সেলিংয়ের ওপরও আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি বিভাগে ম্যান্ডেটরি কাউন্সেলিং সেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। র্যাগিংয়ের বিষয়েও সেশন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, তাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে, আমাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। সবাইকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য এসব সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে সম্মিলিতভাবে সবাইকে কাজ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও আমরা বিভিন্নভাবে কাজ করছি। কমিটি করছি, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করছি এবং গণসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছি।’
ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে উপাচার্য বলেন, ‘ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নত করার বিষয়টিও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। ক্যান্টিন পরিচালনাকারী ব্যক্তিরও পরিবার আছে, তারও আয়-ব্যয়ের বিষয় রয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে যদি খাবারের পরিমাণ বা মান কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও আমাদের বিবেক দিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। এই বিষয়টিও আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে এসে শুধু সমালোচনা করলেই হবে না। সবাইকে সম্মিলিতভাবে সংশোধনের কাজ করতে হবে। আমি চেয়ারে বসেছি বলে শুধু এটা আমার দায়িত্ব এমন নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
কীভাবে শিক্ষার্থীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া যায় এবং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো যায়, সেটি নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
জকসুর স্বাস্থ্য ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘খাবার খাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয় আমাদের সামনে আসে। ক্যাম্পাসের অন্যান্য বিষয়কে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, খাবারের বিষয়টিতে আমরা সেই পরিমাণ গুরুত্ব কখনোই পাই না। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে এই ক্যাফেটেরিয়াটি সংস্কার করা এবং আরও একটি ক্যাফেটেরিয়া চালু করার দাবি জানিয়েছি। একই সঙ্গে ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আমরা কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় খাবারের মান কিছুটা উন্নত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হচ্ছে। পানির সমস্যাটিও সমাধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাবারের পরিমাণ ও মূল্যসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানেও কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, খাবারের মান শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ক্যাফেটেরিয়ায় খাবার না খেয়ে বাসায় গিয়ে খাবার খেতে বাধ্য হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর বাসা অনেক দূরে হওয়ায় বিষয়টি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও খাবারের ওপরও প্রভাব ফেলে।
নূর মোহাম্মদ বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলের সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জকসুর উদ্যোগে অক্টোবর মাসে একটি মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের কথা বলা হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই জকসুর পক্ষ থেকে নিজেরাই এ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো একটি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের স্বল্প খরচে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেন্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফারজানা আহমেদ বলেন, একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সংকটকে কখনোই একটি মাত্র ঘটনা বা কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেক সময় এর পেছনে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
তিনি বলেন, ‘কারও মধ্যে আগে থেকেই মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা থাকতে পারে। পরবর্তীতে কোনো একটি ঘটনা বা পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তখন তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সেই মুহূর্তে যদি কেউ তাকে কিছুটা সময় দেয়, পাশে থাকে বা প্রয়োজনীয় সহায়তা করে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
খাবার ও ঘুমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘খাবার ও ঘুম মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আমরা কী খাচ্ছি, তার ওপর আমাদের শরীরের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে। আর শরীর সুস্থ থাকা মানে আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারা।’
তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে না, রাত জাগছে এবং খাবারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করছে। দিনের বেলায় আমাদের সক্রিয় থাকার কথা এবং রাতে শরীরের বিশ্রামের দিকে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা যখন রাত জেগে থাকি এবং ভোরে ঘুমাতে যাই, তখন শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।’
‘যখন আমার কাজ করার কথা তখন আমি ঘুমাচ্ছি, আর যখন আমার বিশ্রাম নেওয়ার কথা তখন আমি কাজ করছি—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর খাবার ও ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট রুটিন থাকে না। কখন কী খাবে, কখন ঘুমাবে—তার কোনো ঠিক থাকে না। ফলে বিষয়গুলো শারীরিক ও মানসিক—দুইভাবেই প্রভাব ফেলে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আবাসিক হলের সংকট এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়। ভালো ও স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতাও সব জায়গায় নেই। ফলে খাবারের মান ও খাদ্যাভ্যাস তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে একজন শিক্ষার্থীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য কতটা ভালো থাকবে, তা শুধু একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সমাজ, পরিবার, আর্থিক পরিস্থিতি, খাবার, ঘুম এবং আমাদের সামগ্রিক জীবনযাপন—সবকিছুই জড়িত।’
মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ সরাসরি সাহায্য না চাইলেও বিভিন্নভাবে তার কষ্টের কথা প্রকাশ করে। তাই আমাদের আশপাশের যারা ভালো সময় পার করছে না, তাদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে।’
‘আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। অন্য মানুষের কথা ভাবার সময় অনেক সময় আমাদের থাকে না। কারও মন খারাপ দেখে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে অন্তত একবার তার খোঁজ নেওয়া দরকার। আমাদের এই জায়গা থেকেই পরিবর্তন আনতে হবে। একে অপরের প্রতি আরও মানবিক, সহানুভূতিশীল ও যত্নশীল হতে হবে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে।
২০২১ সালে আঁচল ফাউন্ডেশনের একটি সমীক্ষায় ওই বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া পরবর্তী বিভিন্ন বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে।
২০২৪ সালে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর প্রিন্টমেকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার মতো ঘটনাকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক নানা বিষয় একসঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তাদের ঘুম, খাবার, আবাসন, আর্থিক চাপ ও সামগ্রিক জীবনযাপনের পরিবেশ নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ যখন নিয়মিত ঘুমাতে পারছেন না এবং পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার্থীকল্যাণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ আবাসন ও প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা ও জীবনযাপনও অনেকটা সহজ হবে।