ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বিমান-মর্টার শেলের শব্দে ফের কাঁপছে টেকনাফ 

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:৫১, ৭ মার্চ ২০২৪
বিমান-মর্টার শেলের শব্দে ফের কাঁপছে টেকনাফ 
ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে দেশটির স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) যুদ্ধ চলছে। এরমধ্যে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে টানা এক সপ্তাহ ধরে গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণ হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৫ মার্চ) সন্ধ্যায় ৬টা থেকে বুধবার (৬ মার্চ) ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রাখাইনের শহর মংডু শহরের উত্তরে কুমিরখালী, বলি বাজার, নাকফুরা, নাইচাডং, কোয়াচিডং, কেয়ারিপ্রাং, পেরাংপ্রুসহ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণ শোনা যায়। ফলে টেকনাফ পৌর শহর, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন; নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। বুধবার বিকেল ৪টায় হোয়াইক্যং সীমান্তে খারাংখালী থেকে ওপারে বিমান ও হেলিকপ্টার উড়তে দেখা যায়। 

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, আরাকান আর্মিকে লক্ষ্য করে কয়েকদিন ধরে মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে সরকারি বাহিনী। পাল্টা গুলি ছুড়ে জবাব দিচ্ছে আরাকান আর্মি। দুই পক্ষের তুমুল লড়াই এবং শক্তিশালী গ্রেনেট, বোমা ও মর্টার শেলের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে মংডুর দক্ষিণাংশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থলপথে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর টহল সীমিত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে আরাকান আর্মি মংডুর টাউনশিপের নিয়ন্ত্রণ নিতে অগ্রসব হচ্ছে। কিন্তু খাদ্য ও জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। 

বুধবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তের হ্নীলা জাদিমোরা, চৌধুরীপাড়া, বাজারপাড়া, ওয়াব্রাং, মৌলভীবাজার ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কানজরপাড়া ও খারাংখালী, উখিয়ার উলুবনিয়া, আনজুমনপাড়া, বালুখালী, রহমতের বিল  ঘুরে দেখা গেছে, লোকজনের মাঝে আবারো আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ সময় নাফ নদীর ওপারে বিকট শব্দ শোনা গেছে। বেলা সাড়ে ৩টা থেকে টানা দুই ঘণ্টা হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে।

Advertisement

হ্নীলা মৌলভীবাজারের আবদুল হালিম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, মিয়ানমারের ওপারে গোলাগুলি ও বিমান হামলার শুরু থেকে প্রায় একমাস ধরে নাফনদী তীর ঘেষে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, জেলে সম্প্রদায় আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন।  

টেকনাফ পৌর সভার মেয়র ইসলাম বলেন, ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে এপারের টেকনাফ পৌর শহর, দমদমিয়া, জাদিমোরা, হ্নীলা, শাহপরীরদ্বীপ, নয়াপাড়া, উনচিপ্রাং, হোয়াইক্যংয়ের মাটি কেঁপে উঠছে। গুলি বোমা মর্টার সেল ও যুদ্ধ বিমানের বিকট শব্দে শিশুদের ঘুম ভাঙছে। 

বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে টিআইএ ও অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কাচিন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। টিআইএর সদস্যরা জানান, সবগুলো ঘাঁটি দখল করতে তাদের তিন দিন সময় লেগেছে। সেখান থেকে জান্তা বাহিনীর কামান ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ জব্দের কথাও জানানো হয়।

এদিকে দেশটির কায়াহ রাজ্যে রোববার (৩ মার্চ) বিমান হামলা চালিয়েছে জান্তা বাহিনী। এই হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। হতাহতরা সবাই বেসামরিক নাগরিক বলে জানা গেছে। যদিও জান্তা সেনাদের দাবি নিহতরা বিদ্রোহী গোষ্ঠির সদস্য।

অন্যদিকে সোমবার (৪ মার্চ) চীনের মধ্যস্থতায় জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী জোটের মধ্যে আবারো বৈঠক হয়েছে। দুই পক্ষের আলোচনায় অস্ত্র বিরতির পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও প্রাধান্য পায়। তবে এই বৈঠকেও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।

এর আগেও চীনের মধ্যস্থতায় জানুয়ারিতেও একটি বৈঠক হয়েছে জান্তা ও বিদ্রোহী জোটের মধ্যে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে অং সান সু-চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। এরপর থেকে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলছে সংঘাত।

গত বছর অক্টোবরের শেষ দিকে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে আক্রমণ শুরু করে আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স আর্মি ও ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির সমন্বয়ে গঠিত থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স।

এদিকে মিয়ানমারের অস্ত্র বাংলাদেশে চলে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সংঘাতের মধ্যে পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যদের পাশাপাশি অস্ত্রধারী এসব রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়েছিল। উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে অস্ত্র নিয়ে অনুপ্রবেশের সময় গ্রেফতার হয়েছে ২৩ রোহিঙ্গা। এদের সবাই কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ও কুতুপালংয়ের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা। অস্ত্রসহ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী ২৩ রোহিঙ্গার মধ্যে ২২ জনের তিনদিন করে রিমান্ড মন্জুর করেছেন আদালত। গ্রেফতারের পর কারাগারে থাকা মোহাম্মদ সাদেক নামে এক রোহিঙ্গা অসুস্থ হওয়ায় তার রিমান্ডের অনুমতি প্রদান করেননি বিচারক।

পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ যুদ্ধ করতে সক্ষম তরুণ জনবল আছে। এখানে বিভিন্ন শক্তির দৃষ্টি তাদের প্রতি পড়েছে। এই জনবলকে তারা টেনে নিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের ভূমির সঙ্গে মিয়ানমারের সংঘাতের একটা সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ঝুঁকি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের যেহেতু আমরা আশ্রয় দিয়েছি, সেহেতু তাদের আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। স্থানীয়দের সঙ্গে সু-সম্পর্ক তৈরি করে রোহিঙ্গাদের মিলেমিশে থাকা উচিত।

টেকনাফ ব্যাটালিয়নের-২ অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, অস্ত্র ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। শুধু তাই নয়, বিজিবি সদস্যদের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!