ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলার ‘দাম উঠেছে’ ৫ লাখ টাকা

কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৮:৪৮, ১২ জানুয়ারি ২০২৩
গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলার ‘দাম উঠেছে’ ৫ লাখ টাকা
অভিযুক্ত গৃহকত্রী তাহমিনা তুহিন

গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে গরম পানি ঢেলে শরীর ঝলসে দেয়ার মামলায় কারাগারে আছেন গৃহকত্রী তাহমিনা তুহিন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে চলে আলোচনা সমালোচনা। কিন্তু এর ফাঁকেই মামলা তুলে নিতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন ওই নারীর স্বজনরা। এমন অভিযোগ করেছেন আহত গৃহকর্মীর মামা হাফেজ ইব্রাহিম খলিল। একইসঙ্গে জানান অবহেলা আর নির্যাতনের কথা। ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লায়।

তিনি বলেন, ভাগনির বাবা নেই। পরে আমরা তার মাকে অন্যত্র বিয়ে দেই। বিয়ের কিছুদিন পর পাশের বাড়ির এক লোক এসে আমাকে বলেন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ আবু তাহেরের মেয়ের বাচ্চাদের খেলার কোনো বন্ধু নেই। যদি আমার ভাগনিকে দেই তাহলে তারা বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করবে আর তাদের সঙ্গে পড়াশোনাও করবে। প্রথমে আমি রাজি হইনি। পরে ওই মেয়ে আসে এবং আমাদের অনুরোধ করে বলেন, আমার ভাগনিকে নিজের মেয়ের মত করে রাখতে চান। 

তিনি আরো বলেন, আর্থিক অনটনের পরিবারের বুকে পাথর বেঁধে ভাগনিকে দিয়ে দেই। দেওয়ার দুই তিন মাস আমার বোনের সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপর থেকে চার বছর সে কুমিল্লায়। কোনোদিন আমার সঙ্গে কথা হয়নি। শুনেছি আমার বোনের সঙ্গেও তার তেমন কথা হয়নি।

চার বছরে কোনোদিন ভাগনির সঙ্গে কথা বলতে চাননি এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম বলেন, আমার ভাগনি আমার কত কাছের, যারা আমাকে চেনেন তারা জানেন। আমি প্রতি সপ্তাহে কল দিতাম। ওই নারীর (তাহমিনা তুহিন) মেয়ে বলতো, আপনার ভাগনি কথা বললে কান্না করবে। তাই কথা বলতে দিতো না।

অবহেলা আর নির্যাতনে বর্ণনা দিয়ে তিনি করেন, আমার ভাগনির দাঁত নড়ে আবার বসে গেছে। সেই দাঁতের পাশে দাঁত উঠেছে। তার মাথার চুলে শ্যাম্পু-সাবান লাগাতে হবে, তাই তার মাথার চুল পুরো কেটে দিত। তার নোংরা জামাতেই চলতো বছর। চার বছর গ্রামের বাড়িতে তাহমিনা তুহিনের মেয়ে কতবার গিয়েছে। আমরা দৌড়ে তার বাড়িতে গেলেই সে বলতো, আপনাদের ভাগনিকে আনেনি। দুঃখ নিয়ে চলে আসতাম।

ভাবতাম ভাগনি আমাদের থেকেও ভালো আছে। কিন্তু সেদিন খবর পাই ভাগনি ভালো নেই। হাসপাতালে গিয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম ভাগনিকে শুধু সেদিনই মেরেছে। পরে তার পুরো শরীরে দেখি দাগ আর দাগ। অনেকগুলো পুরনো, আবার অনেকগুলো কয়েকদিন আগের।

কেনো তার শরীরে গরম পানি ঢেলেছে এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম বলেন, ওই ঘরের আরেকজন কাজের মহিলা ছিল। সে কোনো একটি অভিযোগ দেয়ায় ভাগনিকে তিনদিন তারা খাবার দেয়নি। পরে ভাগনি ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে রান্নাঘর থেকে চামুচে করে পাউডার দুধ নিয়ে খেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকে দুধ না খেতে দিয়ে চুলায় থাকা গরম পানি শরীরে ঢেলে দেয়। 

মামলা তুলে নিতে কোনো হুমকি আসছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মামলা করার আগে থেকেই টাকা দিয়ে তারা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। মামলার পরে আমাদের স্থানীয় নেতারা এসেছেন মিমাংসা করতে। প্রথমে এক লাখ টাকা দেবে বলেছে। আমি রাজি না হওয়ায় তা পাঁচ লাখ পর্যন্ত উঠেছে। গরিবের সংসার। না খেয়ে থাকবো কিন্তু ভাগনিকে যারা এত কষ্ট দিয়েছে, তাদের বিচার হোক। আমি আদালতের কাছে বিচার চাই।
 
ভাগনি এখন কেমন আছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শরীরের ব্যান্ডেজগুলো একবার চেঞ্জ করেছে ডাক্তার। তার অবস্থা আগের মতোই। এখনো শোয়ায় আছে। ডাক্তার বলেছে, সুস্থ হতে সময় লাগবে।’

এদিকে ৯ জানুয়ারি গ্রেফতার তাহমিনা তুহিনের জামিন নামঞ্জুর করেছে আদালত। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল উদ্দিন এ আদেশ দেন। 

কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আহমেদ সনজুর মোর্শেদ মিন্টু বলেন, ঘটনার পর মামলা করেন ওই গৃহকর্মীর মামা। পরে অভিযুক্তকে আমরা গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান।

তবে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবু তাহের বলেন, মেয়েটি আমাদের আত্মীয়ের মধ্যে। আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি দেবিদ্বারে তার বাড়ি। আমার স্ত্রী জানিয়েছেন, তাকে মারধর করেননি। সে পাপশে পিছলে পড়ে পায়ে একটু গরম পানি পড়েছে। পাশের হোস্টেলের একটি মেয়ে বিষয়টিকে বড় করেছে বলে দাবি করেন তিনি। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!