ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ ক্যাম্পাস ]

টিউশনির বিকল্পে উদ্যোক্তা কুবির শিক্ষার্থীরা

পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসায় স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:৪৪, ৩ নভেম্বর ২০২৬
টিউশনির বিকল্পে উদ্যোক্তা কুবির শিক্ষার্থীরা
ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর মনে জাগে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছা। পরিবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্তত নিজের খরচটুকু নিজেই চালাতে চান তাঁরা। এ জন্য টিউশনিকে আয়ের সহজ ও পরিচিত মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেও কেউ কেউ হাঁটছেন ভিন্ন পথে। নিজের শখ, দক্ষতা আর সামান্য পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে ছাত্রজীবনেই শুরু করছেন ছোট ছোট ব্যবসা। কারও লক্ষ্য নিজের পড়ালেখার খরচ চালানো, কারও আবার ভবিষ্যতে বড় উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রেরণা।

হল কিংবা মেসের ছোট্ট কক্ষ, কখনো পড়ার টেবিলের এক কোণ থেকেই শুরু হচ্ছে উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা। কেউ ঘরে তৈরি খাবার ও শুঁটকি বিক্রি করছেন, কেউ তাজা সবজি ও মাছ-মাংস কেটে রান্নার উপযোগী করে পৌঁছে দিচ্ছেন ক্রেতাদের দরজায়। আবার কেউ বই, পোশাক, ক্যালিগ্রাফি কিংবা কাস্টমাইজড হস্তশিল্প নিয়ে গড়ে তুলছেন নিজের স্বপ্নের উদ্যোগ। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পণ্যের পরিচিতি বাড়িয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তারা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের পথচলা সব সময় সহজ নয়। ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততা, সীমিত পুঁজি, পণ্য তৈরি ও সরবরাহের ঝামেলার মধ্যেও থামেনি তাঁদের যাত্রা। কীভাবে শুরু হলো তাঁদের এই উদ্যোগ, ক্রেতাদের কাছে কীভাবে পরিচিতি পাচ্ছেন, কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন আর ভবিষ্যৎ নিয়েই-বা কী স্বপ্ন দেখছেন—এসব নিয়েই তাঁদের পথচলার গল্প।

ক্লাসরুমের অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ‘রিয়েল টেস্ট’

ক্লাসের একটি অ্যাসাইনমেন্ট থেকেও যে বাস্তব ব্যবসার সূচনা হতে পারে, তারই উদাহরণ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের দুই শিক্ষার্থী তাসনিম কাদের ইরফান ও রাকিব ইসলাম। ‘প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং-২’ কোর্সের ‘নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে তাঁরা বিচার-বিশ্লেষণ করেন বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যের বাজার সম্ভাবনা। সেখান থেকেই টেকনাফ ও কক্সবাজারের শুঁটকি নিয়ে তাঁরা গড়ে তোলেন ‘রিয়েল টেস্ট’ নামের অনলাইন ব্যবসা। বর্তমানে লইট্টা, ছুরি, কাচকি, মলা, পোয়া ও ফাইসা শুঁটকি মানসম্মতভাবে মোড়কজাত করে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা।

উদ্যোগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইরফান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু শুঁটকি বিক্রি করা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে মানসম্মত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে তা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আমরা ভালো সাড়াও পেয়েছি। তাঁদের কেনাকাটা ও আস্থা আমাদের এই উদ্যোগকে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ইরফান বলেন, “ভবিষ্যতে শুঁটকির পাশাপাশি মানসম্মত মসলার গুঁড়া ও সরিষার তেল আমাদের পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন পণ্য যুক্ত করার আগে শুঁটকির মাধ্যমে অনলাইনে রিয়েল টেস্টের পরিচিতি বাড়ানো ও ক্রেতাদের আস্থা অর্জনকেই আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, একটি ক্লাসরুমের ধারণাও বাস্তব উদ্যোগে রূপ নিতে পারে, যদি সেটি বাস্তবায়নের সাহস, শেখার মানসিকতা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা থাকে।”

কাজের স্বাধীনতায় ‘কুবি মার্ট’

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষেই উদ্যোক্তার খাতায় নাম লিখিয়েছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বৃষ্টি। শিক্ষার্থীদের রান্নার প্রস্তুতি সহজ করতে ‘কুবি মার্ট’ নামে অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন তিনি। টিউশনির নির্দিষ্ট সময় ও বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে নিজের সুবিধামতো কাজ করার স্বাধীনতা থেকেই ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে বৃষ্টি বলেন, “আসলে টিউশনিতে ওইভাবে স্বাধীনতা থাকে না। একদম নির্দিষ্ট সময়ে যেতেই হয়। এমনকি শরীর খারাপ বা অসুস্থ থাকলেও অনেক সময় ছুটি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু অনলাইন ব্যবসায় নিজের মতো করে সময় ব্যবস্থাপনা করা যায়।”

ব্যবসার কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বৃষ্টি বলেন, “যেহেতু আমরা প্রি-অর্ডার নিয়ে থাকি, তাই অর্ডারের ওপর ভিত্তি করে বাজার করি এবং পণ্য ডেলিভারি দিয়ে থাকি। আমরা শুধু শাকসবজি দিয়ে আমাদের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। তারপর মুরগির কম্বো, পরবর্তীতে মাছের কম্বো নিয়ে এসেছি আমাদের কাস্টমারদের জন্য। ভবিষ্যতেও আরও পণ্য যুক্ত করা হবে, ইনশাআল্লাহ।”

আপাতত উদ্যোগটি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য যুক্ত করতেই বেশি মনোযোগী তিনি।

বইয়ের টানে ‘কুবি বুকশপ’

শুধু খাবার কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, বইয়ের প্রতি ভালোবাসাকেও ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইদুল হাসান। বই পড়া ও লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা থেকে ২০২৩ সালে ‘কুবি বুকশপ’ চালু করেন তিনি। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সহজে ও কম দামে বই সংগ্রহের সুযোগ করে দিতেই তাঁর এই উদ্যোগ। বর্তমানে ক্যাম্পাসে বিনা ডেলিভারি চার্জে বই সরবরাহের পাশাপাশি অনলাইনে সারা দেশেও বই পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।

সাইদুল হাসান বলেন, “আমি মূলত স্বাধীন পেশায় যুক্ত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। পড়াশোনা করে যে আমাকে চাকরি করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভবিষ্যতে বুকশপের পরিসর আরও বাড়িয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমি প্রতিনিয়ত বই উপহার ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকি।”

তবে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতার মুখেও পড়তে হচ্ছে তাঁকে। এ বিষয়ে সাইদুল বলেন, “আমি যেহেতু শিক্ষার্থী, সেক্ষেত্রে পড়াশোনার পাশাপাশি এই ব্যবসা চালানো কিছুটা কষ্টসাধ্য। তবে আমি চেষ্টা করি ভারসাম্য বজায় রাখতে। এ ছাড়া কুমিল্লায় বসে ঢাকা থেকে সারা দেশে বই সরবরাহ করতেও কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যবসার লাভের ছোট একটি অংশ দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছি।”

নিজের পরিচয়ের খোঁজে ‘কারুশৈলী’

পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার ইচ্ছা থেকে উদ্যোক্তা হয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা সুলতানা চৈতী। টিউশনির বিকল্প হিসেবে নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ‘কারুশৈলী’ নামে হাতে তৈরি পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ছোট পরিসরে শুরু করা উদ্যোগটি ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে পরিচিতি পাচ্ছে।

উদ্যোগটির শুরু নিয়ে চৈতী বলেন, “আমার নিজের ইচ্ছা ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করা, নিজের মতো করে কিছু শুরু করা। সেই ভাবনা থেকেই টিউশনির পরিবর্তে আমি কারুশৈলী নিয়ে কাজ শুরু করি। প্রথম অর্ডার পাওয়ার আনন্দ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রতিটি কাস্টমারের আগ্রহ ও বিশ্বাস আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়।”

হাতে তৈরি পণ্যের মূল্যায়ন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে হ্যান্ডমেড প্রোডাক্ট মানে শুধু একটা জিনিস তৈরি করা নয়—এর পেছনে অনেক সময়, পরিশ্রম, ধৈর্য ও যত্ন জড়িয়ে থাকে, যা অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে না। তবুও আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসা ও যত্ন নিয়ে কাজ করে গেলে একদিন কারুশৈলী আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবে, ইনশাআল্লাহ।”

ক্লাস-পরীক্ষার চাপ এবং সীমিত পুঁজি সত্ত্বেও কুবির এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো শিক্ষার্থীদের কেবল আত্মনির্ভরশীলই করছে না, বরং ক্যাম্পাসের অন্যদের মাঝেও স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। নিজেদের পড়ালেখার খরচ জোগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বড় পরিসরে ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন বুনছেন এই তরুণ উদ্যোক্তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কুবি/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!