ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

হাতের মধ্যেই অনেকে প্রাণ হারান, কেউ কেউ চোখ বড় করে তলিয়ে গেল

নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:২৪, ৬ মার্চ ২০২২
হাতের মধ্যেই অনেকে প্রাণ হারান, কেউ কেউ চোখ বড় করে তলিয়ে গেল
ইনসেটে ইউসুফ মৃধা

মাত্র ২৫ জনের ধারণক্ষমতার বোট। তবু ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জনকে। আবহাওয়াও ভালো ছিল না। দেওয়া হয়নি লাইফ জ্যাকেটও। পথেই বোট থেকে পড়ে যান এক যাত্রী। তাকে তুলতে গিয়ে উল্টে ডুবে যায় বোট। একে একে পানিতে পড়ে ভাসতে থাকেন সবাই। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর লবণাক্ত পানি খেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন অনেকে। তবু বাঁচার চেষ্টা ছিল তাদের। কিন্তু অনেকেই চোখের সামনে প্রাণ হারান।

এভাবেই ইতালি যাওয়ার পথে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক বর্ণানা দিয়েছেন ২৯ বছর বয়সী ইউসুফ মৃধা। তিনি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের খোরশেদ মৃধার ছেলে।

তবে ইউসুফ মৃধার বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক বর্ণানা নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন সৌদি প্রবাসী সৈয়দ মোকতাদির ইসলাম। স্ট্যাটাসটি শনিবার বিকেল থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ফেসবুকে।

যেখানে লেখা ছিল, মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরলেও আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে সহযাত্রী ও বন্ধুদের মৃত্যু। ২৫ জনের ধারণ ক্ষমতার বোটে সেদিন উঠেছিলেন ৩৭ জন। শনিবার রাতে সৌদি প্রবাসী সৈয়দ মোকতাদির ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে বেঁচে ফেরা ইউসুফ মৃধার কথা।

সৌদি প্রবাসী সৈয়দ মোকতাদির ইসলাম বলেন, আমার বন্ধু ইউসুফ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে প্রায় এক মাস নিখোঁজ থেকে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন। তিনি এখন রাজধানীর হাজী ক্যাম্পে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। তার সঙ্গে মুঠোফোনে আমার কথা হয়েছে। তিনি যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেছি।

মুঠোফোনে ইউসুফ মৃধা বলেন, ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লিবিয়া থেকে আমাদের বোট ছাড়ে। আবহাওয়া ভালো ছিল না। বোটে ধারণ ক্ষমতা ছিল ২৫ জনের। সেখানে দুজন চালকসহ ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জনকে। দুই ইঞ্জিনের বোট দেওয়ার কথা থাকলেও বোটে ইঞ্জিন ছিল একটি। আমাদের কোনো সেফটি জ্যাকেটও দেয়নি। কারণ লাইফ জ্যাকেট দিলে যাত্রী কম ধরবে। লিবিয়া থেকে রাত ৮টায় যাত্রা শুরু করে ভোর ৩টার দিকে আমরা পৌঁছাই মাল্টার কাছাকাছি।

তিনি বলেন, এর মধ্যেই একজন বোট থেকে পানিতে পড়ে যান। সে বলছিল ‘আমাকে তোরা উঠাবি না?’ তখন আমরা সবাই বললাম ক্যাপ্টেনকে (নাবিক) তাকে নিয়ে নিতে। সাগর খুব উত্তাল থাকায় তাকে তুলতে গিয়ে বোট একদিকে কাত হয়ে যায় এবং বোটে পানি উঠতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের বোটটি উল্টে ডুবে যায়।

এরপর আমরা যে যেভাবে পেরেছি যেমন- তেলের গ্যালন এটা-ওটা ধরে সাঁতার কাটতে থাকি। কিছুক্ষণ পর বোটটি একটু দূরে ভেসে ওঠে। আমরা ১৫-২০ জন উল্টে যাওয়া বোটটি ধরি দুপাশ থেকে। ওই সময় অন্ধকারের কারণে দেখা সম্ভব ছিল না সেখানে কে আছে আর কে নেই। এ অবস্থায় প্রচণ্ড ঠান্ডা পানিতে ভাসতে থাকি কোনোভাবে। এর মধ্যে আমাদের শরীর বরফ হয়ে আসছিল। ঢেউয়ের কারণে একেকজন ছুটে যাচ্ছে বোট থেকে। চোখের সামনে হাতের মধ্যেই মৃত্যু হচ্ছে কারো কারো। লবণাক্ত পানি খেয়ে ফেলায় কয়েকজনের মুখ দিয়ে রক্ত আসছিল। আস্তে আস্তে অনেকে পানির নিচে চলে যাচ্ছিল আমাদের দিকে বড় বড় চোখ করে।

ইউসুফ বলেন, এমন করতে করতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা কেটে গেল। ২৮ জানুয়ারি বিকেল হয়ে গেছে। তখন বেঁচে ছিলাম আমরা মাত্র সাতজন। তখন অনেক দূর দিয়ে একটি টহল কোস্টগার্ডের বোট যাচ্ছিল। তারা দেখতে পায় আমাদের এবং উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর সাতজন থেকে রাশিদুল নামে একজনের মৃত্যু হয়। আমাদের ছয়জনকে অজ্ঞাত এক জেলখানায় তিনদিন রাখা হয়। তিনদিন পর আরেকটি জেলখানায় নেয়া হয়। সেখান থেকে ৩ মার্চ স্থানীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় দুজন দেশে ফিরেছি। অন্য চারজনও দ্রুতই দেশে ফিরবেন বলে শুনেছি।

মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরা ছয়জনের মধ্যে ইউসুফসহ দুজন বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরা অন্যজন ফরিদপুরের নগরকান্দার মো. ইউনুস শেখের ছেলে ১৮ বছর বয়সী শেখ সামিউল। বর্তমানে তারা রাজধানীর হাজী ক্যাম্পে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নরসিংদীর মোট ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তারা হলেন- রায়পুরার ডৌকারচরের নাদিম সরকার, আলমগীর সরকার, আল-আমিন ফরাজী, দক্ষিণ মির্জানগরের এসএম নাহিদ, আমিরগঞ্জের ইমরান মিয়া, আশিস সূত্রধর, সবুজ মিয়া, হাইরমারার শাওন মিয়া, সেলিম মিয়া ও বেলাব উপজেলার আল আমিন, নারায়ণপুরের মতিউর রহমান, সল্লাবাদের শরীফুল ইসলাম, সালাউদ্দিন, মো. হালিম, বিপ্লব মিয়া। বাকি ১৩ জন ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর ও সিলেট জেলার বাসিন্দা। তাদের নাম জানা যায়নি।

কথা হয় রায়পুরার হাসনাবাদ গ্রামের নিখোঁজ আল আমিন ফরাজীর ছোটবোন ইভা আক্তার ইতির সঙ্গে। তিনি বলেন, ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে বাংলাদেশের তিন দালাল তারেক মোল্লা, তার সহকারী রাজিব ও মনিরের ওপর ভরসা করে আমার ভাই গত নভেম্বরের শেষ দিকে বাড়ি থেকে যায়। আট লাখ দিয়েছি আগেই। বাকি দুই লাখ টাকা পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সর্বশেষ ফোনে কথা হয়েছে। বোটে উঠবে, দোয়া চেয়েছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই।

দালাল রাজিব ও তারেক বাংলাদেশ থেকে লোক জোগাড় করেন আর মনির লিবিয়া থেকে কাজ করেন বলে তিনি জানান। তাদের বাড়ি রায়পুরা উপজেলায়। নরসিংদীতে বাকি যারা নিখোঁজ তারা সবাই এ তিন দালালের মাধ্যমেই গিয়েছিলেন। দালালদেরও এখন খোঁজ নেই বলে জানান ইতি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!