খতিবের বক্তব্যে উত্তপ্ত বায়তুল মোকাররম, আলেম ও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব, প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ মুফতি আব্দুল মালেকের জামায়াতে ইসলামী সংক্রান্ত একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থী রাজনীতি এবং আলেম-ওলামাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক, উত্তেজনা ও নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে খতিবের সমর্থক এবং জামায়াতপন্থীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও বিক্ষোভে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশের ক্রান্তিলগ্নে আলেমদের এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের জড়িয়ে পড়া ইসলামপন্থী রাজনীতিতে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ এবং কওমি আলেমদের একাংশের জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে যাওয়া বা দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘যারা জামায়াতে যোগদান করবেন তারা পথভ্রষ্টতার পথে পা বাড়াবেন... পুরো কওমি যদি সব ওই দিকে যায় আল্লাহ মাফ করেন, সব গুমরা হয়ে যাবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, অনেকেই স্বপ্ন দেখেন পুরো কওমি সমাজ হয়তো জামায়াতের দিকে ধাবিত হবে। তবে যাদের কিসমত ভালো তারা ভুল পথ ছেড়ে সঠিক পথে ফিরে আসবে। একই সঙ্গে জামায়াতের লোগো এবং তাদের প্রচারিত 'আকিমুদ্দীন' বা দ্বীন কায়েমের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি 'নাউজুবিল্লাহ' বলেন এবং একে ইসলামের অপব্যাখ্যা হিসেবে অভিহিত করেন।
খতিবের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জামায়াতপন্থী আলেম ও অনুসারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়। আজ জুমার নামাজ শেষে একদল মুসল্লি খতিবের অপসারণ দাবি করতে পারেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে খতিবের সমর্থনে বিশাল জমায়েত হয়। বিএনপি সমর্থিত ওলামা দল, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যৌথ নেতৃত্বে শত শত আলেম ও মুসল্লি সেখানে অবস্থান নেন।
এ সময় বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ প্রকম্পিত করে স্লোগান দেওয়া হয়: ‘জামায়াত-শিবিরের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও! মওদুদির আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও!’
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দলগুলোর নেতারা অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী সুপরিকল্পিতভাবে জাতীয় মসজিদের খতিবকে অপসারণ করার চক্রান্ত করছে। তারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, জাতীয় মসজিদকে কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের আখড়া বানাতে দেওয়া হবে না।
খতিবের এই কঠোর মন্তব্যের জবাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত কৌশলী ও সহনশীল প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমকে বলেন: ‘আমরা এসব বিষয়কে অত্যন্ত উদারভাবে নিই। আলেম-ওলামাদের যেকোনো সমালোচনাকে আমরা আমাদের জন্য এক ধরণের দোয়া মনে করি।’
তবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নমনীয় সুর বজায় রাখলেও জামায়াতপন্থী সাধারণ আলেম-ওলামা ও সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশ খতিবের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। অনেক আলেম প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মতো বরেণ্য আলেমরাও কি তাহলে খতিবের দৃষ্টিতে পথভ্রষ্ট ছিলেন। জাতীয় মসজিদের মিম্বারে বসে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এই ধরণের বিভাজন তৈরি করা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও বিপজ্জনক বলে তারা মন্তব্য করছেন।
এই ঘটনায় সরাসরি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্য কোনো বিবৃতি না দিলেও দলটির অঙ্গ সংগঠন 'ওলামা দল' এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সরাসরি মাঠে নেমে খতিবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং কওমি আলেমদের একাংশের জামায়াতমুখী প্রবণতা রুখতেই ওলামা দল এই ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতকে আদর্শিক ও মানসিকভাবে চাপে রাখতে খতিবের এই বক্তব্যকে বিএনপি ও তার সমমনা ইসলামপন্থী দলগুলো একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
দেশের প্রবীণ ও বরেণ্য আলেমদের মধ্যেও খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের এই বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কওমি ধারার একাংশের আলেমদের মতে, মুফতি আব্দুল মালেক একজন আন্তর্জাতিক মানের হাদিস বিশারদ এবং হানাফি ফকিহ। তিনি দ্বীন কায়েমের ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কথা বলে হক্কানি আলেমের দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, নিরপেক্ষ ধারার অনেক আলেম মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে জাতীয় মসজিদের মতো সংবেদনশীল জায়গায় দাঁড়িয়ে কোনো নির্দিষ্ট ইসলামপন্থী দল বা সংগঠনকে 'গোমরাহ' বা 'পথভ্রষ্ট' আখ্যা দেওয়া ঠিক হয়নি। এটি দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আলেমদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়িকে আরও উসকে দেবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খতিবের এই একটি মন্তব্য কেবল ধর্মীয় বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী ভোটব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এক প্রকাশ্য লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। আজ বায়তুল মোকাররমে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তা যদি দ্রুত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে কওমি বনাম জামায়াতপন্থী আলেমদের মধ্যকার এই বাকযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি রাজপথকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।