ঝালকাঠিসহ পাশের জেলাগুলোতে বিভিন্ন জাতের সবজি পাঠাচ্ছেন এ জেলার কৃষকরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কৃষি কাজে তৎপরতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করছেন। ঝালকাঠি জেলার ৪ উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে এখনই পাওয়া যাচ্ছে শীতকালীন শাক-সবজির চারা। জাত ভেদে সবজির চারার দামও ভিন্ন ভিন্ন। পেশাদার কৃষক-কৃষাণী ছাড়াও শৌখিন অনেকে শখেরবসে ছাদ কৃষি ও আঙিনা কৃষি করছেন।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ও কির্ত্তিপাশা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, সবুজে সবুজে ভরে উঠছে মাঠ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে সারি সারি শিমগাছ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, বেগুন, মুলা, করলা, পটোল, পালং ও লালশাকসহ রকমারি শীতকালীন সবজির চারা। তাই মাঠে মাঠে এসব ফসল পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণীরা।
.png)
কাকডাকা ভোরে কোদাল, নিড়ানি, বালতি, স্প্রে মেশিন ইত্যাদি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ছেন সবজি পরিচর্যায়। বিকেল পর্যন্ত মাঠে থেকে চারার গোড়ায় পানি ঢেলে সবাই বাড়ি ফিরছেন। তাদের কেউ দাঁড়িয়ে কোদাল চালাচ্ছেন, অনেকেই গাছের গুঁড়ির পাশ দিয়ে ঘোরাচ্ছেন নিড়ানি। কেউবা খালি হাতেই গাছগুলো ঠিক করছেন। কেউ আবার নেতিয়ে পড়া চারার স্থলে সতেজ চারা প্রতিস্থাপন করছেন। এভাবে শীতকালীন সবজি নিয়ে চলছে কৃষকের কর্মযজ্ঞ।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার ৩৬ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিবছরই শীতকালীন সবজির চাষ করা হয়। পুরুষের পাশাপাশি এ সবজি চাষে বিপ্লবে স্বতঃস্ফূর্ত অবদান রাখছেন নারীরা। এর মধ্যে সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে ১২ মাসই সবজির চাষ হয়। এখানে সম্মিলিতভাবে নারী-পুরুষ মাঠে চাষবাস করেন। পুরুষরা তাদের সঙ্গে সহায়তা করেন এবং বাজারজাতের কাজ করেন। এসব এলাকার পাঁচ হাজার পরিবার এখন সবজি চাষ করে তাদের জীবিকা চালান।
কৃষি বিভাগ এই সবজি চাষে উৎসাহ দেওয়ার জন্য কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সদর উপজেলায় রবি মৌসুমে তিন হাজার একশ হেক্টর জমিতে এবং গ্রীষ্মকালীন সময় ১২০০ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়ে থাকে। রবি মৌসুমে ৪৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন এবং গ্রীষ্মকালীন সময় ১৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন হয় হয়। যা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
কীত্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলি গ্রামের সবিতা রানী হালদার বলেন, একসময় গ্রামগুলোয় নারীরা এত কাজ করতেন না। তখন পেয়ারা, নারকেল, সুপারি আর সামান্য ধান আবাদ হতো। সেসময় প্রায় প্রতিটি ঘরেই অভাব ছিল। কিন্তু এখন পুরুষের পাশাপাশি নারীরা মাঠে কাজ করেন। এ কারণে ১২ মাস গ্রামগুলোয় সবজি চাষ হয়। অভাবও ঘুচে গেছে আমাদের গ্রামের চাষিদের।
রাজাপুরের শুক্তাগড় গ্রামের মাহিনুর বেগম জনান, গতবছর তিনি এক একর জমিতে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন শাক ও সবজি পেয়েছেন। পাইকারি বিক্রি করে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় হয়েছে তার।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গ্রামগুলোর উৎপাদিত শাক-সবজি জেলার চাহিদা পূরণ করে ঢাকা ও বরিশালে চালান হচ্ছে। পদ্মাসেতুর সুবাদে এখন গ্রাম ঘুরে ঘুরে পাইকাররা ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহ করে চালান করেন বড় বাজারে।
সদর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের কৃষক নারায়ন মিস্ত্রি বলেন, সবজি চাষের জন্য খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। মূলধনও কম লাগে। পরিশ্রমও অনেক কম। তবে সেবায় ক্রটি করা যাবে না। রোগবালাই দমনে সবজিতে কীটনাশক বেশি প্রয়োগ করতে হয়। স্বল্প সময়েই সবজি বিক্রি উপযোগী হয়ে ওঠে। প্রায় দিনই বাজারে সবজি বিক্রি করা যায়। পরিবারের চাহিদাও মেটানো সম্ভব হয়।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, এবার শীতকালীন শাকসবজিসহ সবরকমের ফসলের ভালো ফলন হচ্ছে। প্রান্তিক চাষিদের মাঝে শীতের শাক-সবজির মানসম্পন্ন বীজ এবং সার দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ এবং উৎপাদন হবে।
তিনি আরো বলেন, গ্রামগুলোতে কৃষক-কৃষাণীদের প্রণোদনা ও পরামর্শ দেওয়াসহ নানাভাবে কৃষি বিভাগ সহযোগিতা করে আসছে। কৃষিক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা আরো মজবুত হচ্ছে।