ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

ডাইনি ভেবে পোড়ানো হয়েছিল তার দেহ, তিনিই এখন জাতীয় প্রতীক

সাতরং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৩, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
ডাইনি ভেবে পোড়ানো হয়েছিল তার দেহ, তিনিই এখন জাতীয় প্রতীক
ফাইল ছবি

১৯ বছরে পা দেওয়া এক তরুণীকে পোড়ানোর আয়োজন শেষ হয়েও যেন শেষ হলো না! সারাজীবনে ১৩টি যুদ্ধে অংশ নেয়া সেই তরুণী মানুষের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন না। ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী তরুণী যিশুকে স্মরণ করতে করতে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন সবার সামনে। তার সঙ্গে পোড়ানো হলো আরো দুই-চারটি কালো বিড়াল। তারপর সেই ছাই গুছিয়ে নিয়ে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার পোড়ানো হয়। পুড়ে যাওয়া সেই অদম্য, যোদ্ধা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দেশপ্রেমী তরুণীর নাম জোন অব আর্ক।

ফ্রান্সের উত্তর পূর্বে মিউজ নদীর তীরে একটি ছোট্ট গ্রাম ডমরেমি। সেই গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন জোন অব আর্ক। বাবা জ্যাক দি আর্ক ছিলেন ধনী কৃষক, কর আদায়ের কাজও করতেন। তার মা ইসাবেল রোমিই ছিলেন গৃহিণী। ধার্মিক ছিলেন জোয়ান। জোয়ানের বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে ফ্রান্স ছিল ইংরেজদের শাসনাধীন।

জোন লেখাপড়া জানতেন না। কথিত আছে, মাত্র তের বছর বয়সেই মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের প্রকৃত রাজাকে ক্ষমতায় পূনর্বহাল করার জন্য তিনি ছিলেন মরিয়া। ১৩৩৭ সালে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড অবৈধভাবে ফ্রান্সের সিংহাসন দাবী করে বসেন। এতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে ফরাসিরা ইংরেজদের কাছে বার বার পরাস্ত হতে থাকে। ১৪১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম হেনরী এক যুদ্ধে ফরাসীদের পরাজিত করে ফ্রান্স দখল করে নেন।

Advertisement

এর ফলে ১৪২৮ সাল নাগাদ ফ্রান্স কয়েক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সে সময়টায় ফ্রান্সে জাতীয় ঐক্য বলে কিছু ছিল না। শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়। রাজা চার্লসের শাসনব্যবস্থা ছিল দূর্বল। ফ্রান্সজুড়ে একটি প্রচলিত ভবিষ্যৎবাণী ছিল ‘এক কুমারী মেয়ে এসে ফ্রান্সকে রক্ষা করবে’।

১৪২৮ সালের ঘটনা। জোয়ান গেলেন রাজা চার্লসের সেনা কমান্ডার রবার্ট রড্রিকটের কাছে। জানালেন তিনি যুদ্ধ করতে চান। এতে কমান্ডার রবার্ট ক্ষিপ্ত হন। কারণ তখন নারীদের জন্য যুদ্ধে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। তাই সামন্ত ডেকে সে সময় জোয়ানকে বাড়ি পাঠান তিনি। নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যান জোয়ান কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন, ‘অরলিন্সের যুদ্ধে হেরে যাবে ফ্রান্স’। সঠিক হয় সেই ভবিষৎবাণী।

ফলে রবার্টের চিন্তায় প্রভাব ফেলে জোন অব আর্ক। পরবর্তীতে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি পান জোন। অবশ্য রাজার কাছে যাওয়ার আগে জোয়ানের চুল ছেঁটে ফেলা হয় আর পরানো হয় ছেলেদের পোষাক। অনুমতি পেয়ে সাদা ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধে যান জোন, সঙ্গী চার হাজার সৈন্য। তার ব্যানার ছিল যীশুর নাম। সে সময় মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী জোন অব আর্ক!

১৪২৯ সালের ২৮ এপ্রিল অবরুদ্ধ নগরী অরল্যান্ডে প্রবেশ করেন জোন আর তার সৈন্যবাহিনী। পুরোনো রক্ষণাত্মক কৌশল বদলে আক্রমণাত্বক কৌশল অবলম্বণ করেন জোন। এতে করে লাভ করেন কাঙ্ক্ষিত বিজয়। অরল্যান্ডকে মুক্ত করার পর একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেন জোন। আর খুব দ্রুতই তার বিজয়গাঁথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

মে মাসের দিকে ইংল্যান্ডের দখল করা লে তুরেলে দুর্গ অবরোধ করে ফ্রেঞ্চ বাহিনী। সে যুদ্ধে একটি তীর এসে বিঁধে জোনের কাঁধে। আহত হলেও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ দৃশ্য দেখে ফরাসী বাহিনী নব উদ্যমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ইংল্যান্ড যুদ্ধে হেরে যায়। দুর্গ চলে আসে ফ্রান্সের কাছে আর ইংরেজদের কবল থেকে তুরেল বুরুজ শহর মুক্ত হয়। এরপর পাতের যুদ্ধ ও রেইমস নগরী জোনের নেতৃত্বে ফ্রান্সের দখলে চলে আসে। ধীরে ধীরে পুরো ফ্রান্সই ইংরেজ দখলমুক্ত হয়। পরবর্তীতে রেইমস নগরীতেই ফ্রেঞ্চ রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। 

যেদিন রেইমস নগরী ফ্রান্সের দখলে চলে আসে তার পরদিনই ‘ভবিষ্যৎ রাজা’ চার্লসের মাথায় মুকুট পরানো হয়। জোনের অসামান্য সাহসিকতা আর বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেওয়া হয় তাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও তার মেধা এবং অসাধারণ বীরত্ব তাকে করে তোলে আলাদা।

১৪৩০ সালে প্যারিস পুনরুদ্ধার অভিযানের সময় এক বসন্তে অ্যাংলো বারগুন্ডিয়ানরা বন্দি করে ফেলে জোন অব আর্ককে। তারা তাকে মহাধুমধাম করে রুয়েনের ইংরেজ সেনাপতির দখলে থাকা বুভরিউইলের দুর্গে নিয়ে যায়।

ইংরেজরা জোন অব আর্ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নতুন কৌশল অবলম্বণ করে। যা বিচারের নামে প্রহসনে রূপ নেয়। সীন নদীর তীরে ব্যস্ত লোকালয় রোয়াঁর বাজারে উইঞ্চেস্টারের কার্ডিনালের আদেশে তাকে তিনবার পোড়ানো হয়। কালো জাদুর সহায়তায়ই এই নারী ইংলিশদের পরাজিত করেছে। একে সরিয়ে দিলেই ইংলিশ বাহিনীর আর কোনো বাধা নেই- এই বিশ্বাসটা সকলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চায় তারা। তারপর এক ইংরেজ পাদ্রির অধীনে তার বিচারকাজ চলে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে 'ডাইনি' সম্বোধন করা হয়।

বিচারে রায় হলো জোনকে পুড়িয়ে মারার। সে রায় কার্যকরও করা হলো। আলোর পোশাক পরা সন্তরা কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি সেদিন। তার মর্মভেদী আহ্বান ‘সেইন্ট মাইকেল! আজ তুমি কোথায়?’ কেউ শোনেনি সেদিন! শুনতে চাইনি তারা। মিথ্যা দোষারোপ ও প্রহসনমূলক বিচারের শেষে মাত্র ১৯ বছর বয়সী জোন অব আর্ককে খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। 

মৃত্যুর ২৫ বছর পর তৎকালীন পোপ তাকে নিরপরাধ ঘোষণা করেন, শহীদের মর্যাদা দেন এবং এর সাড়ে তিনশো বছর পর তিনি ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন। 

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেছিলেন, পুড়ে মরার সময় জোন প্রাণভিক্ষা চাননি, শুধু একমনে যিশুকে ডেকে গেছেন। এমন একজন ধর্মপ্রাণ রোমান ক্যাথলিককে ক্যাথলিক চার্চই পুড়িয়ে মারার আদেশ দিয়েছিল, সেই একই চার্চ ৪৯০ বছর পর জোনকে সন্ত ঘোষণা দিয়েছে। তার স্মৃতি বহন করে নিউ অরলিন্সের ডেকাতুর স্ট্রিটে জোন অফ আর্ক মনুমেন্ট রয়েছে। যা তার দৃঢ়তার প্রতীক স্বরূপ স্মৃতিসৌধ হিসেবে বিবেচিত।


সূত্র: হিস্ট্রি.কম, উইকিপিডিয়া এবং  স্কটমেনিং.কম
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!