ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

নিজ প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বী ৭০ বছরের ‘ডিম দাদি’ রাবেয়া

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা
প্রকাশিত: ১৫:৪৭, ১৪ মার্চ ২০২৪
নিজ প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বী ৭০ বছরের ‘ডিম দাদি’ রাবেয়া
পাবনার রাবেয়া বেগম ৭০ বছর বয়সেও ডিম বিক্রি করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যে কোনো বয়সেই সাফল্য আসে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাবনার চাটমোহর উপজেলার গুনাইগাছা ইউপির পৈলানপুন গ্রামের রাবেয়া বেগম। 

পাবনার রাবেয়া বেগম, ৭০ বছর বয়সেও জীবন সংগ্রামে হাল ছাড়েননি। ভিক্ষাবৃত্তি না করে বা অন্যের বোঝা না হয়ে থেকে ৭০ বছর বয়সেও তিনি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কারো কাছে হাত পেতে নয়, ডিম বিক্রি করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। 

৩০ বছর ধরে ডিম বিক্রি করায় এখন সবার কাছে পরিচিত ‘ডিম দাদি’হিসেবে। অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি প্রতিদিন ২০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে ডিম কিনে বিক্রি করেন। চাটমোহর পৌর সদরে। আর এভাবে ডিম বিক্রির টাকায় কিনেছেন জমি, নির্মাণ করেছেন বসতঘর। দুই সন্তানকে মানুষ করে বিয়ে দিয়েছেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক অনন্য উদাহরণ তিনি।

পাবনার রাবেয়া বেগম ৭০ বছর বয়সেও ডিম বিক্রি করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। চাটমোহর উপজেলার গুনাইগাছা ইউপির পৈলানপুন গ্রামের রাবেয়া বেগম জানান, খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন বাবা-মা। স্বামী আলিমুদ্দিন কৃষিকাজ করে যা উপার্জন করতেন তাই দিয়ে সুখেই কাটছিল দিন। বিয়ের বছর খানেকের মাথায় রাবেয়া খাতুন জন্ম দেন একটি কন্যা সন্তানের। তার পাঁচ বছর পর সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতের অমিল হওয়ায় স্বামী আলিমুদ্দিন রাবেয়াকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। তখন রাবেয়া খাতুন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

সেখান থেকেই শুরু তার জীবনের গল্প। স্বামী ছেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে দিশেহারা হয়ে পড়েন রাবেয়া। গ্রামে ঘুরে ঘুরে শুরু করেন পাউরুটিসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি। এর মাঝে জন্ম হয় পুত্র সন্তানের। দশ বছর এভাবে চলার পর শুরু করেন ডিম বিক্রি।

স্থানীয়রা জানান, হাসিনুর রহমান নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি রাবেয়া খাতুনকে ১০০ টাকা ধার দেন। সেই ধারের টাকা দিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে দেশি হাঁস-মুরগির ডিম কিনে শহরে বিক্রি করা শুরু করেন। 

গড়ে একদিনে প্রায় ৫০০ হালি ডিম বিক্রি করেন তিনি। মাঝে মধ্যে ডিম ফেটে গেলে বা পচা বের হলে লোকসান গুনতে হয় তাকে। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরেরও অধিক সময় ধরে পায়ে হেঁটে পৌর শহরের অলিগুলি ঘুরে ঘুরে ডিম বিক্রি করে আসছেন রাবেয়া। ডিম বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ৫ শতক জমি কিনেছেন। কয়েক শতক জমিও লিজ রেখেছেন।

গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রথমে হাঁস-মুরগির ডিম কেনেন, পরে চাটমোহর পৌর সদরে গিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করেন। প্রতিদিন অন্তত ২০ কিলোমিটার রাস্তা খালি পায়ে হেঁটে তিনি ডিম কেনাবেচা করেন। এভাবেই একা সংগ্রাম করে অনেক কষ্টে ছেলেমেয়েকে বড় করে তোলার পর বিয়ে দেন। ৩০ বছর ধরে ডিম বিক্রি করায় রাবেয়া বেগম সবার কাছে এখন পরিচিত ‘ডিম দাদি’ হিসেবে।

কারো কাছে হাত না পেতে বয়ে চলেছেন নিজের জীবন তরি। ডিম বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালানো ও দুই সন্তান মানুষ করার পাশাপাশি পাঁচ শতক জমি কিনে বাড়ি করেছেন। কয়েক শতক জমি লিজও রেখেছেন।

রাবেয়া বলেন, আল্লাহ যেভাবে নেয়, সেভাবে কষ্ট করে চলি। পরের কাছে হাত পাতার আশা আমার কখনো থাকে না। 

রাবেয়া বেগমের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ডিম কেনেন চাটমোহর পৌর সদরের দোলবেদীতলার বাসিন্দা রনি রায় ও টুম্পা দাস। 

তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাবেয়া বেগমের কাছ থেকে ডিম কেনেন। বাজার থেকে কিনতেই হয়, তাই ডিম দাদির কাছ থেকে ডিম কেনেন তারা। এই বয়সেও যে নিজের জীবন সংগ্রাম চালানো যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ রাবেয়া।

ভিক্ষাবৃত্তির প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের ধর্মীয় মতে নিষিদ্ধ। যে কোনো পরিশ্রম করে খাওয়া ভালো। আর আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি একটা ব্যবসা করি।

চাটমোহর এলাকার শাহিন রহমান বলেন, একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধা মানুষ কারো কাছে হাত না পেতে যেভাবে খাবার বিক্রি করছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি অনুপ্রেরণা। আমরা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। 

চাটমোহর উপজেলার গুনাইগাছা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম জানান, রাবেয়া খাতুনের মতো সংগ্রামী নারী বর্তমান সমাজে খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে একটা বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়া হয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: পাবনা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!