ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বগুড়ায় ঝুঁকিতে নিউ মার্কেট, উদাসীন কর্তৃপক্ষ

মাসুম হোসেন, বগুড়া
প্রকাশিত: ১৭:৩৯, ১৮ এপ্রিল ২০২৩
বগুড়ায় ঝুঁকিতে নিউ মার্কেট, উদাসীন কর্তৃপক্ষ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চার যুগেরও বেশি সময়ের পুরোনো খোলামেলা বৈদ্যুতিক তারে ঘেরা বগুড়া নিউ মার্কেট। মাঝে মধ্যেই ঝরে আগুন। একইসঙ্গে বাল্ব ও ফ্যানের সুইচগুলোও হয়ে উঠে গরম। বৈদ্যুতিক সংযোগ সংস্কারে নেই কোনো উদ্যোগ। বেশি টাকা খরচের ভয়ে ব্যবসায়ীরাও আসছেন না এগিয়ে। এতে শহরের সাতমাথার নিউ মার্কেট এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ আর হাজার হাজার প্রাণ ঝুঁকিতে আছে। কারণ এই মার্কেটে নেই আগুন নেভানোর সুযোগও। ফলে আগুন আতঙ্কের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা করছেন কেনাবেচা।

ব্যবসায়ীরা জানান, নিউমার্কেট এলাকায় হাজার দুয়েক দোকান রয়েছে। যেখানে ৫০ বছর আগে ছিল মাত্র ৩০০ দোকান। আগে মার্কেটে এসি ছিল না। আর এখন দোকানগুলোতে প্রায় ৭০০ এসি ব্যবহার হয়। এছাড়াও প্রতিটি দোকানে একটির বদলে এখন ১০-১৫টি বাল্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। 

তাদের অভিযোগ, সময়ের ব্যবধানে দোকান ও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লেও সংস্কার হয়নি বৈদ্যুতিক তারের। খোলামেলা পুরোনো তারের জঞ্জালই তাদের ভরসা। এমনকি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারগুলোরও রয়েছে অরক্ষিত। এছাড়াও নিউ মার্কেট এলাকাজুড়ে রয়েছে মাত্র তিনটি ট্রান্সফর্মার। তাও সেগুলো চলাচলের রাস্তার ওপর। যা যেকোনো মুহূর্তে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Advertisement

সরেজমিনে দেখা যায়, মার্কেটের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে চারপাশ ও ভেতরের গলিগুলোতে মাথার ৩-৪ ফুট ওপরেই বৈদ্যুতিক তারের জঞ্জাল। এছাড়া, মার্কেটের ভেতরের রাস্তাগুলো এতটাই অপরিসর যে সেখানে দমকলের গাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। দোকানপাটগুলোও একেবারে গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। শর্টসার্কিট অথবা অন্য যেকোনো কারণে একবার যদি বড় ধরনের অগ্নিসংযোগ ঘটে তাহলে মুহূর্তেই তা সমগ্র মার্কেটে ছড়িয়ে পড়বে।

ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, খোলামেলা বিদ্যুৎ তার নিয়ে উদ্বেগের কথা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। এরপরেও বিষয়টি তারা কর্ণপাত করছে না। নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে করতে গেলে অনেক টাকা খরচ হবে। ফলে কোনো ব্যবসায়ীই এগিয়ে আসছেন না।

অন্যদিকে নিউ মার্কেট নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য দিচ্ছে বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন। আগুনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এ মার্কেট। এর পাশাপাশি শহরের হকার্স মার্কেটও রয়েছে অগ্নি ঝুঁকিতে। মার্কেট দুটিতে আগুন লাগলে তা নিভানো সহজে সম্ভব নয়। আগুন নিয়ন্ত্রণের আগেই প্রাণ যাবে অসখ্য মানুষের। পরবর্তীতে যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তারাও ধোঁয়াতে শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে মারা যাবে বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বগুড়া স্টেশনের তথ্যমতে, তাদের কার্যালয় থেকে নিউ মার্কেটে পানিবাহী গাড়ি নিয়ে যেতে সবমিলে সময় লাগবে ২০ মিনিট। আর এই সময়ের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়বে পুরো মার্কেট এলাকায়। সেখানে আটকে পড়া অসংখ্য মানুষের প্রাণ যাবে আগুনে।  এছাড়াও নিউ মার্কেট অনেক ঘিঞ্জি এলাকা। মার্কেটের ভেতরে গাড়ি রেখে পানি ছিটানোও সম্ভব নয়। 

এছাড়াও পানির সংকট অসহায় করে তুলবে দমকলবাহিনীকে। কেননা, মার্কেটের আশেপাশে নেই কোন পানির উৎস। সেক্ষেত্রে স্টেশন থেকে পানি আনাই একমাত্র সমাধান।

তথ্যমতে, বগুড়ার ফায়ার স্টেশনে পানিবাহী দুটি গাড়ি আছে। এর একটিতে ৬ হাজার ও অন্যটিতে ৪ হাজার ৩০০ লিটার থাকে। স্টেশনে মাটির নিচে পাম্প দিয়ে পানি তোলা হয়। একটি গাড়িতে পানি ভরতে সময় লাগে ৮-১০ মিনিট। এরপরে মার্কেটে যেতে হবে। এক গাড়ির পানির ব্যবহার শেষে আবারো স্টেশনে আসতে হবে। পানি ভরে আবার মার্কেটে যেতে হবে। এভাবে বারবার স্টেশন থেকে পানি নিয়ে আসা-যাওয়া করতে করতেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে মার্কেট এলাকা।

নিউ মার্কেটে এখন পর্যন্ত পাঁচবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ মার্কেটে আগুনের ঘটনা প্রথম ঘটে ১৯৯৭ সালে। এরপর ২০০৬, ২০১৭, ২০২০ ও ২০২১ সালে। এরমধ্যে ২০১৭ সালে এই মার্কেটের রনি ক্লথ স্টোরে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৪০টি দোকান। আর ২০২০ সালে ববি টেইলার্সে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ ২০২১ সালে এক জুয়েলারি দোকানে আগুন লাগে। এ পাঁচবারই আগুনের সূত্রপাত ঘটে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। দোকানের ক্ষয়ক্ষতি হলেও প্রাণহানি ঘটেনি। কারণ ওই পাঁচবারই রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। 

নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মার্কেটের দোকানভেদে ৫-১৪ জন পর্যন্ত কর্মচারী আছেন। ঈদের সময় দোকানগুলোতে মালিকরাও থাকেন। বগুড়াসহ আশপাশের জেলার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিনই নিউ মার্কেট এলাকা থেকে কেনাকাটা করেন। এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাবেন।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশনিউ মার্কেটের বড় মসজিদ লেন দোকান মালিক সমিতির দফতর সম্পাদক কামরুল বাতেন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বছর সাতেক হলো মার্কেটের বৈদ্যুতিক তারগুলো থেকে আগুন ঝরা শুরু হয়েছে। এছাড়াও অতিরিক্ত লোডের কারণে অনেক সময়ই তার লাল রং ধারণ করে থাকে। আমরা খুব ঝুঁকিতে আছি। যেকোনো মুহূর্তে জীবন হারানোসহ বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হবে।

তিনি আরও বলেন, অগ্নিঝুঁকি থেকে রক্ষার লক্ষ্যে মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী দোকানে অগ্নি-নির্বাপক যন্ত্র রাখতে শুরু করেছেন। তবে এর মাধ্যমে আগুনের ক্ষতি থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। কারণ পুরোনো বৈদ্যুতিক তার সংস্কার না করা পর্যন্ত ঝুঁকি কাটবে না। অথচ এ বিষয়ে নেসকো কর্তৃপক্ষ উদাসীন। ব্যক্তিগত খরচে বৈদ্যুতিক লাইন সংস্কার করতে অনেক টাকা লাগবে বলে ব্যবসায়ীরাও বিষয়টা এড়িয়ে যায়।

একই কথা বলেন নিউ মার্কেটের বড় মসজিদ লেন দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েতুল কিয়াস। তিনিও পুরোনো বৈদ্যুতিক তার সংস্কারের দাবি জানান।

জানতে চাইলে নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মন্নাফ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, নিউ মার্কেট এলাকা শুধু পুরোনো বৈদ্যুতিক তারের কারণে নয়, এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ওই মার্কেট পুরোটাই ঘিঞ্জি এলাকা, অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে সব স্থাপনা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ। সেখানে কিছুদিন পরপরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আমাদের উচিত সেখানকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বগুড়ার সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আব্দুল হালিম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বগুড়া শহরের কোথাও আগুন নেভানোর মতো পানির উৎস নেই। শহরের ভেতরে করতোয়া নদী থাকলেও তা কোনো কাজে আসবে না। কারণ করতোয়ায় সারাবছর পানি থাকে না। এছাড়াও শহরের ভেভরে এই নদীর তীরে পাম্প বসানোর জায়গাও (সিঁড়ি) নেই।

তিনি আরও বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য শহরে নিউ মার্কেট ও হকার্স মার্কেট এলাকায় একটি করে পানির রিজার্ভার স্থাপন করা দরকার। রিজার্ভার থাকলে মার্কেট দুটি আগুন লাগলে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। নয়তো শুধু ধোঁয়াতেই অনেক মানুষ মারা যাবেন। 

আগুনের ঝুঁকি এড়াতে মার্কেট বা বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে অবশ্যই অন্তত ২০ ফুট চওড়া রাস্তা রাখতে হবে। এতে পানিবাহী গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এই কর্মকর্তা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
ট্যাগ: ঝুঁকি বগুড়া
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!