ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ভুয়া চিকিৎসকের ওষুধ সেবনে রোগী ‘পাগলপ্রায়’

রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৩১, ১৭ অক্টোবর ২০২১
ভুয়া চিকিৎসকের ওষুধ সেবনে রোগী ‘পাগলপ্রায়’
বেসরকারি হেপ্টা হেলথ কেয়ারে রোগী দেখতেন ভুয়া মানসিক চিকিৎসক মোয়াজ্জেম হোসেন

চা পান করার পরক্ষণেই ‘চা দাওনি’ বলে স্ত্রীর সঙ্গে ঝামেলা করতেন সঞ্জীব রায়। বাধ্য হয়ে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন স্ত্রী। চিকিৎসকের ওষুধ সেবন করার পর দুইদিন অচেতন হয়েছিলেন সঞ্জীব রায়। যখন চেতনা ফিরে এলো- তখন থেকেই উন্মাদের মতো আচরণ শুরু করলেন।

স্ত্রী কল্পনা রায় বুঝলেন স্বামী সঞ্জীব রায়ের ভুল চিকিৎসা হয়েছে। তিনি মামলা করলেন। তদন্তে জানা গেল, মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে বাবু নামে ঐ চিকিৎসকের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে যে পাঁচটি ডিগ্রি আছে তার কোনো সনদ নেই। অথচ তিনি রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন রোগী দেখেছেন।
 
নামের পাশে এমবিবিএস, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সিলর, পিজিটি (সাইকিয়াট্রি, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ইউএসএস), ইউএসএমএলই (আমেরিকা), এমডি (সাইকিয়াক) আমেরিকা, মানসিক, মাদকাসক্ত এবং সাইকো-সেক্স (যৌন) থেরাপিস্ট পদবী ব্যবহার করতেন মোয়াজ্জেম হোসেন। আর চিকিৎসক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখতেন এ-৪০০৫৮।

মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে চিকিৎসায় নিয়ে প্রতারিত সঞ্জীব রায়ের বাড়ি রাজশাহী নগরীর রানিবাজার এলাকার বাসিন্দা। তার স্ত্রী কল্পনা রায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি। তিনি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে রাজশাহী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছিলেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দিয়েছিল। তদন্ত শেষে গত ৭ অক্টোবর রাজশাহী মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন পিবিআইয়ের এসআই দেলোয়ার হোসেন।

Advertisement

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তদন্তকালে বারবার চেষ্টা করেও তিনি চিকিৎসক মোয়াজ্জেম হোসেনের সাক্ষাৎ পাননি। একদিন শুধু ফোনে পেয়েছিলেন। পরে ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে পাওয়া গেছে- ফোনের সিমটিও চিকিৎসকের নিজের নয়। নাটোরের গুরুদাসপুর থানার নওপাড়াহাট এলাকার জনৈক আরিফুল ইসলামের নামে সিমটি নিবন্ধিত। সেখানে যোগাযোগ করে এই আরিফুলেরও খোঁজ পাননি।

এসআই দেলোয়ার হোসেন জানান, এমবিবিএস ডিগ্রি ছাড়া তার নামের পাশের লেখা কোনো ডিগ্রির বিপরীতে সনদ পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে রোগীর সঙ্গে প্রতারণা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার বাদী কল্পনা রায় জানান, তার স্বামী ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যান। এই নিয়ে তাকে ঝামেলায় পড়তে হয়। এছাড়া তার আর অন্য কোনো সমস্যা ছিল না। আত্মীরা পরামর্শ দিলেন হয়তো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে দেখালে এটা ঠিক হয়ে যেতে পারে। প্রথমবার ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল হেপ্টা হেলথ কেয়ারে ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে নিয়ে যান। তার ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ানোর পর কল্পনার স্বামীর দুইদিন জ্ঞান ছিল না। পরে চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি উন্মাদের মতো হয়ে গেছেন।

এরপর ২৩ মার্চ আবারো তাকে ডা. মোয়াজ্জেমের কাছে নিয়ে গেলে আরো একটি ওষুধ যোগ করেন এবং সে ওষুধে উন্নতি না হওয়ায় কল্পয়ার স্বামীকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন ডা. মোয়াজ্জেম। তবে কল্পনা রায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে না নিয়ে শহরের আরেকজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন- ডা. মোয়াজ্জেমের ব্যবস্থাপত্রে তিন ধরনের ঘুমের ওষুধ ছিল, যা সম্পূর্ণ ভুল চিকিৎসা। দ্বিতীয় চিকিৎসকের ওষুধ সেবনে কল্পনার স্বামী অনেকটা সুস্থ হন।

ঐ ঘটনায় প্রথমে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করেন কল্পনা রায়। সে মামলার শুনানির জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও মোয়াজ্জেম হোসেন হাজির হননি। সেই মামলা তদন্ত প্রতিবেদনসহ আদালতে মামলা করেন কল্পনা রায়। পিবিআইয়ের তদন্তেও মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি রাজবাড়ী সদরের ভবানীপুর রেলওয়ে কলোনীতে। তিনি বর্তমানে রাজশাহী নগরীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় থাকেন। তার বাবা আলী আকবর দাবি করেছেন, দুই বছর ধরে ছেলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। ছেলের ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারের বিষয়েও কিছু জানেন না তিনি।

আরো জানা গেছে, মোয়াজ্জেম হোসেন রাজশাহীর বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। হাসপাতালটির পরিচালক ডা. সুজিত ভদ্র বলেন, প্রথমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে জানা গেল, তার সব ডিগ্রি ভুয়া। সে কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!